‘সকলি গরল ভেল’

আপডেট : ১৩ ডিসেম্বর ২০২৪, ০০:৪৪

ইহাই কি দেশে দেশে গণমানুষের ভবিতব্য? দেশবাসী একজন বা একদল শাসকের শাসন অপছন্দ করিয়া ক্ষমতাচ্যুত করিতে রাস্তায় সমবেত হয়। উপেক্ষা করে মৃত্যুভয়, জীবনের মায়া। ডেসপারেট জনতা শাসককে ক্ষমতাচ্যুত করিয়া উল্লাসে ট্যাংকের উপরে উঠিয়া নাচে, যাহা আমরা সম্প্রতি সিরিয়াসহ বিভিন্ন দেশে বারবার দেখিয়াছি। এই রকম একেকটা পরিবর্তনের জন্য মানুষ আগাইয়া আসে আশা লইয়া; কিন্তু দিন কয়েক পার হইলেই দেখা যায়, জ্ঞানদাসের ভাষায় বলিতে হয়, ‘অমিয় সাগরে সিনান করিতে/ সকলি গরল ভেল/ কী মোর করমে লেখি'। অর্থাৎ মানুষের মধ্যে যে আশা পুঞ্জীভূত দেখা দেয় তাহা নিরাশায় পরিণত হয়; তাহার মধ্য হইতে খাদ বাহির হইয়া আসে।

নূতন নহে। বিপ্লব, আন্দোলন, সংগ্রাম— যাহাই আমরা বলি না কেন, তাহা দেখিয়া আসিতেছি ইতিহাস হইতে। রঙিন স্বপ্নে বুনন করা আন্দোলনের মধ্য দিয়া আসা পরিবর্তন নিমেষে ফিকে হইয়া যায়। যাহারা ভাগ্যের পরিবর্তনের আশা করেন, সমাজ পরিবর্তনের আশা করেন এবং অর্থনৈতিক বেটারমেন্টের আশা করেন, তাহারাই বলিতে শুরু করেন, ‘এই পরিবর্তনে কেবল এক দলের লাভ হইয়াছে, এক ব্যক্তির লাভ হইয়াছে, আমরা যেই তিমিরে ছিলাম, সেই তিমিরেই রহিয়া গিয়াছি। এই মোহভঙ্গ কি কেবল তাহাদের নিজেদের কারণেই ঘটে? মোটেই না। যাহারা জনগণকে আশা জাগিয়া উঠিতে উদ্বুদ্ধ করেন, তাহারা ক্ষমতায় যাইয়া বিগত শাসনের কী কী ত্রুটি ছিল, সেই পাঁচালিতে মত্ত হইয়া উঠেন; কিন্তু ততক্ষণে জনগণের মৌলিক মানবিক চাহিদাসমূহ আরো তীব্র হইয়া উঠিতে থাকে, যাহা নূতন শাসকগোষ্ঠী গুরুত্ব দিয়া যাচাই করেন না। এই বিষয়টিও আমরা ইতিহাসব্যাপী দেখিয়াছি। আমাদের ইতিহাসেই প্রায় সকল আন্দোলন-সংগ্রামের ফলাফল তাহাই বলে। ১৯৪৭ সালে ঝাঁপাইয়া পড়িয়া তাহার পর মোহভঙ্গ হইতে সময় ব্যয় হয় নাই, ১৯৭১ সালে আবার যেই আশা লইয়া মানুষ ঝাঁপাইয়া পড়িয়াছিল তাহা পূরণ হয় নাই, ১৯৯০ সালে আন্দোলনের পর যেই রাজনৈতিক রূপরেখা বাস্তবায়নের স্বপ্ন দেখিয়াছিল দেশবাসী তাহা পূরণ হয় নাই এবং অচিরেই মানুষ হতাশ হইয়াছে। হয়তো সেই দিক লক্ষ্য করিয়াই বর্তমান বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় লেখক পাওলো কোয়েলহো বলিয়াছেন, ‘জনগণের একে অপরকে বোঝা খুবই জরুরি, শাসকই হউক বা সাধারণ কেউ হউক। যদি তাহারা একে অপরকে সঠিকভাবে বুঝিতে পারে, তাহা হইলেই কেবল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতাগুলি দূর হইতে পারে। আর তাহা করিতে গেলে পার্শ্বের লোকটিকে, সম্মুখের লোকটিকে এইভাবে বুঝিতে হইবে যে, দিন শেষে সকলের সমস্যা এক, সকলের প্রশ্ন এক।' দুঃখের বিষয় এই বোধ শাসকদের মধ্যে না থাকিবার কারণে তাহারা জনগণের পালস বুঝিতে পারেন না এবং আবার ঘটনা বা দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে।

এই ধারাবাহিকতারও, এই চিরাচরিত বিড়ম্বনারও একটি শেষ থাকা প্রয়োজন। হয়তো কোনো দিন শেষ হইবে না। ‘বারো মণ ঘিও পড়িবে না, রাধাও নাচিবে না'—এমন পোড়ামুখো উক্তিতে আমরা বিশ্বাস করিতে চাহি না। যাহারা দেশ শাসনের দায় কাঁধে গ্রহণ করেন, তাহাদেরকে সম্মুখপানে চাহিতে হইবে। ইহার পাশাপাশি বিচক্ষণতার সহিত সার্বিক পরিস্থিতি মোকাবিলা করিতে হইবে। মনে রাখিতে হইবে–‘কাকাবাবুর কাকাতুয়া’রা রহিয়াছে আশপাশেই। ইহাও মনে রাখা বাঞ্ছনীয় যে, অ্যারিস্টটল বলিয়াছিলেন' Man is by nature a political animal. শুধু সিরিয়া নহে, সকল ক্ষেত্রে যাহারা আন্দোলন পরবর্তী সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করিতেছেন, আমরা তাহাদের জন্য শুভকামনা করি; কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য ধৈর্য, স্থিরতা, বিচক্ষণতার যে পরিচয় দিতে হয় তাহার ঘাটতি থাকিলে পরিণতি যে ভালো হয় না, তাহা ইতিহাস সাক্ষী দেয়।

ইত্তেফাক/এসকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন