জাতীয় পুনর্মিলনের সুযোগ যেন হাতছাড়া না হয়

আপডেট : ১৩ ডিসেম্বর ২০২৪, ০০:৪৫

ন্যাশনাল রিকনসিলিয়েশন বা জাতীয় পুনর্মিলনের সুযোগ আমাদের সম্মুখে যতবারই আসিয়াছে, ততবারই আমরা ব্যর্থতার পরিচয় দিয়াছি। ১৯৭২ সালে সদ্যস্বাধীন দেশে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ রাখিবার মহাসুযোগ আসিয়াছিল; কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষের শক্তির কথা বলিয়া জাতির মধ্যে বিভাজনের রেখা টানিয়া দেওয়া হয়। মহান মুক্তিযুদ্ধকালে দেশের অভ্যন্তরে যাহারা অন্যায়- অপকর্ম করিয়াছিল, হত্যা, লুটতরাজ, রাহাজানি ইত্যাদির আশ্রয় লইয়াছিল, তাহাদের প্রচলিত আইনে শাস্তির ব্যবস্থা করিয়া বিরোধ-বিসংবাদের বিষয়টি সেইখানেই ইতি টানা যাইত। ইহার পর ১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তন ও নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানসহ যতবার রাজনৈতিক পরিবর্তন আসিয়াছে, ততবারই আমরা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করিতে দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে পারি নাই।

বাংলাদেশের মানুষ বারংবার তাহাদের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার রক্ষার জন্য জীবন উৎসর্গ করিতেছেন; কিন্তু একসময় তাহাদের সংগ্রামী আকাঙ্ক্ষার কথা আমরা বেমালুম ভুলিয়া গিয়া ব্যক্তি, দলীয় বা গোষ্ঠীগত স্বার্থ হাসিলে ব্যস্ত হইয়া পড়ি। অথচ তাহাদের আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশার বাস্তবায়ন করিতে হইলে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করিয়া জনগণের মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক জোরদারের কোনো বিকল্প নাই। তাই ক্রিমিন্যাল বা অপরাধী যে দলেরই হউক, তাহাদের সাধারণ আইনেই বিচার করা যায়। ইহার পর নির্মূল বা উৎখাতের কথা না বলিয়া কীভাবে সকলকে লইয়া চলা যায়, তাহারই ব্যবস্থা করা দরকার। নতুবা কেন এই পরিবর্তন? সকল কিছু যদি আবার পূর্বের মতো অবস্থানে চলিয়া যায় বা যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়, তাহা হইলে এই পরিবর্তনের কোনো অর্থ হয় না। আমরা দেখিতে পাইতেছি, প্রশাসন পূর্বের মতোই নিয়মকানুন অনুসরণ করিয়া চলিতেছে না। বিশেষ করিয়া স্থানীয় প্রশাসন আগে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতা-পাতি নেতাদের কথামতো চলিত। ন্যায়-অন্যায়ের বাছবিচার করিত না। নির্লজ্জ দলীয়করণ ছিল রন্ধ্রে রন্ধ্রে। সেই প্রশাসন দিয়া ধ্বংস করা হয় নির্বাচন ব্যবস্থাকে। এখন আবার যদি অনুরূপ ব্যবস্থার প্রত্যাবর্তন ঘটে, তাহা হইলে জুলাই-আগস্টের সংগ্রাম ও রক্তদান কি বৃথা যাইবে না?

প্রশাসন যে নিরপেক্ষভাবে বা নিয়মকানুন অনুযায়ী আচরণ করিতেছে না, ইহার জন্য দায়ী কাহারা? নিশ্চয়ই প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনুস কিংবা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের শিক্ষার্থীরা এই জন্য দায়ী নহেন। কাহারা চাঁদাবাজি, নূতন করিয়া সিন্ডিকেট তৈরি কিংবা দখল সংস্কৃতির জন্য দায়ী? স্থানীয় প্রশাসন কাহাদের কথায় ও ইশারায় ঢালাও মামলা দিতেছে কিংবা ভয়ভীতি প্রদর্শন করিতেছে? কাহাদের জন্য দেশে নৈরাজ্য তৈরি হইতেছে কিংবা জন্ম লইতেছে মব সংস্কৃতি? এই প্রশাসন পূর্বের মতোই যাহাকে বা যাহাদের ক্ষমতাবান মনে করে, তাহাদের কথায় চলিতেছে যাহা দুঃখজনক। নিয়োগ-বদলির ক্ষেত্রেও তাহাই ঘটিতেছে। তাই আমরা মনে করি, এই পরিস্থিতি ন্যাশনাল রিকনসিলিয়েশন বা জাতীয় পুনর্মিলনের জন্য প্রতিবন্ধক। আমাদের চাওয়া এই যে, কেহ যেন আর জাতিকে নূতন করিয়া ডিভাইড অ্যান্ড রুলের জাঁতাকলে নিষ্পেষিত করিতে না পারে। এই ব্যাপারে সতর্ক থাকিবার জন্য আমরা অন্তর্বর্তী সরকার, সকল রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও সচেতন নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানাই।

ইত্তেফাক/এসকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন