কাশে বরুণে দূর স্ফটিক ফেনায়/ ছড়ানো তোমার প্রিয় নাম/ তোমার পায়ের পাতা সবখানে পাতা/ কোন খানে রাখব প্রণাম? কবি দিনেশ দাসের পক্তি ধার করে আজ এই বিশেষ দিনে আপনার কীর্তি স্মরণ করে বলছি- ‘কোনখানে রাখব প্রণাম’।
বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য নাম আবদুল গাফফার চৌধুরী। ছিলেন এক জীবন্ত কিংবদন্তিও। বেঁচে থাকলে আজ তার নবতিপর জন্মদিনে হয়তো খুশিতে এক মহাকাব্য বা মহাগদ্য লিখে ফেলতেন। অভাবিতপূর্ব ও অনাস্বাদিত ফুলেল শুভেচ্ছায়ও সিক্ত হতেন। কিন্তু না, দুই বছর আগেই তিনি বাবিলনের শূন্য উদ্যানে আসন পেতেছেন। জরাজীর্ণ ভাঙাচোড়া উঁচুনিচু সাদাকালো সমাজ- জীবনের গল্প শুনতে আর লিখতে চাননি হয়তো!
মনুষ্যত্ব-মানবিকতার প্রশ্নে, এ এক অস্থির সময় যাচ্ছে। বিশ্ব বিভক্ত ও পর্যুদস্ত হচ্ছে আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে। শাসন ও শোষণে, নিপীড়ন এবং নিরাপত্তায় এক চতুর আচ্ছাদন, বহুরূপী চরিত্র প্রত্যক্ষ করছে। রক্ষক হচ্ছে ভক্ষক, আবার ভক্ষক হচ্ছে রক্ষক—এই দ্বিচারিতা ও সমানে চলছে। বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই অবাক হতেন। নয়তো বলতেন, এসব দেখে দেখেই তো কূলছাড়া হয়ে, জীবনের পরমায় নিয়ে এখানে, এই নিভৃতে চলে এলাম!
একজন কলাম লেখক কীভাবে জনগণের আবেগ অনুভূতিকে বুঝতে পেরে এবং তাদের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে জনগণের লেখক হয়ে ওঠেন,
গাফফার চৌধুরী তা দেখিয়ে দিয়েছেন। বাংলা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভাবনা গভীরে ব্যস্ত ছিল। ছিল মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনায়ও ভাস্বর হয়ে। তাই অনেক অসংগতি, দুরাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন সুশাসনের অভাব প্রকট হলে, সেখানে ফ্যাসিবাদের জন্ম হয়। আর ফ্যাসিবাদ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য কতটা বিপজ্জনক, সে ব্যাপারে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। কিন্তু সেই পরামর্শকে আমলে নিতে অনীহা ছিল ক্ষমতাগর্বী অনেকেরই। যার ফলে নৈরাজ্যের উত্থান এবং শাসনের বিপর্যয় দেখা গেছে। ভোটাধিকার হরণ করে প্রহসনের নির্বাচন যে মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকারের পরিপন্থী, এই সত্যটি অনেকে মানতে চাননি।
নির্বাচিত-অনির্বাচিত, গণতান্ত্রিক-স্বৈরতান্ত্রিক, দুর্নীতিবাজ ও দুর্নজ্ঞায়নের সরকারগুলোর নেতৃত্ব এবং তাদের পরিণাম তিনি দেখেছেন। যখন যারাই ক্ষমতায় থেকেছে, তখন তারাই আইনের শাসনের পরিপন্থী শাসন কায়েম করেছে। শাসননীতিতে জবাবদিহির বিষয়টিও ছিল উপেক্ষিত। বিষয়গুলো তাকে ভাবিয়েছে। ঠিক কথা যে অকপটে বলতে পেরেছেন তা-ও নয়! তারও কিছু সীমাবদ্ধ ছিল। তবে এ কথা সত্য; বিবেক বিক্রির অপরাধ করেননি। দেশ ও জনগণের অভিপ্রায়ের বিরুদ্ধে গিয়েও দাঁড়াননি। এখানেই তার স্বতন্ত্র পরিচয় স্পষ্ট হয়েছিল।
সেই কোন সুদূরে স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রাবস্থায় পিতৃবন্ধু শ্রীদুর্গামোহন সেনের কাছে এবং তারই সম্পাদনায় প্রকাশিত বরিশাল হিতৈষী পত্রিকায় সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি। তারপর ২০২২ সালে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে তিনি সংবাদপত্রের সঙ্গেই একাত্ম ছিলেন মন ও মানসে! এই সুদীর্ঘ কর্ম ও অভিজ্ঞতার জীবনও এক বিরলতম ঘটনা আমাদের সাংবাদিকতার ইতিহাসে। কলামকে কীভাবে পাঠকপ্রিয় করতে হয়, তা তার চেয়ে আর ভালো কে জেনেছে, কে পেরেছে?
এক জীবনে কত হাজার হাজার কলাম তিনি নিরন্তর লিখে গেছেন সমাজ রাষ্ট্রের উজ্জীবনে, সঠিক পথের দিশা নিতে, তা-ও এক গবেষণার বিষয় বটে! বোধ করি তা সমকালীন বিশ্বে এক বিরল দৃষ্টান্তও। সংখ্যায় এত কলাম দেশে আর কেউ লিখেছেন কী!
ঢাকায় আবদুল গাফফার চৌধুরীর প্রথম সাংবাদিকতা শুরু বলিয়া প্রেস থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক ইনসাফ' পত্রিকায় ১৯৫০ সালে, ৭৫ টাকা মাস মাইনে। ১৯৫১ সালে ঢাকা কলেজের ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্রাবস্থায় ১০০ টাকা মাস মাইনে যোগ দেন নাইট শিফটে দৈনিক সংবাদে। এরপর ১৫০ টাকা বেতনে পুরো ছয় দিন সম্পাদকীয় লেখার দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে এসে যোগ দেন মোহন মিয়ার কাগজ দৈনিক মিল্লাতে। তখন এর কিছুকাল সম্পাদক ছিলেন আব্দুর রব আর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন মোতাহার হোসেন সিদ্দিকী।
আবদুল গাফফার চৌধুরী সেই ইন্টারমিডিয়েট পড়াকালেই শহীদ সোহরাওয়ার্দীর বিরুদ্ধে মর্নিং নিউজের এডিটোরিয়ালের পালটা শক্ত জবাব মিল্লাতের সম্পাদকীয়তে দিতেন। তিনি সেই তরুণ জীবনেই ছিলেন অনেক প্রবীণের সমান দক্ষ ও শক্তিশালী । যেজন্য তার প্রশংসা করতেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মানিক মিয়া, শেখ মুজিবুর রহমানসহ অনেকে। তিনি যে এক বিস্ময়কর প্রতিভা, তা তখনই টের পেয়েছিলেন বিদগ্ধজনরা। এরপর তিনি ১৯৬৭ সালে দৈনিক আজাদে তার বহুল আলোচিত ‘তৃতীয় মত’ কলামে ছয় দফার পক্ষে জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করতেন। লিখতেন তিনি পাকিস্তান টাইমস পত্রিকার সম্পাদক জেড এ সুলেরির লেখা ‘ম্যান অ্যান্ড ম্যাটার’ নামের কলামের পালটা দাঁতভাঙা জবাবও; প্রখ্যাত সাংবাদিক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার স্নেহছায়ায় দীর্ঘদিন তিনি দৈনিক ইত্তেফাকেও সাংবাদিকতা করেছেন এবং কলাম লিখেছেন । তার সেসব কলামও তুমুল আলোড়িত করেছে জনমানসকে। আবদুল গাফফার চৌধুরী দেশ বিদেশের বহু কাগজে রাজনৈতিক কলাম লিখেছেন এবং সে লেখা দ্বারা আলোচিত- সমালোচিতও হয়েছেন। বিশেষ করে, দৈনিক ইত্তেফাকসহ দেশের প্রথম শ্রেণির দৈনিকে তিনি যেসব কলাম লিখেছেন, তা তাকে প্রবল আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। কলাম লেখায় তিনি ছিলেন অপ্রতিরোধ্য এক শক্তি। তিনি অবশ্য এ বিষয়ে অপ্রতিদ্বন্দ্বীও; তার তৃতীয় মত, কাছে দূরে, ধীরে বহে বুড়িগঙ্গা, একুশ শতকের বটতলায় ইত্যাদি নামীয় কলাম তাকে কলামিস্ট হিসেবে বিশেষ পরিচিতি দিয়েছে। আজ এই বিরলপ্রজ সাংবাদিক ও কলামিস্টের জন্মদিনে তাকে স্মরি গভীর শ্রদ্ধায় ।
লেখক: সাংবাদিক
