শিরিন আক্তার। ছোট্ট একটি টিনের ঘরে তার সংসার। আর ঘরের চার দেয়ালে বন্দী তার অসংখ্য দুঃখের গল্প। তার ভাড়া ঘরের দেয়ালে পলেস্তারা উঠে গেছে। এই মলিনতা ঢাকতে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে স্বামী-সন্তানসহ তোলা কিছু ছবি। তার ঘরের মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পুরনো জামাকাপড় আর বাচ্চাদের খেলনা। সব মিলিয়ে ঘরের কোণায় কোণায় দৈন্যের ছাপ। জীবনের ঘানি টানতে প্রতিদিন অন্ধকারের মধ্যেও তাকে পথ চলতে হয়, কিন্তু সেই পথ যেন তাকে ক্লান্তির এক বৃত্তে বন্দী করে রেখেছে।
অষ্টম শ্রেণি পাশ শিরিনের দুই সন্তান— বড় মেয়েটির বয়স ১৫, আর ছোট ছেলেটির বয়স মাত্র ৭ বছর। তাদের মুখে খাবার তুলে দিতে, তাদের লেখাপড়ার খরচ চালাতে, প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ভিড়ে ঠাসা ঢাকা শহরের এক কর্মস্থলে ছুটে যায় শিরিন। সারাদিন কাজের চাপ আর বাড়ি ফিরে ছোট্ট ঘরে বিশ্রাম নেওয়ার সময়ও যেন তার হয় না। শিরিনের স্বামী করিম মিয়া কাজকর্ম করেন না বললেই চলে। মাদকাসক্ত হওয়ায় দুর্ব্যবহারের মাধ্যমে শিরিনের জীবন তিনি আরও বিষাদময় করে তুলেছেন। শিরিন কোনো প্রতিবাদ করতে পারছেন না। কারণ তার সমর্থন নেই, আছে কেবল অব্যক্ত কষ্ট।
শিরিন যখন কর্মস্থলে যাওয়ার উদ্দেশে বের হন তখনও বাইরের আলো ঠিকমতো ফোটেনি। তাদের গলির মোড়ে প্রায়শই চোর-ছিনতাইকারীরা ঘোরাফেরা করে। দিনের শুরুতেই এই ভয় আর আতঙ্ক নিয়ে তাকে গলি পার হতে হয়। একবার ছিনতাইকারীরা তার ব্যাগ নিয়ে গিয়েছিল। তখন তার ব্যাগে ছিল কিছু টাকা আর সন্তানের জন্য কেনা বইখাতা। নীরবে তাকিয়ে দেখা ছাড়া কিছুই করার ছিল না তার, কারণ আশেপাশে সাহায্য করার কোনো মানুষ ছিল না।
প্রতিদিনের এই যন্ত্রণায় মন ভেঙে পড়লেও বড় মেয়ের চোখের দিকে তাকালে যেন কিছুটা সাহস পায় শিরিন। মেয়ে প্রায়ই তাকে জিজ্ঞাসা করে, ‘মা, আমরা কি এই কষ্ট থেকে কোনোদিন মুক্তি পাব না?’ মা হিসেবে শিরিন উত্তর দিতে পারে না। কিন্তু তার কষ্টের বোঝা আরও ভারী হয়ে ওঠে।
দিনের শেষে বাসায় ফিরে শিরিনকে আরও কিছু নতুন সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। অনেক সময় দৈনন্দিন জিনিসপত্র ফুরিয়ে যায়। অথচ পরের দিন বাজার করার টাকাটাও হাতে থাকে না। ছোট ছেলেটি প্রায়ই জ্বর নিয়ে পড়ে থাকে। মেয়েটির মাথা ব্যথা কমছে না— কারণ চিকিৎসার খরচও সে ঠিকমতো বহন করতে পারে না। স্বামী করিম মিয়া স্ত্রীর উপরেই সব দোষ চাপিয়ে দেয়, গালমন্দ করে, আর মাঝে মাঝে শিরিনের গায়ে হাতও তোলে। এমন পরিবেশে শিরিনের জীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।
শিরিনের এসব কষ্টের কথা কেউ শোনে না, আর প্রতিবেশীরাও সাহায্যের হাত বাড়ায় না। শিরিনের মনে হয়, তার এই জীবনটা যেন এক অভিশাপের মতো, যেখানে সুখ বা শান্তির কোনো স্থান নেই। প্রতিদিনের ছোট ছোট লড়াইয়ের ভেতর তিনি একটুখানি স্বস্তি খোঁজেন। কিন্তু সেই স্বস্তি যেন কেবলই দূর আকাশের তারা হয়ে টিমটিম করে জ্বলতে জ্বলতে মিলিয়ে যায়।
এক সন্ধ্যায় তার বড় মেয়ে তাকে বলে, ‘মা, তুমি তোমার কষ্টের কথাগুলো ‘আমিও জিততে চাই’ ওয়েবসাইটে জানাও। এখানে অনেকেই তাদের সমস্যা নিয়ে কথা বলে, তুমি চাইলে সেখানে তোমার কথা লিখতে পারো।’ শিরিন প্রথমে কিছুটা দ্বিধায় থাকেন— তার মতো সাধারণ মানুষের কথা কেউ শুনবে? কিন্তু মেয়ের কথায় একটু সাহস পেয়ে শিরিন সেই ওয়েবসাইটটি ভিজিট করেন।
amiojittechai.com ওয়েবসাইটে গিয়ে শিরিনের চোখে পড়ে অসংখ্য মানুষের কষ্টের কথা। কেউ অফিসে হয়রানির শিকার, কেউ বাজারের চড়া দামে কষ্ট পাচ্ছেন, আবার কেউ বা নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন। এই সব কষ্টগুলো পড়ে শিরিনের মনে হলো, তার মতো আরও কত মানুষ এভাবে নীরবে কষ্ট সহ্য করে যাচ্ছেন। এই প্ল্যাটফর্মটি ইউএসএইডের স্ট্রেনদেনিং পলিটিক্যাল ল্যান্ডস্কেপ (এসপিএল) প্রকল্পের অধীনে পরিচালিত, যেখানে মানুষের আশা আর কষ্টের কথা শুনে তাদের জীবনযাত্রার উন্নতিতে পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
এই ওয়েবসাইটটি কেবল সাধারণ অভিযোগ জানাবার প্ল্যাটফর্ম নয়। এটি সাধারণ মানুষের কষ্টের কথা বলার একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ, যেখানে প্রতিটি পোস্টেই ফুটে ওঠে দেশের বাস্তব চিত্র। ওয়েবসাইটটিতে সহজে রেজিস্ট্রেশন করার পর নিজের সমস্যার কথা লিখে পোস্ট করা যায়। শিরিনও সাহস করে নিজের কষ্টগুলো লিখে পোস্ট করেন। তিনি তার বাড়ির অবস্থা, স্বামীর দুর্ব্যবহার, কর্মস্থলের চাপ, আর রাস্তায় ছিনতাইয়ের কথা সব একে একে উল্লেখ করেন।
প্রতিটি পোস্টে ছবি ও ভিডিও যুক্ত করার সুবিধা থাকায় শিরিন অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পথে রাস্তায় তার যাত্রার ভিডিও ধারণ করেন। এতে তার অনিরাপত্তা ও প্রতিদিনের ভয়াবহ বাস্তবতা আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। অন্য ব্যবহারকারীরা তার পোস্টে মন্তব্য করেন এবং তার কষ্টের কথা শুনে সহমর্মিতা জানায়। কেউ কেউ সমাধানের পরামর্শও দেয়। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে শিরিনের কণ্ঠস্বর আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং আরও অনেকেই তার পাশে দাঁড়ায়।
‘আমিও জিততে চাই’ কেবল শিরিনের ব্যক্তিগত কষ্ট প্রকাশের জন্য নয়, বরং এটি সামাজিক পরিবর্তনের পথে একটি বড় পদক্ষেপ। এই প্ল্যাটফর্মের লক্ষ্য দেশের প্রান্তিক জনগণের কণ্ঠস্বর শোনা এবং প্রশাসনের নজরে আনা। প্রতিটি পোস্টে সহমর্মী মানুষেরা মন্তব্য করেন এবং সমর্থন জানান, যা সমস্যাগুলো প্রশাসনের কাছে গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরার জন্য সহায়ক।
শিরিন এখন আর একা নয়। ‘আমিও জিততে চাই’ ওয়েবসাইটটি তার মতো অনেকের জন্য একটি আলোকবর্তিকার মতো কাজ করছে। এখানে প্রতিটি কণ্ঠস্বর একত্র হয়ে সামাজিক পরিবর্তনের দাবিতে রূপ নিচ্ছে। শিরিনের মতো মানুষের জীবনযুদ্ধে এগিয়ে যেতে সাহস যোগায় এই মঞ্চটি। আজ শিরিন আশার আলো দেখতে পায়। হয়তো একদিন এই সমস্যাগুলো নিয়ে প্রশাসনের মধ্যে কিছু পরিবর্তন আসবে এবং তার মতো মানুষদের জীবনযাত্রা কিছুটা হলেও সহজ হয়ে উঠবে।
শিরিনের গল্প কেবল একটি মানুষের গল্প নয়; এটি আমাদের সমাজের হাজারও মানুষের বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। ‘আমিও জিততে চাই’ প্ল্যাটফর্মটি আমাদের সকলের জন্যই একটি সুযোগ, যেখানে আমরা আমাদের কথা বলার সাহস পাই। শিরিনের মতো মানুষদের কষ্টগুলো সম্মানজনকভাবে তুলে ধরতে পারলেই একদিন আমরা একটি সুন্দর এবং পরিচ্ছন্ন সমাজ গড়ে তুলতে পারব।
