ক্রিকেট এখন যে জায়গাটায় দাঁড়িয়ে, শুরুর দিকে তা এরকম ছিল না। বিশ্বকাপ নিয়েও দর্শকদের মধ্যে আগ্রহ ছিল সামান্যই। তবে যুগের পরিবর্তনে ও প্রযুক্তির ছোঁয়ায় ক্রিকেট এখন বিশ্বে ব্যাপকভাবে সমাদৃত। সঙ্গত কারণেই আজ ক্রিকেট বিশ্বের নজর থাকবে শুধুই লর্ডসে। দ্বাদশ আসরের ফাইনালে, যাতে প্রতিদ্বন্দ্বী স্বাগতিক ইংল্যান্ড ও গতবারের রানার্সআপ নিউজিল্যান্ড। ২৩ বছর পর নতুন কোনো দলের হাতে উঠবে বিশ্বকাপের ট্রফি। তাই চলুন, মাঠের লড়াই শুরুর আগে গেল ১১ আসরের ফাইনালের স্মৃতিচারণা করা যাক।
ক্যারিবিয়ানরাই রাজা
১৯৭৫
সময়টা ছিল ক্যারিবিয়ান প্রতাপের যুগ। অনুমিতভাবেই বাজিমাত করলো ক্লাইভ লয়েডের প্রবল পরাক্রমশালী ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ফাইনালে সেঞ্চুরি করে অমরত্নের তালিকায় নাম লেখালেন বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক লয়েড নিজেই। অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ফাইনালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের জয়ের ব্যবধান ছিল ১৭ রানের।
আবারও ওয়েস্ট ইন্ডিজ
১৯৭৯
আবারো ফাইনালে গেল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। আবারো চ্যাম্পিয়ন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ফাইনালে দুরন্ত সেঞ্চুরি করেন ভিভ রিচার্ডস। ফাইনালটাও হয়েছিল একতরফা। স্বাগতিক হওয়ার পরও ক্যারিবিয়দের সামনে দাঁড়াতে পারেনি ইংল্যান্ড। হারে ৯২ রানে।
তাক লাগালো ভারত
১৯৮৩
এটাই বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অঘটন। ওয়েস্ট ইন্ডিজ হেরে গেল ভারতের কাছে; বলা ভালো হেরে গেল তারা মদনলাল ও মহিন্দর অমরনাথের বিস্ময়কর বোলিংয়ের কাছে। টুর্নামেন্টজুড়ে দলগত নৈপুণ্যের ফলশ্রুতিতে ভারতকে প্রথমবারের মতো বিশ্বজয়ের আনন্দে ভাসালেন অধিনায়ক কপিল দেব।
বোর্ডারের হাতে ট্রফি
১৯৮৭
প্রথমবারের মতো যৌথভাবে বিশ্বকাপ আয়োজন করে ভারত-পাকিস্তান। অনেক নাটকীয়তা সত্ত্বেও দুই স্বাগতিক প্রতিবেশীকে ছিটকে দিয়ে ফাইনালে চলে গেলো অ্যাশেজ প্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া। ইংল্যান্ডের জন্য স্বপ্নটা ছিল, নিজেদের দেশের বাইরের প্রথম আসরের ট্রফিটা ঘরে তুলে তিনবারের হাহাকার ঘোচানো। অস্ট্রেলিয়ার বিগত সোনালি প্রজন্মের জন্য এটা ছিল প্রয়োজন। দুইয়ে মিলে হলো বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ ফাইনাল। ইংল্যান্ডকে ৭ রানে হারিয়ে প্রথমবারের মতো ট্রফির স্পর্শ পেল অস্ট্রেলিয়রা।
পাকিস্তানের একমাত্র শিরোপা
১৯৯২
পাকিস্তান একদমই আলোচনায় ছিল না। কিন্তু একাই যেন সব হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিয়ে ট্রফি উচিয়ে ধরলেন অধিনায়ক ইমরান খান। গ্রুপ পর্বে অনেক হিসাব নিকাশ শেষে কোনোক্রমে ফাইনালে গিয়েছিল পাকিস্তান। ফাইনালে সবাইকে ছাপিয়ে গেল ইমরান খানের উদ্ভাবনী ও আকর্ষণীয় নেতৃত্বে ওয়াসিম আকরাম, ইনজামাম-উল হক, মুশতাক আহমেদদের গল্পগাথা। রঙিন জার্সির বিশ্বকাপ শেষ হলো ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পাকিস্তানের ২২ রানের জয় দিয়ে।
লঙ্কানদের
উত্থান
১৯৯৬
লাহোরের গাদ্দাফী স্টেডিয়ামের ফাইনালে বড়ো একটা জুয়াই খেলে শ্রীলঙ্কা। ইতিহাস বলে প্রথমে ব্যাট করারাই জিতে বিশ্বকাপের শিরোপা। কিন্তু উপমহাদেশে ফেরা বিশ্বকাপটিতে শ্রীলঙ্কা টসে জিতে নেয় বোলিং। মার্ক টেলরের (৭৪) নৈপুণ্যে সাত উইকেট হারিয়ে অস্ট্রেলিয়া তোলে ২৪১ রান। জবাবে মাত্র ৪২ রানেই তিন উইকেট হারিয়ে ফেলে লঙ্কানরা। এরপরেই দৃশ্যপটে হাজির হন অরবিন্দ ডি সিলভা। তার অপরাজিত ১০৭ রানের কল্যাণেই শেষ পর্যন্ত প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জিতে নেয় লঙ্কানরা। অধিনায়ক অর্জুনা রানাতুঙ্গার হাতে বিশ্বকাপের ট্রফি ওঠার সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের ক্রিকেটের নতুন পর্বে পা রাখে দেশটি।
অস্ট্রেলিয় আধিপত্যের শুরু
১৯৯৯
তিন আসর পর বিশ্বকাপ আবারও ফিরলো ইংল্যান্ডে। যদিও ইংল্যান্ডের মাটি থেকে শিরোপা নিয়ে ফিরলো তাদেরই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী অস্ট্রেলিয়া। ফাইনালটা ছিল একতরফা। ৩৯.১ ওভার ব্যাটিং করে মাত্র ১৩২ রানে গুটিয়ে যায় পাকিস্তান। অস্ট্রেলিয়া বিশ্বকাপ ট্রফি জয় নিশ্চিত করে মোটে ২০.১ ওভারেই; তাও মাত্র দুই উইকেট হারিয়ে। শুরু হয় অজেয় অস্ট্রেলিয়ার যুগ।
অস্ট্রেলিয়ার স্বর্ণযুগ
২০০৩
এই বিশ্বকাপটাকে বলা যায় অস্ট্রেলিয়ার আধিপত্য বিস্তারের আরেকটি ধাপ। বিশ্বকাপে তাদের সামনে প্রায় কোনো দলই দাঁড়াতে পারেনি। প্রায় একতরফা লড়াইয়ে আবারও বিশ্বকাপটা নিজেদের করে নেয় তারা। সেই আধিপত্যের বড়ো একটা নজির দেখা যায় ফাইনালেই। সেবার প্রথমে ব্যাট করে ৩৫৯ রানের পাহাড় গড়ে অস্ট্রেলিয়া। বিশ্বকাপের ফাইনালে এখন পর্যন্ত এটাই কোনো দলের দলীয় সর্বোচ্চ রান। এর চাপে ভেঙে পড়ে ভারত। ৩৯ ওভার এক বলে অল আউট হওয়ার আগে ভারত করতে পারে মাত্র ২৩৯ রান। বড় জয় নিয়েই বিশ্বকাপটা নিজেদের করে নেয় দলটি।
আবারো অষ্ট্রেলিয়া
২০০৭
অনেক কারণেই ২০০৭ বিশ্বকাপ ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে। ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে বিশ্বকাপের অভিযাত্রা, আয়ারল্যান্ডের কীর্তি, বব উলমারের মৃত্যু, দর্শক বিতর্ক, ভারত-পাকিস্তানের প্রথম পর্ব থেকে বিদায় এবং আম্পায়ারিং কেলেঙ্কারি—এত কিছুর মাঝেও নিজেদের আধিপত্য ধরে রেখে আরেকটি বিশ্বকাপ জিতে যায় অস্ট্রেলিয়া। ফাইনালে বৃষ্টি আইনে শ্রীলঙ্কাকে তারা হারায় ৫৩ রানের বড় ব্যবধানে।
ধোনির যুগ
২০১১
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের পর এবার ওয়ানডে বিশ্বকাপও জিতে নেয় ভারত। ফাইনালে মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে প্রথমবারের মতো স্বাগতিক কোনো দেশ নিজ সমর্থকদের সামনে তুলে ধরে বিশ্বকাপ। শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে দেয় ছয় উইকেটের ব্যবধানে। ব্যাট-বলের অনন্য পারফরম্যান্সে বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা পারফরম্যান্স দেখান যুবরাজ সিং। টুর্নামেন্ট সেরার পুরস্কার তার হাতে। বিদায় বেলায় ব্যাটিং কিংবদন্তি শচীন টেন্ডুলকারও পুরো ক্যারিয়ারের একমাত্র অপ্রাপ্তি মুছে ফেলেন। অধিনায়ক হিসেবে নিজেকে সর্বকালের সেরাদের কাতারে নিয়ে যান অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনি।
অষ্ট্রেলিয়ার ফেরা
২০১৫
ক্যারিয়ারের শেষ বেলায় এসে আরেকটা বিশ্বকাপ জিতে নেন মাইকেল ক্লার্ক। অস্ট্রেলিয়ার স্বর্ণযুগে এর আগেও তিনি বিশ্বকাপ জিতেছেন। এবার তিনি জিতলেন অধিনায়ক হিসেবে। সেটাও আবার নিজেদের মাটিতে। মিশেল স্টার্কের আগুন ঝরানো বোলিং, পুরো পেস অ্যাটাকের ছন্দে থাকা, ব্যাটসম্যানদের সময়মতো জ্বলে ওঠা ক্লার্কের কাজকে সহজ করে। ফাইনালে ব্ল্যাক ক্যাপদের অল্প রানে গুটিয়ে দিয়ে শিরোপা হাতে নেন ক্লার্ক। চ্যাম্পিয়ন হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করা ক্লার্ক, পড়ন্ত বেলায় দলকে চ্যাম্পিয়ন করেই বিদায় নিলেন। একতরফা ফাইনালটি অস্ট্রেলিয়া জিতে নেয় সাত উইকেটের বড় ব্যবধানে।
