ব্যর্থতার গল্পই উন্নয়নশীল বিশ্বের নিয়তি!

আপডেট : ১২ ডিসেম্বর ২০২৪, ১৫:৩৫

রাজনীতিতে গ্রাচো মার্কসের একটি উক্তি বহুল প্রচলিত। তাহার ভাষায়, 'রাজনীতি হইল সমস্যার অনুসন্ধান করা, সকল জায়গায় ইহার খোঁজ করা, ইহার ভুল নির্ণয় করার শিল্প।' রাজনীতিকে মূলত এই জন্য অবিহিত করা হয় ‘ভুল হইতে শিক্ষা গ্রহণের বিজ্ঞান' হিসাবে। তবে পরিতাপের বিষয় হইল, উন্নয়নশীল বিশ্বের রাজনৈতিক নেতৃত্ব যেন এই বিজ্ঞান মানিতে চাহে না! তাহারা সমস্যার অনুসন্ধান না করিয়া বরং বিগত শাসক বা সরকারগুলির ব্যর্থতা ও ভুলত্রুটির ফিরিস্তি লইয়া আলোচনাতেই অধিক ব্যস্ত হইয়া উঠেন। বিশেষত রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এই প্রবণতা বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলিয়া যায়। এই সংস্কৃতি গ্রহণীয় নহে। কারণ, ক্ষমতায় থাকাকালে সরকার কিছুই করে না—এমন দাবি নিঃসন্দেহে অবান্তর। আমরা যদি আমাদের স্বাধীনতার বিগত প্রায় সাড়ে চার যুগের পথপরিক্রমা বিশ্লেষণ করি, তাহা হইলে বিগত সময় জুড়িয়া এই জনপদকে যিনি বা যাহারা পরিচালনা বা শাসন করিয়াছেন, তাহাদের অবদানকে অস্বীকার করিতে পারিব না। স্বাধীনতার পূর্বের এবং বর্তমানের বাংলাদেশের চিত্র এক নহে। আজিকার বাংলাদেশকে ‘ভুখা-নাঙ্গা দেশ” বলিয়া কেহ তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার সাহস করিবে? অবশ্যই না। সুতরাং, বিগত শাসকদের আমরা পুরাপুরি ব্যর্থ বলিব কী করিয়া?

বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমরা অনেক উন্নতি করিয়াছি। উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত আজ উন্নয়ন দৃশ্যমান। যেইখানে একসময় ঝুপড়ি ছিল, সেইখানেও নির্মিত হইয়াছে পাকা দালান। দেশব্যাপী জালের মতো ছড়াইয়া গিয়াছে সেতু-ব্রিজ, কালভার্ট। কেবল অবকাঠামো নহে, কানেকটিভিটির প্রশ্নেও আমাদের উন্নতি ঈর্ষণীয়। বর্তমানে দেশের অর্থনীতির যেই আকার, সেইখানেও স্বাধীনতার পূর্বের সময়কার বিবেচনায় আকাশ-পাতাল ব্যবধান চোখে পড়িবে। এই সকল উন্নতি নিশ্চয়ই এক দিনে হয় নাই। এই অর্থে, বিগত সরকারগুলির অবদান স্বীকার করিতেই হয়। তাহারা ব্যর্থ হইলে বা আদৌ কাজ না করিলে স্বভাবতই দেশের উন্নতি তো দূরের কথা, রাষ্ট্রের অস্তিত্বই টিকিয়া থাকিত না। সুতরাং, বিগত সরকারের ব্যর্থতার চিত্র বড় করিয়া না দেখিয়া বরং যেই সকল ক্ষেত্রে ‘সমস্যা' চোখে পড়ে, তাহার সমাধানের বিষয়ে মনোনিবেশ করা বিচক্ষণতা।

সরকার পরিচালনায় ভুলভ্রান্তি হওয়া অস্বাভাবিক নহে; কিন্তু ব্যর্থতার দায় কেবল সরকারের একার হইতে পারে না। বরং এই ক্ষেত্রে জনগণকেও নির্দোষ বলা যায় না। আমরা যদি দেশের নদী বা খালগুলির দখলদূষণের কথা বলি, ইহার জন্য কি কেবল সরকার দায়ী? জনগণের সুবিধার্থে সরকার নদী বা খাল খনন করিয়া দেয়; কিন্তু একটি সময়ে আসিয়া সেই খাল বা নদীকে আমরা মৃতপ্রায় অবস্থায় আবিষ্কার করি। আমরা অনুসন্ধান করিয়া দেখি না, কেন এহেন অবস্থার সৃষ্টি হইল। একটি নদী বা খাল সচরাচর বিভিন্ন অঞ্চলের উপর দিয়া প্রবাহিত হয়। সুতরাং, উহার স্বাভাবকি প্রবাহ বজায় রাখিবার ব্যাপারে সেই সকল অঞ্চলের বাসিন্দাদেরও দায়িত্ব রহিয়াছে। একইভাবে, করুণ দশায় নিপতিত বিভিন্ন স্থাপনা, অবকাঠামো বা অফিস-আদালতের সমস্যাসংকুল অবস্থার জন্য সরকারের পাশাপাশি জনতার হাত থাকে কোনো না কোনোভাবে। ইহার কারণ, আমরা মূলত খুবই ‘ইনডিসিপ্লিনড' তথা বিশৃঙ্খল জাতি। এইখানে না রাস্তায় শৃঙ্খলা আছে, না অফিস-আদালতে কিংবা নিজের গৃহে। উপরন্তু কোনো একটি সমস্যা দেখা দিলে আমরা তাহা মেইনটেন্যান্স করা বা সারাইয়া তুলিবার বিষয়ে উদাসীনতা দেখাই। আমরা এতটাই ‘সেলফ ডেসট্রাকটিভ' জাতি যে, নিজেরাই পদে পদে সমস্যা সৃষ্টি করি, তাহা লইয়া হা-হুতাশ করি এবং দিন শেষে সরকারের উপর দোষ চাপাইয়া দায়মুক্ত হই। এই প্রবণতা দিনদিন বাড়িতেছেই।

রাষ্ট্রের পরিসর অতি বৃহৎ ও সুবিশাল বিধায় রাষ্ট্র পরিচালনায় ত্রুটিবিচ্যুতি থাকিবেই। এই অবস্থায় ভুল শুধরাইবার পরিবর্তে অন্যের দোষত্রুটির ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নিষ্প্রয়োজন। অর্থাৎ, সরকার পরিবর্তনের পর নূতন সরকার বা শাসকগোষ্ঠীর উচিত হইল, বিগত সরকারগুলির সমালোচনায় পঞ্চমুখ না হইয়া বরং কোনোখানে সমস্যা পরিলক্ষিত হইলে তাহার সমাধানের পথ বাহির করা। ইহার ফলে জনগণের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হইবে। অন্যথায় একটি সময়ে ক্ষমতার বাহিরে বসিয়া তাহাদেরকেও একই ‘ব্যর্থতার গল্প' শুনিতে হইবে। রাজনীতিবিদদের যাহাতে সেই পরিস্থিতির মুখোমুখি হইতে না হয়, সেই জন্য তাহাদের উদ্দেশে বারবার আহ্বান জানানো হয়— ‘মাইন্ড ইওর ল্যাংগুয়েজ', তথা বুঝিয়াশুনিয়া এবং ভাবিয়া-চিন্তিয়া কথা বলুন।

ইত্তেফাক/এসকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন