ইতিহাসের গতিপথে মানবজাতি বারংবার আন্দোলন ও বিপ্লবের মধ্য দিয়া নূতন সময়ে পদাপর্ণ করিয়াছে। তবে তাহাদের অধিকাংশই কেবল একটি নতুন আশার জন্ম দিয়াই নিরাশার অতল গহ্বরে নিমজ্জিত হইয়াছে। প্রশ্ন উঠে, ইহাই কি মানুষের ভবিতব্য? এই চক্র কি চিরকাল চলিতে থাকিবে?
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মানুষ বারংবার শাসনের পরিবর্তনের লক্ষ্যে বিপ্লব ও আন্দোলনের পথে যাত্রা করিয়াছে; কিন্তু অধিকাংশ সময় প্রত্যাশার রঙিন স্বপ্নসমূহ কিছুদিন পর ক্রমশ ধূসর হইতে থাকে। ম্যাকিয়াভেলি তাহার বিখ্যাত গ্রন্থ 'দ্য প্রিন্স'-এ বলিয়াছেন, 'শাসকের জন্য ক্ষমতা অর্জন করিতে যতখানি দক্ষতা প্রয়োজন, তাহার চাইতে বহু গুণ প্রয়োজন ক্ষমতা টিকাইয়া রাখিবার জন্য প্রজ্ঞা ও ন্যায়বোধ।' প্লেটো এই ক্ষেত্রে আমাদের স্মরণ করাইয়া দেন যে, শাসকের জ্ঞান ও ন্যায়ের অভাব গণমানুষের দুঃখদুর্দশার মূলে রহিয়াছে। ইতিহাস সাক্ষী, মানুষের শাসনব্যবস্থা যত পরিবর্তিত হইয়াছে, ততই নূতন শাসকের সীমাবদ্ধতাগুলি পূর্বের শাসকের ত্রুটিগুলিকে প্রতিস্থাপিত করিয়াছে।
উদাহরণস্বরূপ, ফরাসি বিপ্লবের সময় মানুষ 'স্বাধীনতা, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব'-এর পতাকা উড়াইয়া শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন চাহিয়াছিল; কিন্তু রোবসপিয়ারের যুগে তাহারাই দেখা পাইয়াছিল গিলোটিনের রক্তাক্ত চিত্র। জন লকের ভাষায় বলিতে হয়, 'যাহারা স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করিয়া সফল হয়, তাহাদের চিরকাল সতর্ক থাকা প্রয়োজন; কেননা একপ্রকার অত্যাচারী শাসককে সরাইয়া আনিয়া আরেক প্রকার অত্যাচারী শাসক স্থাপন করা কোনো দুর্লভ ঘটনা নহে।'
এইগুলি ইতিহাসের ও বিভিন্ন রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর কথা। আমরা যদি সাম্প্রতিক ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করি, তাহা হইলে দেখিতে পাই-সিরিয়া, মিশর বা লিবিয়ার মতো রাষ্ট্রে শাসক বদলের যেই প্রক্রিয়া সংঘটিত হইয়াছে, তাহা জনগণকে প্রতিশ্রুতির বিপরীতে কেবল আরেক ধাপ অনিশ্চয়তার পথে লইয়া গিয়াছে। আধুনিক শাসনব্যবস্থার অন্তর্নিহিত সমস্যা ইতিহাসের বিভিন্ন আন্দোলনের ব্যর্থতার পেছনে শাসকদের সীমাবদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গি বড় ভূমিকা রাখে। মিশেল ফুকোর দৃষ্টিতে, 'ক্ষমতার প্রকৃতিই হইল অসাম্য সৃষ্টি করা এবং ইহার ফলে ক্ষমতার ব্যালান্স সর্বদা জনসাধারণের বিপক্ষে ঝুঁকিয়া থাকে।' তাহারা জনগণের মনের ইচ্ছা বুঝিতে ব্যর্থ হন, তাহার প্রয়োজনীয়তাকে উপেক্ষা করিয়া কেবল আপন স্বার্থের পথে গমন করেন। উপরন্তু, রাষ্ট্র ও সমাজের উন্নয়নের জন্য যে প্রাজ্ঞ নেতৃত্ব ও সমবেদনার প্রয়োজন, তাহা অনুপস্থিত থাকিলে শাসনের মূল লক্ষ্যবস্তু ব্যর্থ হয়। এই জন্য গ্রিক দার্শনিক প্লেটো তাহার 'দ্য রিপাবলিক' গ্রন্থে বলিয়াছিলেন, 'শাসকের মধ্যে যদি প্রজ্ঞা, ন্যায়পরায়ণতা ও নৈতিকতার অভাব থাকে, তাহা হইলে সেই রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ অন্ধকার।'
একইভাবে এডমুন্ড বার্ক বলিয়াছিলেন, 'একটি সভ্য সমাজের মূল ভিত্তি হইল ঐতিহ্য ও সংযম: যদি মানুষ তাহাকে উন্মাদনার পথে ধ্বংস করিতে উদ্যত হয়, তাহা হইলে তাহাদের দুঃখের সীমা থাকিবে না।' সমান্তরাল সুরে ইংরেজ দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল স্পষ্ট করিয়া বলিয়াছিলেন, 'যে বিপ্লব মানুষের নৈতিক উন্নয়ন ঘটাইতে ব্যর্থ হয়, তাহা কেবল শাসনব্যবস্থার এক রূপ হইতে আরেক রূপে স্থানান্তর ব্যতীত কিছুই নহে।' অন্যদিকে, আমেরিকান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল পি হান্টিংটন তাহার 'পলিটিক্যাল অর্ডার ইন চেঞ্জিং' সোসাইটিস গ্রন্থে বলিয়াছেন, 'সমাজ যখন দ্রুত পরিবর্তনের মুখোমুখি হয় এবং শাসকের নীতি সেই পরিবর্তনের গতি অনুসরণ করিতে ব্যর্থ হয়, তখন বিশৃঙ্খলা অনিবার্য।'
সুতরাং আমরা বহু ক্ষেত্রেই দেখিতে পাই, বিপ্লবের পথ যতই রঙিন ও আশাব্যঞ্জক হউক, তাহার ফলাফল সকল সময় একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন রাখিয়া যায়। ইহা ঠিক যে, যুগের পর যুগ ধরিয়া গাঁথিয়া থাকা সমস্যার সমাধান রাতারাতি সম্ভব নহে। সমন্বিত প্রচেষ্টা ও নেতৃবৃন্দের বিচক্ষণতা একমাত্র ইহার সমাধান আনিতে সক্ষম। তাহার পূর্বে ইহাই বলিতে হয়-শাসনের পথে বিচক্ষণতা, সহমর্মিতা ও ন্যায়ের মূল্যায়ন ব্যতীত কোনো বিপ্লব বা আন্দোলনই দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও উন্নয়ন আনিতে পারে না। ইতিহাস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা তাহারই সাক্ষ্যদান করেন।
