অচলায়তনে শিক্ষকদের জায়গা দেওয়া হয় না

আপডেট : ০৩ জানুয়ারি ২০২৫, ০৩:৩০

শিক্ষক কেবল একটি পেশা নহে, ইহা একটি দায়িত্ব, একটি আদর্শ। তাহাদের অবমাননা করিয়া কোনো সমাজ উন্নতির স্বপ্ন দেখিতে পারে না। শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন কেবল তাহাদের প্রাপ্য নহে, ইহা একটি সমাজের উন্নতির শর্ত। একটি আলোকিত ভবিষ্যৎ গড়িবার জন্য শিক্ষকদের মর্যাদা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা সভ্যসমাজের গুরুদায়িত্ব। বাংলাদেশে শিক্ষকগণ দীর্ঘকাল ধরিয়া সমাজের উন্নয়ন ও জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করিয়াছেন; কিন্তু ইহার বিপরীতে সাম্প্রতিক বৎসরগুলিতে শিক্ষকদের প্রতি নানা ধরনের অবমাননাকর আচরণের ঘটনা ঘটিয়াছে। কখনো শারীরিক নির্যাতন, কখনো মানসিক হেনস্তা কিংবা অপমানজনক আচরণ শিক্ষকগণের কর্মপরিবেশকে কলুষিত করিয়াছে।

আমাদের মনে রাখিতে হইবে, শিক্ষকদের মাধ্যমেই একটি উন্নত প্রজন্ম গড়িয়া উঠে। তাহাদের দীক্ষা, আদর্শ এবং শিক্ষাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুশিক্ষিত ও মানবিক করিতে সহায়তা করে। শিক্ষক কেবল জ্ঞান দান করেন না, তাহারা মূল্যবোধ, নৈতিকতা এবং দায়িত্ববোধের বীজও শিক্ষার্থীদের মধ্যে বপন করেন। এই কারণেই শিক্ষকসমাজ সমগ্র বিশ্বে নমস্য। প্রাচীন সমাজে শিক্ষককে গুরু নামে অভিহিত করা হইত। গুরু শব্দটির অর্থই হইল যিনি অন্ধকার হইতে আলোর দিকে পথ দেখান। তাহার প্রতি শিক্ষার্থীর আনুগত্য ছিল নিঃশর্ত এবং সমাজে গুরুর স্থান ছিল পিতার সমতুল্য, কখনো কখনো তাহারও ঊর্ধ্বে। গুরুর আদেশ ছিল অমোঘ এবং তাহার নির্দেশই শিক্ষার্থীর জীবনের পথনির্দেশ করিত। 

দার্শনিক প্লেটো তাহার প্রখ্যাত গ্রন্থ রিপাবলিকে উল্লেখ করিয়াছেন, 'শিক্ষাই সমাজকে ন্যায় ও উন্নতির পথে পরিচালিত করে। শিক্ষকগণ তাহার মূলধন।' পশ্চিমা বিশ্বে শিক্ষকদের অবস্থান সমাজের সর্বোচ্চ সম্মানিত স্তরে। উন্নত বিশ্বে শিক্ষকদের সম্মান, বেতন ডাক্তার ও প্রকৌশলীদের সমতুল্য। কারণ তাহারা বিশ্বাস করেন, শিক্ষকগণই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নির্মাণ করেন। জাপানে শিক্ষকদের মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ। সেইখানে শিক্ষার্থীরা কেবল শ্রদ্ধা নয়, ভক্তি প্রদর্শন করিয়া থাকে। শিক্ষকগণকে ন্যায়বিচারের প্রতীক বলিয়া গণ্য করা হয়। একদা একজন জাপানি রাজা বলিয়াছিলেন, 'আমার শিক্ষকগণই প্রকৃত রাজা। আমি তাহাদের নির্দেশ মানিয়া চলি।' আমেরিকায় শিক্ষক দিবস পালনের মাধ্যমে শিক্ষকদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হয়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও শিক্ষকদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের দীর্ঘ ঐতিহ্য রহিয়াছে। একসময় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের আদেশ সমাজে পিতার পরামর্শের মতোই গণ্য হইত: কিন্তু দুঃখজনকভাবে গত কয়েক বৎসরে শিক্ষকদের প্রতি অবমাননা, হেনস্থা এবং শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা বৃদ্ধি পাইয়াছে। ইহা সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের এক ভয়াবহ নিদর্শন। শিক্ষকগণ নিঃসন্দেহে মানুষ এবং মানুষমাত্রই ভুল করিতে পারে; কিন্তু তাহার ভুল সংশোধনের পন্থা হওয়া উচিত সম্মানজনক। শিক্ষকের সম্মানহানি কেবল তাহার ব্যক্তিগত জীবনে নহে, বরং উহা সেই সমাজেরই সম্মানহানি। যাহারা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আলোকিত করিবার দায়িত্ব পালন করেন, তাহাদের অবমাননা করিয়া কোনো সমাজ উন্নতির স্বপ্ন দেখিতে পারে না।

একটি সমাজে শিক্ষকের মর্যাদা না থাকিলে কী হইতে পারে, তাহা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'গুরু' নাটকের 'অচলায়তন' অঙ্কে আমরা স্পষ্ট দেখিতে পাই। তিনি লিখিয়াছেন: (একদল বালক)-'... প্রথম: গুরু আসছেন।/ সকলে গুরু আসছেন।/ তৃতীয়: ভয় করছে না ভাই?/ দ্বিতীয়: ভয় করছে।/ প্রথম: আমার ভয় করছে না, মনে হচ্ছে মজা।/ তৃতীয়: কিন্তু ভাই গুরু কী?/ দ্বিতীয়: তা জানি নে।/ তৃতীয়: কে জানে?/ দ্বিতীয়: এখানে কেউ জানে না।/ প্রথম শুনেছি গুরু খুব বড়ো, খুব মস্ত বড়ো।/ তৃতীয় তাহলে এখানে কোথায় ধরবে?/ প্রথম পঞ্চকদাদা বলেন অচলায়তনে তাঁকে কোথাও ধরবে না।/ তৃতীয় কোথাও না?/ প্রথম কোথাও না।/ তৃতীয়: তাহলে কী হবে?/ প্রথম: ভারি মজা হবে।'

ইহার সারবত্তায় বলা যায়, অচলায়তনে শিক্ষকদের জায়গা হয় না এবং সেইখানে শিক্ষকদের জায়গা না হইলে তাহাকে 'মজা' হিসাবেই দেখা হয়। ইহাই ট্র্যাজেডি। কোনো সমাজে এই ট্র্যাজেডি বহাল থাকিলে সেই সমাজের ভবিষ্যৎ পরিণাম কখনো ভালো হইতে পারে না। এই সারসত্য যেন আমরা না ভুলি।

ইত্তেফাক/এনএন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন