আছি উন্নত বিশ্বের শীর্ষদেশ যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভেনিয়া রাজ্যের শহর ফিলাডেলফিয়াতে। ছেলে নাজমুস সায়াদাত ইফাত ও বউমা সৈয়দা আদিবা হুদা মুমুর সঙ্গে কিছুদিন কাটানোর জন্য 'আমাদের এই আসা। দিনগুলো আনন্দেই কাটছে। বউমা ফিলাডেলফিয়ার এমাথা-ওমাথা ঘুরিয়ে দেখাচ্ছে। উবার, বাস, সাবওয়ে, ট্রলি, ট্রেনে আমরা ঘুরছি। মাইলের পর মাইল হাঁটছি ছেলে আমাদের খুব একটা সময় দিতে পারছে না।
ইতিমধ্যে ১১-১২ দিন চলেও গেছে। এখানে ওখানে যেতে যেতে এই দেশের মানুষের চলাচল, আচার-আচরণ দেখছি ফিলাডেলফিয়া সিটি হল এই শহরের একেবারে কেন্দ্রে অবস্থিত। পেলাম কয়েক শ বছরের পরোনো ভবন। এই ভকনকে কেন্দ্রে রেখেই নাকি চারপাশে এই শহর। গড়ে উঠেছে! ভবন ও ভবনের বাইরে অনেক ঐতিহাসিক ব্যক্তির মূর্তি রয়েছে। বিশাল আয়তনের ভবনটি ঘুরে দেখে আমরা একটি কফিশপে গেলাম। ঢোকার মুখে তিন চার জন নানা বয়সি সাদা চামড়ার লোক দেখলাম। তাদের আচরণ দেখে আমার খটকা লাগল। বউমাকে তাদের বিষয়ে জিগ্যেস করলাম। সে তাড়া দিল, দ্রুত ওথান থেকে সরতে। আমরা কফিশপে ঢুকলাম। বউমা বলল, 'আবলা, রাস্তায় এমন দেখলে, ওদের দিকে তাকাবেন না ওরা অ্যাডিকটেড (নেশাগ্রস্ত)। রাস্তায়ই পড়ে থাকে হোমলেস (গৃহহীন)।
আমার মনে প্রশ্ন জাগে সভ্য ও উন্নত দেশে হোমলেস মানুষ থাকবে কেন? আমরা কফি খেয়ে বের হওয়ার সময় একটা ছেলে দরজা টেনে ধরল। বউমা তাকে একটা ডলার দিল দেখলাম। কেন ডলার দিল, জিগ্যেস করলাম। বউমা বলে, না দিলে খারাপ ভাষায় গালাগাল করত। আমাদের পেছন পেছন আরেক জন লোক কফিশপ থেকে বের হলেন। তিনি ঐ লোককে কফি অরা একটি গ্লাস ও কিছু খাবার দিলেন। বুঝলাম, এমন মানুষ লোকজনের সাহায্যেই বেঁচে আছে।
জানতে পারলাম, এই নেশাগ্রস্তদের চাইলেই সুস্থ করা যায়। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসন চায় না এরা সুস্থ হোক এরা সুস্থ হয়ে উঠলেই ক্রাইম (অপরাধ) শুরু করবে। প্রশাসন এদের নেশাগ্রস্ত করেই রাখতে চায়। কেউ কেউ জানালেন, এ দেশের পুলিশও লুকিয়ে লুকিয়ে তাদের নেশাদ্রব্যও জোগান দেয়। কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন নিরাপদে যাতে তারা নেশা শরীরে নিতে পারে, তার জন্য ইনজেকশন সিরিঞ্জসহ আনুষঙ্গিক জিনিস সরবরাহ করে।
ফিলাডেলফিয়া শহরের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ডেলওয়ার নদী। এই নদী পার হয়ে ওপারে গেলেই নিউ আর্সি। যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি রাজ্য। ওখানে বড় একটি সুপারশপ আছে। সেখানে ভালো ইন্ডিয়ান গৃহস্থালি সব পণ্য পাওয়া যায়। ট্রেনে ৪০ মিনিটের দূরত্ব। টিকিট। করে আমরা ট্রেনে চেপে বসলাম।
দুই নাম্বার স্টপে যাওয়ার পর একটি ছেলে উঠল ট্রোন আমরা যে কম্পার্টমেন্টে (বগি) উঠেছিলাম, সেটাতে যাত্রী যদিও খুব বেশি নয়, সেই অল্পসংখ্যক যাত্রীর সবার সামনে গিয়েই ঐ ছেলেটি কী যেন চাইছিল। আমি তার ভাষা বুঝতে না পেরে বউমাকে জিগ্যেস করি, 'ছেলেটি কি বলে?' বউমা বলে, 'ছেলেটি ভিক্ষা চাইছে।' আমি বলি, 'আমাদের দেশের মতো এদেশে ভিক্ষুকও আছে।'
আরেকদিন সাব ওয়েতে উঠে বসেছি। মিনিটখানেক সময় গেছে। ট্রেনের দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। এক্ষুনি ট্রেন ছাড়বে। আমি জানালা দিয়ে চেয়ে বাইরে সাবওয়ে স্টেশনের একটি সাইন পড়ার চেষ্টা করছি। হঠাৎ দেখি, দুই জন পুলিশ দ্রুত আসছে। এক পুলিশ তার হাতে থাকা লাইট জ্বালিয়ে কাকে কী যেন সংকেত দিল দরজা খুলে গেল। দুই দরজা দিয়ে দুই পুলিশ ঢুকল। ঠিক আমার পেছনে বসা একজনকে ধরল। কোনো কথাবার্তা ছাড়াই তাকে বাইরে নিয়ে গেল। আবার লাইট দিয়ে সংকেত দিল। ট্রেন ছাড়ল।
আমি বউমার মুখের দিকে তাকাই। বউমা বলে, 'ঐ লোক কোনো ক্রাইম করে এসেছে 'আমি বলি 'ট্রেনে আমরা এত লোক। তারা ঐ লোককেই চিনতে পারল কীভাবে? দুই সেকেন্ডও সময় নেয়নি।' সে বলল, 'হয়তো ক্যামেরা দেখেই শনাক্ত করেছে।'
এর মধ্যে এক দিনের জন্য নিউ ইয়র্ক সিটিতে গিয়েছিলাম। খেয়াল করিনি আমি যেখানে দাঁড়ানো সেখানে একটা দরজা ছিল। হঠাৎ একটা শব্দ পেলাম। দরজা ঠেলে দুই জন বিশালদেহী কালো নারী বের হলেন। তারা আমাকে দরজার সামনে দাঁড়ানো দেখে বেশ কিছু কথা বললেন। আমি যদিও ইংরেজি খুব। একটা বুঝি না, তবে ধীরে ধরে বললে এক দুই শব্দ বুঝতে পারি যেমন ফিলাডেলফিয়া এয়ারপোর্টে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার কোনো কথাই বুঝিনি। আবার যে পুলিশ কর্মকর্তা আমাদের সিকিউরিটি চেক করল, তার বেশির ভাগ কথাই বুঝতে পেরেছিলাম। কিন্তু ঐ দুই নারীর বলা একটি শব্দও বুঝতে পারিনি। হলেন।
ছেলে আমাকে জিগ্যেস করে, 'আব্বা তারা তোমাকে কি বলছে, বুঝছ?' আমি বলি, 'না রে বাবা' ছেলে বলে, 'আড়াই বছর ধরে আছি, আমিও এদের সব কথা বুঝি না। তবে তোমাকে বলেছে, দরজার সামনে
না দাঁড়ানোর শিক্ষাটা নার্সারি ক্লাসে দেওয়া হয়েছে, সেটা কি তুমি ভুলে গেছ?' আমি বলি, 'আমি তো কখনো নার্সারি ক্লাসে পড়িনি, আমি এসব শিখব কীভাবে।'
নিউ ইয়র্ক যাওয়ার রাস্তায় স্থানে স্থানে অনেক জ্যাম ছিল। বেলা প্রায় ১১টায় নিউ ইয়র্ক পৌঁছালাম। বাস থেকে নেমে হেঁটে কিছুদূর যেতে রাস্তার কয়েক পয়েন্টে দেখলাম, আমাদের দেশের মতো ট্রাফিক পুলিশ ছাত ইশারা নিয়ে যানবাহন চলাচলের নির্দেশনা দিচ্ছেন। নারী ট্র্যাফিক পুলিশও রাস্তা কন্ট্রোলে কাজ করতে দেখলাম। বউমা পাতাল ট্রেন স্টেশনে নিয়ে গেল। ২১ ডলার করে মেশিনে দিয়ে দিয়ে পরপর ছয়খানা কার্ড করে ফেলল। আমাদের ঢাকার মেট্রোরেলের মতো কার্ড মেশিনে পাঞ্চ করে ট্রেনের কাছে যাওয়ার মুখে দেখি, একজন লোক দাঁড়ানো। তার দুই হাত কনুইয়ের কাছে থেকে নেই। গলায় একটি ব্যাগ ঝোলানো। আমার ছেলে ঐ লোকটার ব্যাগে দুই ডলার ঢুকিয়ে দিল। বিয়াই জিগ্যেস করলেন, 'তুমি কি তাকে সাহায্য করলে?' আমি বলি, 'এই দেশে কারো ছাওকাটি। গেলে তো কৃত্রিম । হাত লাগিয়ে দেওয়ার কথা।' ছেলে আমাকে ঝাড়ি দিয়ে বলে, 'তারা বিশ্বকে দেখানোর জন্য তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে গিয়ে বিনা মূল্যে এসব করে আসে এই দেশে ইনসিওরেন্স কাভার না করলে কোনো নাগরিক ঠিকমতো চিকিৎসা পায় না। এ দেশে এসে থাক, তখন বুঝতে পারবে কেমন সুযোগ-সুবিধা আছে।'
আমি এই লেখায় আমেরিকার যে বিষয়গুলো আমাকে হোঁচট খাইয়েছে অর্থাৎ সত্য ও উন্নত দেশ হিসেবে, সেগুলোর টুকটাক কিছু লিখলাম ভবিষ্যতে তাদের উন্নয়ন শৃঙ্খলা, গণতন্ত্র, মুক্তবাজার এসব নিয়ে লেখার ইচ্ছা রইল
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, সাবেক সভাপতি
মৌলভীবাজার প্রেস ক্লাব
