মার্কিন রাষ্ট্রদূতের চোখে ঝালকাঠির ভাসমান হাট

আপডেট : ১৪ জুলাই ২০১৯, ১৭:৫৪

পলাশ রায়

 

প্রকৃতির নৈসর্গের ছোঁয়ায় নিরেট এক গ্রাম ভীমরুলি। এখানে ভোর হয় গ্রামের ছোট্ট খাল ভীমরুলির ছলাত্ ছলাত্ জোয়ার আর পেয়ারার ঘন জঙ্গলে পাখির কলকাকলিতে। আধাপাকা পেয়ারার অর্ধেক কামড়ে দিয়ে শালিকটা আরেকটি পেয়ারার ডালে ছুটে যায় আর ডাকাডাকি করে বেড়ায়। কেবল শালিকই নয়, বাদুরসহ গ্রামবাংলার নানারকম পাখির এক অভয়ারণ্য এই পেয়ারা বাগান। ভোরের কুসুম আলোর পর এক একটু সকাল হলে চাষিরা ছোট ডিঙি নৌকা নিয়ে পেয়ারা পাড়তে যান। পেয়ারার এই মৌসুমে প্রতিদিনই ভীমরুলি খালের ভাসমান হাটে বেচাকেনা হচ্ছে দক্ষিণের আপেল খ্যাত পেয়ারা। কেবল পেয়ারাই নয়, বর্ষা ও শরত্ এই ঋতুজুড়ে ৪ মাস ভাসমান হাটটিতে কৃষকের উত্পাদিত সবজি ও অন্যান্য ফল বিক্রি হয়। থাইল্যান্ডের ফ্লোটিং মার্কেট কিংবা কেরালার ব্যাকওয়াটার ট্যুরিজম অনেকের কাছেই বিশেষ প্রাধান্য পায়। তবে কোনো প্রকার কৃত্তিমতা ছাড়াই ঝালকাঠির কীর্তিপাশা ইউনিয়নের এই ভাসমান হাট-বাজারটি একদম প্রকৃতির কোলে গড়ে উঠেছে। তাই গত কয়েকবছর ধরে বিদেশি পর্যটকরা এখানে এসে আকৃষ্ট হচ্ছেন। বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, ছোট-বড় চাকরিজীবী, এমনকি বাংলাদেশে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতরাও পরিদর্শনে আসছেন এখানে। গত বছর ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা এবং গত বৃহস্পতিবার পেয়ারার ভাসমান হাটে এসে উচ্ছ্বসিত অনুভূতি প্রকাশ করেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত আল রবার্ট মিলার। গ্রামের প্রকৃতি ও সাধারণ মানুষের সাথে মিশে আত্মহারা হয়ে ওঠেন তিনি। দেখলে কে বলবে তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশ আমেরিকার একজন রাষ্ট্রদূত।

জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে জানতে পারলাম সকাল ৯টায় রাষ্ট্রদূত আসবেন। ভাবলাম একটু আগেই যাই। মোটরসাইকেলে করে বাসা থেকে প্রথমে শহরের কলেজ মোড় পৌঁছে দেখতে পাই রাষ্ট্রদূতের নিরাপত্তায় সেখানে পুলিশ সদস্যরা দাঁড়িয়ে আছেন। সেখান থেকে ভীমরুলির ভাসমান হাটটি কমপক্ষে ১০ কিলোমিটারের পথ। শহরের কীর্তিপাশা মোড় হয়ে এই বর্ষায় সবুজে সতেজ হওয়া দু-পাশের গাছপালার মাঝ দিয়ে চলা রাস্তা ধরে আমরা ভীমরুলির দিকে যাচ্ছিলাম। একটু পরপর দেখতে পাই পুলিশ সদস্যরা দাঁড়িয়ে আছেন নিরাপত্তার দায়িত্বে। ভীমরুলি হাটে গিয়ে যখন পৌঁছাই তখন সকাল ৮টা। দেখতে পেলাম ভাসমান হাটেও পুলিশের অসংখ্য সদস্য মোতায়েন করে রাখা হয়েছে। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত কম করে হলেও এ সংখ্যা আড়াইশ’র কম না। যেন নিরাপত্তায় নিছিদ্র প্রহরা। গ্রামের রাস্তাটিতে তখন মোটরসাইকেল কিংবা অটোরিকশাও বন্ধ করে দেয় পুলিশ। এমনকি হাটে বেশি লোকজনের যাতায়াত বন্ধ রাখা হয়। ব্যাগসহ পথচারিদের থামিয়ে থামিয়ে চলে তল্লাশি। ভাসমান হাট-বাজারও প্রায় বন্ধ থাকে। দূরে দূরে রাখা হয় বেঁচতে আসা ফল ও তরকারির নৌকাগুলো। ঠিক ৯টা বাজতেই রাষ্ট্রদূত বরিশাল হয়ে ঝালকাঠির ভাসমান হাটটিতে আসেন। জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার রাষ্ট্রদূতকে ফুল দিয়ে বরণ করেন। ইঞ্জিনচালিত বড় নৌকায় চেয়ারে বাসিয়ে ভীমরুলির খালের হাটের কিছুটা ঘুরে দেখানো হয়। তখন  গ্রামের মানুষ রাষ্ট্রদূতকে দেখার জন্য ভিড় করেন। পেয়ারা, আমড়া, নারকেল ও সবজি বোঝাই করে খালের নৌকাগুলোও দূরে অবস্থান করে। কিন্তু রাষ্ট্রদূত মিলার বড় নৌকাটি থেকে নেমে অনেকটা শিশুর মতো সহজ সরল হয়ে ওঠেন। হঠাত্ তিনি খালের ছোট্ট নৌকায় চড়তে চেয়ে বসলেন। তখন দূরে অবস্থান করা চাষিদের নৌকা নিয়ে আসতে বলা হলো। পেয়ারা, কাঁঠাল, আমড়া কিংবা নানারকম সবজি বোঝাই করে নৌকাগুলো খালের পাড়ে আসতেই একটি নৌকায় উঠে পড়েন মিলার। ডিঙি নৌকায় উঠে গ্রামের যুবক কালাচাঁদ দাসকে জড়িয়ে ধরেন রাষ্ট্রদূত। নিজেই বৈঠা হাতে নিয়ে নৌকা চালানোর ছল করেন। এরপর পেয়ারা আর সবজি হাতে নিয়ে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখেন। আমরা সাংবাদিকসহ জেলা প্রশাসাক, পুলিশ সুপার, রাষ্ট্রদূতের প্রটোকল কর্মকতা সবাই পাড়ে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম। আমার তখন মনে হলো, কী স্বাভাবিক কতটা উচ্ছ্বসিত এই মানুষটি। অথচ ভোর থেকে তাঁর জন্য কত মানুষ উদ্বিগ্ন কত আয়োজন কত নিরাপত্তা। গ্রামের সাধারণ চাষি যুবক কোনোদিন স্বপ্নেও ভাবেনি আমেরিকার রাষ্ট্রদূত তাঁকে জড়িয়ে ধরতে পারেন। ডিঙি নৌকায় পাশে বসে কথা বলতে পারেন।

আধাঘণ্টার ভ্রমণ শেষে রাষ্ট্রদূতের বিদায়বেলায় আমরা তাঁর অনুভূতি জানতে চাইলাম, জানতে চাইলাম আমাদের পেয়ারার ভাসমান হাট নিয়ে।  আমাদের দেখে রাষ্ট্রদূত নিজেই যেন কথা বলতে চাইছেন। উচ্ছ্বসিত ভঙিমায় তিনি আমাদের সাথে কথা বলতে শুরু করলে তাঁর মিডিয়া ও প্রটোকলের অন্য দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা তাকিয়ে রইলেন। আসলে প্রকৃতির এই নিবিড় পরিবেশ রাষ্ট্রদূতকে একজন চরম তৃপ্ত আগন্তুকে পরিণত করে। রাষ্ট্রদূত মিলার বলেন, ‘অনেকদিন পর আমি নদী ভ্রমণ করেছি। চারপাশ কেবল সবুজে ঘেরা।’ পেয়ারার নাম উল্লেখ করে বলেতে না পারলেও ভাসমান হাটের ফল এবং সবজি বিক্রির দৃশ্য অসাধারণ বলে উল্লেখ করেন। আর গ্রামের সাধারণ চাষিদের দারুণ বলে অভিহিত করেন।

মাত্র আধাঘণ্টার ভ্রমণ শেষে রাষ্ট্রদূত মিলার সড়কপথে বরিশালে চলে যান। মাত্র আধাঘণ্টার জন্য কতই না আয়োজন, কত পরিশ্রম। ভোর ৪টা থেকে প্রস্তুতি। রাষ্ট্রদূত চলে যাওয়ার পর গ্রামের হাটে তখন মুখে মুখে রাষ্ট্রদূতের গল্প ছড়াতে থাকে। আবারো কর্মচঞ্চল হয়ে হয়ে ওঠে ভাসমান হাট। পেয়ারা বোঝাই করে নৌকায় নৌকায় চলে বেচাকেনা। পেয়ারা ছাড়াও আমড়া, লেবুসহ মৌসুমি ফল ও সবজির বেচাবিক্রি। আরো ২ মাস জমবে এই ভাসমান হাট। আর দেশি-বিদেশি অসংখ্য পর্যটক এখানে প্রতিদিনই ঘুরে যাবেন জলের হাটের চির সজিব স্মৃতি নিয়ে।