বুদ্ধিজীবীরা একটি জাতির মস্তিষ্ক

আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৩:৪০

তাহারাই একটি জাতির উন্নয়নের মূল দিশারি, যাহারা সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদান করিয়া জাতিকে অন্ধকার হইতে আলোকের ঝরনাধারায় আনয়নে সহায়তা করেন। একটি দেশের বুদ্ধিজীবীরা সেই ভূমিকাই পালন করিয়া থাকেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পরিকল্পিতভাবে বুদ্ধিজীবী নিধনকার্য সম্পাদন করিয়াছিল। ১৪ ডিসেম্বর তাহারা এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে সদ্য স্বাধীন জাতিকে নেতৃত্ব ও জ্ঞানবুদ্ধিতে অন্ধকারে নিমজ্জিত রাখিবার মরিয়া চেষ্টা করিয়াছিল। বলিবার অপেক্ষা রাখে না, একাত্তরে আজকের দিনে বুদ্ধিজীবীদের হত্যার পিছনে ছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সুগভীর ষড়যন্ত্র। তাহারা যথার্থই বুঝিয়াছিল-একটি জাতির বুদ্ধিজীবীরা তাহাদের উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি। চিকিৎসা, শিক্ষা, প্রকৌশল, সাহিত্য, সংস্কৃতি- প্রতিটি ক্ষেত্রেই বুদ্ধিজীবীরা জাতিকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন। তাহারা জাতির অগ্রগতির ট্রেনকে লাইনচ্যুত হইতে দেন না। তাই, তাহাদের নির্মূল করিয়া একটি জাতির নিউক্লিয়াসে বুদ্ধিবৃত্তিক শূন্যতা সৃষ্টির চেষ্টা চালাইয়াছিল। দৃশ্যত, স্বাধীনতার পর অর্ধশতাব্দী অতিবাহিত হইলেও আমরা এখনো সেই শূন্যতা পূরণ করিতে সক্ষম হই নাই। বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৯৭১ সালে ছিল আনুমানিক সাড়ে ৭ কোটি। আজ তাহা বৃদ্ধি পাইয়া ১৮ কোটির অধিক হইয়াছে। কিন্তু এই বর্ধিত জনসংখ্যার সহিত তাল মিলাইয়া বিভিন্ন খাতে বিশেষজ্ঞ তথা বুদ্ধিজীবীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায় নাই। উলটা, অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের দক্ষতার অভাব প্রকট হইয়া উঠিয়াছে। চিকিৎসাক্ষেত্রে পর্যাপ্ত ডাক্তার ও গবেষকের অভাব, শিক্ষাক্ষেত্রে গুণমানের শিক্ষকসংকট, প্রকৌশল ও প্রযুক্তিক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞের ঘাটতি-এই সবই আমাদের উন্নয়নযাত্রাকে মন্থর করিয়াছে। আমাদের উন্নয়নযাত্রার যেই ট্রেন, উহার ইঞ্জিন সময়োপযোগী উন্নত নহে, এই ট্রেন চলিবার জন্য যেই রেললাইন রহিয়াছে, তাহা নড়বড়ে। ফলে আমরা যতখানি আগাইতে পারিতাম, ততখানি পারিতেছি না।

আমাদের স্মরণ করিয়া রাখিতে হইবে, বুদ্ধিজীবীরা একটি জাতির মস্তিষ্ক, আর এই মস্তিষ্ক ব্যতীত কোনো জাতি উন্নতির শিখরে পৌঁছাইতে পারে না। তাই, জাতিকে অন্ধকার হইতে আলোর পথে আনিতে বুদ্ধিজীবী তৈরির উপর সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করাটাই আমাদের অন্যতম মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। বিশ্বের উন্নত দেশসমূহের দিকে তাকাইলে দেখা যায়, তাহাদের উন্নতির মূলে বুদ্ধিজীবীদের অবদান অপরিসীম। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া প্রভৃতি দেশ তাহাদের প্রযুক্তি ও গবেষণায় যেই বিপ্লব ঘটাইয়াছে, তাহার পিছনে ছিল অগণিত মেধাবী ব্যক্তিদের নিরলস প্রচেষ্টা। দার্শনিক সক্রেটিস বলিয়াছিলেন, 'একটি জ্ঞাননির্ভর সমাজই উন্নত সমাজ।' এই উক্তি বাস্তবায়নে উন্নত দেশগুলি সর্বদা গুরুত্ব প্রদান করিয়াছে। অথচ, বাংলাদেশে আমরা এই বিষয়ে এখনো যথাযথ গুরুত্ব দিতে পারি নাই। বুদ্ধিজীবী নিধনের কারণে আমরা যেই ক্ষতির সম্মুখীন হইয়াছি, তাহা কেবল অতীতের শূন্যতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নাই। বরং এই ঘাটতি আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে ক্ষতিগ্রস্ত করিতেছে। শিক্ষাক্ষেত্রে মানহীন শিক্ষা ও গবেষণার অভাব, স্বাস্থ্যসেবায় মানসম্মত সেবার সংকট, শিল্প ও বাণিজ্যে উদ্ভাবনের অভাব-এসবই প্রমাণ করে যে, আমরা এখনো বুদ্ধিজীবী সৃষ্টির ক্ষেত্রে পিছাইয়া আছি।

এই ঘাটতি পূরণ করিবার জন্য জাতিকে সর্বাগ্রে একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করিতে হইবে। শিক্ষা ও গবেষণার উপর অধিক গুরুত্ব প্রদান করিয়া নতুন প্রজন্মকে জ্ঞানবিজ্ঞান, শিক্ষা-সংস্কৃতি এবং প্রযুক্তির বিভিন্ন ক্ষেত্রে উৎসাহিত করিতে হইবে। বুদ্ধিজীবী সৃষ্টির জন্য শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল সংস্কার আনিয়া গুণমান বৃদ্ধি করিতে হইবে। জাতির প্রত্যেক স্তরে জ্ঞানের চর্চা এবং গবেষণার প্রসার নিশ্চিত করিতে হইবে। যাহারা ১৯৭১ সালে আমাদের মেধা নিধন করিয়াছিল, তাহাদের উদ্দেশ্য ছিল জাতির উন্নয়নকে থামাইয়া দেওয়া। কিন্তু আমাদের এখন প্রয়োজন সেই ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করিয়া দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে মেধার বিস্তার ঘটানো। তাহার মাধ্যমেই আমরা ১৪ ও ১৫ ডিসেম্বরের শহিদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানাইতে পারিব।

ইত্তেফাক/এনএন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন