উত্তরবঙ্গের প্রাচীন স্থাপত্য দর্শন

আপডেট : ১৪ জুলাই ২০১৯, ১৭:৫৩

সৈয়দ তাওসিফ মোনাওয়ার

 

স্থপতিদের হাতে একটি স্থাপনা তৈরি, নকশা বা এর পরিকল্পনার পেছনে অনেকগুলো বিষয় অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে। পরিবেশ, প্রকৃতি এবং কোনো স্থানের বৈশিষ্ট্য তো আছেই, সঙ্গে প্রেরণা হিসেবে যোগ হয় প্রাচীন ও ঐতিহাসিক স্থাপত্যের ধরন। বাংলাদেশের সংস্কৃতি, ধর্ম, ঐতিহ্য, কৃষ্টি ফুটে আছে প্রাচীন স্থাপনাগুলোতে। শতাব্দির পর শতাব্দি ধরে এসব স্থাপত্যের বিকাশ ঘটেছিল তত্কালীন সমাজব্যবস্থা, সংস্কৃতি ও ধর্ম চর্চা এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নিজস্ব জীবনযাত্রার ওপর ভিত্তি করে। আর হাজার বছরের পুরোনো ইতিহাসের স্বাক্ষী এমনই কিছু স্থাপনা ছড়িয়ে আছে দেশের উত্তর প্রান্তে। চলুন আজ জেনে নিই উত্তরের কিছু স্থাপনা সম্পর্কে—

 

মহাস্থানগড়

ঘড়ির কাঁটা যখন ১০টা ছুঁইছুঁই তখন আমরা পৌঁছে গেলাম বাংলার এক সময়কার রাজধানী মহাস্থানগড়ের সন্নিকটে। ইতিহাসে পুন্ড্রবর্ধন বলা হতো প্রসিদ্ধ এই নগরীকে। প্রত্নতাত্ত্বিকদের গবেষণায় এখানে প্রায় আড়াই বছর আগের সভ্যতার প্রমাণ মিলেছে। ২০১৬ সালে এটিকে সার্কের সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করা হয়। খ্রিস্টপূর্ব ৭০০ সালে এটি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। বিখ্যাত পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ ৬৩৯ থেকে ৬৪৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে পুন্ড্রনগরে এসেছিলেন। তিনি তাঁর ভ্রমণের ধারা বিবরণীতে তখনকার প্রকৃতি ও জীবনযাত্রার কথা বর্ণনা করেন। বৌদ্ধ শিক্ষার জন্য প্রসিদ্ধ হওয়ায় চীন ও তিব্বত থেকে ভিক্ষুরা তখন মহাস্থানগড়ে আসতেন লেখাপড়া করতে।

বগুড়া শহর থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার উত্তরে করতোয়া নদীর তীরে অবস্থিত মহাস্থানগড়ের ধ্বংসাবশেষ। মৌর্য, গুপ্ত, পাল রাজা যে-ই ক্ষমতায় এসেছেন, পুন্ড্রনগরকেই বানিয়েছেন রাজধানী। মৌর্যদের শাসনের পর গুপ্ত আমল। সেন বংশের শেষ রাজা লক্ষ্মণ সেন (১০৮২-১১২৫) যখন গৌড়ের রাজা ছিলেন তখন এই গড় অরক্ষিত ছিল। সেনদের আমলে এ অঞ্চলের শাসন স্থানান্তরিত হতে থাকে গৌড়ে। ১৪০৩ খ্রিস্টাব্দে বলখী নগরের শাহ সুলতান (রহ.) ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্য এ অঞ্চলে আসেন। পুন্ড্রনগরের শেষ রাজা পরশুরামকে যুদ্ধে পরাজিত করে বিজয়ী হন তিনি। প্রাচীরঘেরা নগরী শুরু হওয়ার আগে উঁচু যে স্থান দেখা যায় সেখানেই রয়েছে শাহ সুলতান (রহ.)-এর বিশাল মাজার ও মসজিদ।

প্রথমেই আমরা গেলাম গোকুল মেধে। বাইরে থেকে দেখেই চোখ জুড়িয়ে গেল। স্থানীয়রা এই মেধকে বলেন বেহুলার বাসর ঘর, কেউ বলেন লক্ষ্মীন্দরের মেধ। প্রত্নতত্ত্ব গবেষকদের মতে, ৭ম-৮ম শতকে এটি নির্মাণ করা হয়। তাঁদের ধারণা এটি একটি বৌদ্ধ মঠ। ১৯৩৪ সালের দিকে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের সময় এটি আবিষ্কার করা হয়। স্তরে স্তরে ১৭২টি কুঠুরি দিয়ে সাজানো এটি, যার পুরোটাই ইটের তৈরি। উচ্চতা প্রায় ৪৫ ফুট। পূর্ব পাশে রয়েছে ২৪ কোণ বিশিষ্ট একটি স্নানঘর। খননের সময়ে গোকুল মেধে পোড়ামাটির ফলক পাওয়া যায়। ১১ থেকে ১২ শতকে সেন যুগের সময় এখানে বর্গাকৃতির মন্দির তৈরি করা হয়। ধারণা করা হয় সেটি ছিল শিবমন্দির। ইবনে বতুতা ও হিউয়েন সাঙ তাঁদের ভ্রমণ কাহিনিতে এটাকে বৌদ্ধ মঠ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। হাজার বছর আগের এই স্থাপনার নির্মাণশৈলী দেখে মুগ্ধ হবে যে কেউ। গোকুল মেধে ফটোসেশন করে আমরা রওনা হই মহাস্থানগড়ের অন্যান্য স্থাপনা দেখতে। ১০টা বেজে ৪৫ মিনিটে বাস থেকে নামতেই চোখ গেল মহাস্থানগড়ের লাল ইটে ঘেরা প্রাচীরে। আকাশে মেঘ থাকলেও রোদের তাপে দরদর করে ঘাম পড়ছে। তবে সেদিকে খেয়াল নেই। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে প্রাচীর ধরে হাঁটতে হাঁটতে শিহরিত হচ্ছিলাম, এক সময় না জানি কত শানশওকত ছিল এই রাজধানীর!

এরপর আমরা টিকেট কেটে মহাস্থানগড় জাদুঘরে প্রবেশ করলাম। জাদুঘরের আঙিনায় বেশ যত্নের সাথে কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সাজিয়ে রাখা হয়েছে। জাদুঘরের ভেতরে মৌর্য, গুপ্ত, পাল ও সেন যুগের বিভিন্ন নিদর্শনসহ অনেক দেব-দেবীর মূর্তি দেখতে পেলাম। বেশ পুরানো মাটির মূর্তি, বাসনপত্র, স্বর্ণ, ব্রোঞ্জের সামগ্রী, কালো পাথরের মূর্তি, বেলে পাথরের মূর্তি, মাটি দিয়ে তৈরি খোদাই করা ইট, বিভিন্ন শিলালিপি, মাটি ও অন্যান্য ধাতুর তৈরি বোতাম, নাক ফুল, মূল্যবান পাথর, মার্বেল, পোড়ামাটির পুতুল, খেলনা, নানা ধরনের প্রাচীন অলঙ্কারসহ বহু প্রাচীন ও মূল্যবান নিদর্শন জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। জাদুঘর থেকে বেরিয়ে রাস্তা পার হলে ঠিক সামনেই গোবিন্দ ভিটা। বিষ্ণুর আবাস হিসেবে গোবিন্দ ভিটা নামে পরিচিত এটি।

 

পাহাড়পুর

দুপুর আড়াইটায় পৌঁছে গেলাম নওগাঁ জেলার বদলগাছি থানায় অবস্থিত পাহাড়পুরে।  দুপুরের খাবার সেরে আমরা মূল ফটক ধরে বৌদ্ধবিহারের কাছে যাওয়ার জন্য হাঁটতে লাগলাম। বিস্তীর্ণ একটানা সমভূমির মাঝে সুউচ্চ প্রাচীন মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ জায়গাটিকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। দূর থেকে বিহার চোখে পড়তেই মনে হলো এই তো সেই পাহাড়পুর, যেটির ছবি দেখেছি এতদিন!

এটি এশিয়ার বৃহত্তম প্রাচীন বৌদ্ধবিহার। ৮০০ ভিক্ষু বসবাসের উপযোগী ছিল এই বিহার। খননের মাধ্যমে বৌদ্ধবিহারের ধ্বংসস্তুপ থেকে বাংলার প্রাচীন জনপথ বরেন্দ্র অঞ্চলের শিল্প, শিক্ষা, ধর্ম, অর্থ প্রভৃতি বিষয়ের বহু মূল্যবান সামগ্রী আবিষ্কার হয়েছে।

 

কুসুম্বা মসজিদ

বিকেল ৫টা নাগাদ আমরা নওগাঁর ঐতিহাসিক কুসুম্বা মসজিদে পৌঁছালাম।

প্রায় সাড়ে ৪শ’ বছরের ঐতিহ্য ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে নওগাঁর ঐতিহাসিক এই মসজিদটি। ৫ টাকার নোটে এই মসজিদটির ছবি মুদ্রিত আছে। নওগাঁর মান্দা উপজেলায় অবস্থিত এই মসজিদটি সুলতানি আমলের পুরাকীর্তি। বাংলায় আফগানদের শাসন আমলে জনৈক সুলায়মান মসজিদটি নির্মাণ করেন। ১৫৫৮ সালের দিকে কুসুম্বা মসজিদ নির্মাণ করা হয়। মসজিদের দেয়াল পাথুরে কারুকার্যের নকশা খচিত। ভেতরে পশ্চিমের দেয়ালে নকশা করা। বাইরের দেয়ালের পাথর অমসৃণ, প্রতিটি অংশে খোদাইয়ের কাজ করা।

ছোট সোনা, খানিয়াদীঘি ও দারাসবাড়ি মসজিদ

সকালে রাজশাহীকে আপাতত বিদায় জানিয়ে  ১১টার দিকে আমরা পৌঁছে গেলাম চাঁপাইনবাবগঞ্জের ছোট সোনা মসজিদে। ২০ টাকার নোটে এই ঐতিহাসিক মসজিদের ছবি আছে। এটি সুলতানি আমলের স্থাপনা। এটি নির্মাণের সময় চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ থানা ছিল প্রাচীন বাংলার রাজধানী গৌড়ের অংশ। ১৪৯৩ থেকে ১৫১৯ খ্রিস্টাব্দের মাঝে সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের আমলে এটি নির্মিত হয়। এটি ইটের তৈরি, কুসুম্বা মসজিদের মতোই পাথর দিয়ে ঘেরা। কাছে গেলে দেয়ালে খোদাইয়ের কাজ চোখে পড়বে। মোট ১৫টি গম্বুজ  আছে এতে। 

এরপর আমরা গেলাম খানিয়াদীঘি মসজিদে। এটি সোনা মসজিদের কাছেই। ধারণা করা হয়, ১৪৮০ সালে কোনো এক রাজবিবি এটি নির্মাণ করেন। মসজিদের কাছে বিশাল এক দীঘি রয়েছে, যার নাম খানিয়াদীঘি। সাধারণত এটি খানিয়াদীঘি মসজিদ নামেই পরিচিত। মসজিদটির দেয়ালে পাথুরে কারুকার্য আছে। তবে এটি আকারে ছোট। খানিয়াদীঘি মসজিদের কাছেই দারাসবাড়ি মসজিদ। তবে কুসুম্বা, সোনা মসজিদ বা খানিয়াদীঘি মসজিদের মতো এটি আর ব্যবহার উপযোগী নেই। বেশ আগেই পরিত্যক্ত হয়েছে।

 

পুঠিয়া রাজবাড়ি

মসজিদ দর্শন শেষে আমরা আবার রাজশাহী ফিরলাম। এবারের উদ্দেশ্য পুঠিয়া রাজবাড়ি দর্শন। এবারের যাত্রায় এটাই ছিল আমাদের শেষ স্থাপনা দর্শন। পুঠিয়া রাজবাড়ির গোড়াপত্তন হয় মোগল আমলে। সপ্তদশ শতকে জনৈক নীলাম্বর সম্রাট জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে ‘রাজা’ উপাধি লাভ করার পর এটি রাজবাড়ি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। ১৯৫০ সাল পর্যন্ত জমিদারি প্রথা ছিল। প্রথা বিলুপ্ত হলে পুঠিয়া রাজবাড়ির জমিদারিও বিলুপ্ত হয়।

এই রাজবাড়ির সামনে স্তম্ভ, অলঙ্করণ, কাঠের কাজ, ফুল ও লতাপাতার নকশা চমত্কার নির্মাণশৈলী ফুটিয়ে তুলেছে। রাজবাড়ির আশেপাশে ৬ একর আয়তনের ৬টি দিঘী রয়েছে। মন্দিরও ৩টি। সবচেয়ে বড় হচ্ছে শিবমন্দির। এছাড়া রাধাগোবিন্দ মন্দির, গোপাল মন্দির, গোবিন্দ মন্দির, দোলমঞ্চও রয়েছে এখানে। প্রতিটি মন্দিরের দেয়ালেই রয়েছে অপূর্ব সব পোড়ামাটির ফলকের কারুকাজ। তবে রানির স্নানের ঘাট, অন্দরমহল মিলিয়ে বিশাল এই রাজবাড়ি প্রাঙ্গণ।

 

ছবি: অধরা ইফরিত ওয়াহিদা