সগৌরবে ও স্বমহিমায় ৭২ বছরে দৈনিক ইত্তেফাক

 

আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর ২০২৪, ১২:২৫

বাংলাদেশের অত্যন্ত প্রাচীনতম এবং শীর্ষ স্থানীয় সংবাদপত্র দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার ৭২ বছরে পদার্পণে অনেক অন্তহীন শুভেচ্ছা।  এই মাহেন্দ্রক্ষণে অত্র পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সাংবাদিকতার প্রবাদ পুরুষ তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। প্রথিতযশা সাংবাদিক মানিক মিয়ার ছিল দেশপ্রেম আর মানুষের প্রতি অকুণ্ঠ ভালোবাসা। কোনো ভয়ভীতি, প্রলোভন, নির্যাতন, জেল-জুলুম তাকে তার আদর্শ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। তার তেজস্বী ও ক্ষুরধার লেখনী কলম কোনোভাবে পাকিস্তানি জান্তা সরকার দমাতে পারেনি। পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে সত্, সাহসী সাংবাদিকতার পরাকাষ্ঠায় দাঁড়িয়ে এ দেশের স্বাধীনতার স্বপ্নেও তিনি বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছেন। মানিক মিয়াকে তার দেশের জন্য অসামান্য আত্মত্যাগ ও অবদান জাতি আজীবন শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে।

ইতিহাস মতে, ১৯৪৯ সালের ১৫ আগস্ট সাপ্তাহিক হিসেবে ইত্তেফাক পত্রিকা যাত্রা শুরু করে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে বাংলা ভাষা আন্দোলনের মিছিলে গুলিবর্ষণ ও হত্যার সংবাদ ২২ ফেব্রুয়ারি এ পত্রিকায় প্রকাশ করলে, তা দ্রুতই সারা দেশে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করে। ১৯৫৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর দৈনিক হিসেবে ইত্তেফাক পত্রিকা যাত্রা শুরু করে। সে সময় তত্কালীন পশ্চিম পাকিস্তান সরকার পূর্ব পাকিস্তানিদের ওপর বিভিন্ন নির্যাতন ও বৈষম্যের সংবাদ এই পত্রিকায় নিয়মিত প্রকাশ করা হতো। যা ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টকে বিজয়ী করতে বিরাট ভূমিকা রাখে।

১৯৫৮ সালে ৭ অক্টোবর সামরিক শাসন জারি হওয়ার পর সম্পাদক মানিক মিয়া সামরিক শাসনের সমালেচনা করে বিভিন্ন কলাম শুরু করেন। ফলে ১৯৫৯ ও ১৯৬৯ সালের সালে তিনি গ্রেফতার হন। ১৯৬৪ সালের জানুয়ারিতে পূর্ব পাকিস্তানে দাঙ্গা শুরু হলে ১৬ জানুয়ারি মানিক মিয়া পত্রিকা অফিসে সভা করে ‘পূর্ব পাকিস্তান রুখে দাঁড়াও’ শীর্ষক প্রচারণা শুরু করেন। ১৯৬৬ সালে ইত্তেফাক ছয় দফা দাবির পক্ষে অবস্থান নিয়ে আওয়ামী লীগের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করে। ১৬ জুন সরকার ইত্তেফাক পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ করে ও প্রিন্টিং প্রেস বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করে। ১৯৬৯ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি পত্রিকাটি পুনঃপ্রকাশের অনুমতি পায়। একই বছরের ১ জুন অকুতোভয় সৈনিক মানিক মিয়া মৃত্যুবরণ করলে জাতির অপূরণীয় ক্ষতি হয়। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ইত্তেফাকের কার্যালয় পুড়িয়ে দেয় পাকিস্তান সেনাবাহিনী। তাই বাংলাদেশ আর এ পত্রিকার ইতিহাস এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

দৈনিক ইত্তেফাক বাংলার ইতিহাসের ধারক ও বাহক। স্বাধীনতার পটভূমি রচনায় এ পত্রিকার অবদান অনস্বীকার্য। বাংলার অস্তমিত সূর্য ছিনিয়ে আনার দুর্বার মিছিলে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিল ইত্তেফাক পত্রিকা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রার ইতিহাসের অপরিহার্য অংশ এ পত্রিকা। পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীর স্বৈরতন্ত্র, অর্থনৈতিক শোষণ, জেল-জুলুম, নিপীড়ন, নির্যাতন, বৈষম্য, বঞ্চনা, অপশাসনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর ছিল ইত্তেফাক পত্রিকা। দেশ ও জাতির ক্রান্তিলগ্নে সাহসী ভূমিকা পালন করছে এ সংবাদপত্র। ইত্তেফাকের উদ্ভব ঘটেছিল গণমানুষের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হিসেবে। দেশ বিভাগের সূচনালগ্ন থেকে এ গণমাধ্যমটি আমজনতার অধিকারের কথা বলে আসছে। ব্যাবসায়িক মনোবৃত্তি নিয়ে এই পত্রিকার সৃষ্টি হয়নি।

নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য অনেকে পত্রিকার উদ্ভব ঘটেছে, আবার অনেক পত্রিকা কালের গহ্বরে হারিয়ে গিয়েছে। কিন্তু লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল মহত্ ছিল বলেই সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে এ পত্রিকা সুদীর্ঘকাল ব্যাপী অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখেছে। এত প্রাচীন পত্রিকা শুধু দেশে নয়, বিশ্বে থাকলেও তা হবে হাতেগোনা কয়েকটি। দীর্ঘ এক কণ্টকাকীর্ণ অতিক্রম করে দৈনিক ইত্তেফাক তার অভিষ্ট লক্ষ্যে উপনীত হয়। সগৌরবে, আত্মমর্যাদায় ও সুনামের সঙ্গে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এ পত্রিকাটি। আমরা লেখক, পাঠক সবাই এ গৌরবে গৌরাবান্বিত। দেশের সুপ্রাচীনতম পত্রিকা দৈনিক ইত্তেফাক সুদীর্ঘ সাত দশক বাংলাদেশের সংবাদপত্র ইতিহাসের একটি মাইল ফলক। সত্য প্রকাশে সবসময় আপসহীন ইত্তেফাক। দুর্নীতি রোধে দেশের এ সংবাদপত্র সবসময় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। অন্যায়, অনিয়ম, দুর্নীতির বিরুদ্ধে এ  গণমাধ্যম সবসময় সোচ্চার ভূমিকা রেখেছে।

আধুনিকতা, মুক্তচিন্তার দৈনিক ইত্তেফাক দেশের সর্বাধিক প্রচারিত ও পাঠকপ্রিয় পত্রিকা। এই পত্রিকা শুধু মুদ্রণ সংস্করণে নয়, অনলাইন সংস্করণেও এখন পাঠকের প্রিয়তার শীর্ষে অবস্থান করছে। পাঠকের প্রত্যাশা পূরণ করে ইত্তেফাক নন্দিত গণমাধ্যমে পরিণত হয়েছে। সত্য প্রকাশে অকুতোভয় এ পত্রিকা বস্তুনিষ্ঠ ও তথ্যনির্ভর সংবাদ বঞ্চিত, অবহেলিত জনপদের সংবাদ পরিবেশনের অন্যন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। কালের পরিক্রমায় এ সংবাদপত্র দেশের শীর্ষ ও অন্যতম জনপ্রিয় পত্রিকায় উপনীত হতে সক্ষম হয়েছে। ছয় দশকে অগণিত পাঠকের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছে এ দৈনিক। গৌরবময় পথচলায় দৈনিক ইত্তেফাক বাংলার আপামর পাঠকের মনে স্থান করে নিয়েছে।

ইত্তেফাক ক্রমান্বয়ে নিজস্ব স্বকীয়তায় দেশের সংবাদপত্র জগতে অন্যন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। এ পত্রিকার প্রতিটি বিষয়ভিত্তিক বিভাগ বিশেষ করে শব্দশৈলী, শব্দ চয়ন, প্রাঞ্জল ভাষা ও সম্পাদকীয়তে নৈপুণ্যতা রয়েছে। প্রযুক্তির উত্কর্ষতার কল্যাণে এ পত্রিকা অন্যান্য সংবাদপত্রের ন্যায় তারও আঙ্গিকে আধুনিকতার ছোঁয়া এসেছে বটে, কিন্তু আধুনিকতার স্রোতে গা ভাসিয়ে দেয়নি এখনো। তার বিশ্বস্ততার স্থানটি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। সুদীর্ঘ পথচলায় ইত্তেফাক দেশের অনেক সাংবাদিক, লেখক সৃষ্টি করেছে। আমার পিতা ও পিতামহ দৈনিক ইত্তেফাক ও চট্টগ্রামের আজাদী পত্রিকার নিয়মিত পাঠক ছিলেন। বাবা আর দাদা দুজনই আদালতের জুরার বা বিচারক ছিলেন। তাছাড়া পিতামহ সুদীর্ঘ ৩৬ বছর ইউপি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন।

সংগত কারণে তাদের প্রতিনিয়ত দেশ বিদেশের খবরাখবর রাখতে হতো। কিন্তু গ্রাম হওয়ায় হকার দুই-এক দিন পর বাড়িতে পত্রিকা পৌঁছাত। তাদের মতো শৈশব থেকে এ পত্রিকার সঙ্গে আমারও দারুণ সখ্য হয়। ফলে আমিও এ পত্রিকার এক জন নিয়মিত পাঠক হয়ে যাই। সে থেকে অদ্যাবধি ইত্তেফাক আমার অত্যন্ত প্রিয় পত্রিকা। প্রবাসে প্রতিদিন অনলাইনে ইত্তেফাকের সংবাদ না পড়লে যেন ঘুমই হয় না। আমি বিভিন্ন উপ-সম্পাদকীয় পাতায় লিখে এ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত থাকার সৌভাগ্য হয়েছে।

সংবাদপত্র সভ্যতার মেরুদণ্ড, জাতির বিবেক এবং একটি দেশের হূিপণ্ড। সংবাদপত্র সমাজের দর্পণ ও মুক্ত চিন্তার মাধ্যম। আমাদের সামাজিক জীবনের নানা ঘটনা প্রবাহের চিত্র আমরা দেখতে পাই সে দর্পণে। তথ্যনির্ভর ও  বস্তুনিষ্ঠ সংবাদই দুর্নীতি রোধে সহায়ক হতে পারে। একটি দুর্নীতিমুক্ত ও শান্তিময় বাংলাদেশ গড়তে সংবাদপত্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদপত্রে সাংবাদিকদের ক্ষুরধার লেখনীর প্রভাবে কিছুটা হলেও সমাজের দুর্নীতি, অনিয়ম, ও অনাচার প্রশমিত হয়। সংবাদপত্র থেকে দুর্নীতি ও অনিয়ম সংক্রান্ত ঘটনাবলির বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ প্রতিবেদন বা সংবাদ সচেতন পাঠকসমাজ অবশ্যই প্রত্যাশা করে। সত্য, বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশন করা সাংবাদপত্রের পবিত্র দায়িত্ব। গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে এবং  শোষণমুক্ত সমাজ বিনির্মাণে সংবাদপত্রের ভূমিকা অপরিসীম।

আশা করি, ইত্তেফাক পত্রিকা অতীতের ন্যায় বস্তুনিষ্ঠতা এবং নিরপেক্ষতা  সমুন্নত রেখে সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে অন্যন্য ভূমিকা রাখবে। পাঠকের আস্থা আর ভালোবাসাকে পাথেয় করে এগিয়ে যাক ইত্তেফাক।

 লেখক :কলামিস্ট

 

 

 

ইত্তেফাক/এসএএস

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন