সড়ক মৃত্যুকূপ হইয়া উঠিয়াছে!

আপডেট : ২৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৩:৪১

দেশব্যাপী ক্রমবর্ধমান হারে ঘটিতেছে সড়ক দুর্ঘটনা। নৈরাজ্যে ভরা সড়ক-মহাসড়কগুলি হইয়া উঠিয়াছে 'মৃত্যুকূপ'। পরিস্থিতি দেখিয়া মনে হইতেছে, সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষয়ক্ষতিকে আমরা খুব একটা বড় করিয়া দেখিতে রাজি নহে কিংবা ইহা বন্ধ করিবার প্রশ্নে আমাদের 'বিশেষজ্ঞ জ্ঞান' নাই! অথচ প্রতিদিনই ঘণ্টা-মিনিট বিরতিতে রাস্তায় ঝরিতেছে তাজা প্রাণ, দীর্ঘতর হইতেছে মৃত্যুর মিছিল। প্রতিটি দুর্ঘটনার পর 'ইচ্ছা করে কাউকে মারা হয় না', 'দুর্ঘটনায় কারো হাত নেই' ইত্যাদি নানা কথা বলা হয় এবং ক্ষেত্রবিশেষে গঠিত হয় 'তদন্ত কমিটি'। তবে এই সকল প্রচলিত সংস্কৃতির আড়ালে চাপা পড়িয়া যায় জবাবদিহিতার বিষয়টি। এইরূপভাবে দেশে সড়ক দুর্ঘটনা পরিণত হইয়াছে 'নিয়মিত ও স্বাভাবিক' ঘটনায় এবং পথে-পরিবহনে মানুষের জীবন হইয়া উঠিতেছে 'ভীষণ সস্তা'। মানবাধিকারের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী ইহা 'সিস্টেমেটিক ভায়োলেন্স' বা 'পদ্ধতিগত সহিংসতা' হিসাবে আখ্যায়িত। রাষ্ট্র বা জনগণ-কেউই এই সড়ক সহিংসতার দায় এড়াইতে পারে না।

বিভিন্ন জরিপ ও গবেষণা থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে ৬৫ জন এবং প্রতি বছর গড়ে ২৪ হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়। প্রতি বছর ৩ লক্ষাধিক মানুষ আহত এবং প্রতিবন্ধী হয় প্রায় ৮০ হাজার মানুষ। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির এক তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ বছরে দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটিয়াছে ৬০ হাজার ৯৮০টি, যাহাতে ১ লক্ষ ৫ হাজার ৩৩৮ জন নিহত এবং ১ লক্ষ ৪৯ হাজার ৮৪৭ জন আহত হইয়াছে। এই সকল পরিসংখ্যান সড়কের বেহাল পরিস্থিতির কথাই আমাদের স্মরণ করাইয়া দেয়। সড়ক দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই গাড়ির ফিটনেস ত্রুটি, অতিরিক্ত গতি, ওভারটেকিং, রাস্তার নকশায় ত্রুটি, মহাসড়কে ধীরগতির গাড়ি ঢুকে পড়া, চালকের অদক্ষতা ও বিশ্রামের অভাব, সড়কের খানাখন্দ ইত্যাদির কথা উঠে আসে। তবে প্রায় প্রতিটি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার পিছনে কমন বা সাধারণ কারণ হইল 'অসতর্কতা ও অসচেতনতা'। রাস্তায় চলাচলে নিয়মকানুন অনুসরণের বিষয়কে চালক-আরোহী বা পথচারী- সকলেই যেন থোড়াই কেয়ার করে!

উন্নত বিশ্বে সড়কে শৃঙ্খলা বজায় রাখিবার বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়া দেখা হয়। কিন্তু উন্নয়নশীল বিশ্বে সড়ক-সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা এমন কথাও বলেন যে, 'গরু-ছাগল চিনিতে পারিলেই তাহাকে ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়া যাইবে। 'ইহা নিছক কথার কথা নহে, কেবল গরু-ছাগল চিনিতে পারিবার যোগ্যতাতেই অনেকের লাইসেন্স পাইয়া যাইবার ইতিহাস রহিয়াছে এই দেশে। এই সকল প্রবণতার কারণে দেশে নিবন্ধিত যানবাহন এবং ড্রাইভিং লাইসেন্সধারী চালকের সংখ্যা যেমন বাড়িতেছে, তেমনিভাবে রাস্তায় বাড়িতেছে হাজারো যানবাহনের যত্রতত্র চলাচল।

বিশ্বব্যাপী সড়ক দুর্ঘটনাকে দৈবচয়ন বলা হয়, যাহার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নহে। কিন্তু বাংলাদেশে যাহা চলিতেছে, তাহাকে মোটেও দৈবচয়ন বলা যায় না। যানবাহনের রুট পারমিট, ফিটনেস, চালকের উপযুক্ত ড্রাইভিং লাইসেন্স ইত্যাদি ইস্যুর পাশাপাশি বিআরটিএ, হাইওয়ে পুলিশ, ট্রাফিক পুলিশ, সওজসহ বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা ও অবহেলা ইহার জন্য অধিক দায়ী। এই সকল ক্ষেত্রে 'সমন্বিত উদ্যোগ' ও 'জবাবদিহিতার নিশ্চিয়তা'র বিশেষ প্রয়োজন। চলমান বাস্তবতায় সড়কে শৃঙ্খলা ফিরাইতে বাড়াইতে হইবে যানবাহনে প্রযুক্তির ব্যবহারও। চালকদের স্বাস্থ্যগত বিষয়কেও গুরুত্ব দিয়া দেখিতে হইবে।

দূরপাল্লার যানবাহনের চালকদের জন্য পর্যাপ্ত বিশ্রামের ব্যবস্থা, প্রাপ্য মজুরি প্রদান বিষয়ে নজর দিতে হইবে, যাহাতে তাহারা গাড়ি চালাইবার জন্য সুস্থ মানসিক অবস্থায় থাকেন। সর্বোপরি রাস্তায় চলাচলের সময় পথচারীদের হইতে হইবে যথেষ্ট সজাগ ও সতর্ক। রাস্তায় চলাচলের সময় সর্বদা মনে রাখিতে হইবে, 'সাবধানের মার নাই'।

প্রতি বৎসরের ন্যায় এইবারের শীত মৌসুমেও সড়ক দুর্ঘটনা আমাদের ভোগাইবে বলিয়া মনে হইতেছে। সুতরাং, পরিস্থিতির উন্নতিতে সড়ক আইনের যথাযথভাবে প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা ও টেকসই কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের দিকে নজর দেওয়া অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়িয়াছে। মৃত্যুফাঁদ নহে, দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলি হইয়া উঠুক 'জীবনের সংযোগ'।

ইত্তেফাক/এনএন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন