৩০ শিক্ষার্থীর ১২ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ

আপডেট : ১৫ জুলাই ২০১৯, ২১:১১

স্টাফ রিপোর্টার, রাজশাহী

রাজশাহীতে ৩০ শিক্ষার্থীর ১২ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে লাপাত্তা হয়েছেন এক প্রতিষ্ঠানপ্রধান এ রকম অভিযোগ পাওয়া গেছে। ফলে ভুক্তভোগীদের শিক্ষাজীবন এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ৩০ শিক্ষার্থীর প্রত্যেকে ৪০ হাজার টাকা করে পরিশোধ করেও পরীক্ষায় বসতে পারেননি বলে জানা গেছে।

জানা গেছে, পবা উপজেলার ‘ইউনাইটেড টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে’ বিএসসি কোর্সে ভর্তি হয়েছিলেন ঐ শিক্ষার্থীরা। তাদের ভর্তির ১২ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে লাপাত্তা হয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক মেহেদী হাসান। এ নিয়ে গত শনিবার সন্ধ্যায় নগরীর শাহ মখদুম থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত ২৭ জুন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজগুলোতে ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের চূড়ান্ত পরীক্ষা শুরু হয়েছে। কিন্তু ঐ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশগ্রহণের কোনো উদ্যোগই নেয়া হয়নি। ফলে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে ঐ ৩০ শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন।

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা জানান, বিষয়টি নিয়ে তারা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের কাছে জানতে চাইলে, তারা কিছু জানেন না উল্লেখ করে ইনস্টিটিউটের ব্যবস্থাপক মেহেদী হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। শিক্ষার্থীরা ব্যবস্থাপককে না পেয়ে তার মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। কিন্তু শিক্ষার্থীদের কল রিসিভই করেননি ব্যবস্থাপক। ফলে অনেকটা বাধ্য হয়েই গত ২ জুলাই ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ পরিদর্শকের দফতরে যান। সেখানে গিয়ে তারা জানতে পারেন, ইনস্টিটিউট থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের রেজিষ্ট্রেশনই করা হয়নি। ফলে তারা ইনস্টিটিউটে নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে ভর্তি হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নয়। ফলে তাদের পরীক্ষা দেয়ার কোনো সুযোগ নেই।

পবা উপজেলা পরিষদের দক্ষিণে অবস্থিত ‘ইউনাইটেড বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ’ এবং ‘ইউনাইটেড টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট’ দুইটি প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হচ্ছে পৃথক আবাসিক ভবনে।

প্রতিষ্ঠান সূত্র জানায়, ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগে আট জন, ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) সাত জন ও সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সে ১৫ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়। তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে ভর্তি ফি বাবদ ১০ হাজার টাকা, সেমিস্টার ফি বাবদ ২০ হাজার টাকা এবং পরীক্ষার ফি বাবদ ৫ হাজারসহ ৪০ হাজার টাকা করে আদায় করা হয়। ঐ শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাসও নেওয়া হয়। অথচ রহস্যজনক কারণে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ পরিদর্শক দফতরে কোনো টাকা জমা দেয়া হয়নি। ফলে শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশন না হওয়ায় তাদের নামে কোনো প্রবেশপত্রও ইস্যু করেনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

ভুক্তভোগী ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী শামিউল ইসলাম বলেন, তারা ভর্তি, রেজিস্ট্রেশন এবং পরীক্ষা ফি বাবদ ৪০ হাজার করে টাকা কর্তৃপক্ষকে দিয়েছেন। প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ক্লাসও করেছেন। এখন জানতে পেরেছেন, তাদের রেজিস্ট্রেশনই করা হয়নি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের কোনো নামও নেই। ফলে পরীক্ষা দেয়ারও সুযোগ নেই।

তিনি আরো বলেন, বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর তারা ইনস্টিটিউটে গিয়ে টাকা ফেরত চেয়েছেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ ভর্তির সময়ে নেয়া তাদের এইচএসসির সার্টিফিকেট ও মার্কশিট ফেরত দিয়েছেন। কোনো টাকা ফেরত দেননি। ইনস্টিটিউটের ব্যবস্থাপক দেশেও নেই বলে জানিয়েছেন।

কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী তায়েব ফারাজি ও সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের মারুফ হাসানও একই অভিযোগ করেন। তারা জানান, ভর্তি, রেজিস্ট্রেশন ও পরীক্ষার ফিস বাবদ জমা দেয়া টাকা ফেরত চাইলে কর্তৃপক্ষ শুধু আশ্বাস দিচ্ছে। তবে আদৌ তারা টাকা ফেরত পাবেন কিনা তা বুঝতে পারছেন না।

এ বিষয়ে জানতে ইউনাইটেড ইনস্টিটিউটে গিয়েও মহাব্যবস্থাপক মেহেদী হাসানকে পাওয়া যায়নি। মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। গত শনিবার দুপুরে ইনস্টিটিউটের রিসিপশনিস্ট নিপা মোবাইলে বলেন, ইনস্টিটিউটের ব্যবস্থাপক মেহেদী হাসান দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। তিনি কবে দেশে আসবেন তাও জানাতে পারেননি নিপা।

শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশন না হওয়া এবং টাকা ফেরতের বিষয়ে তিনি বলেন, আসলে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিভুক্তি প্রতি বছর নবায়ন করতে হয়। টাকার অভাবে সেই নবায়নও করা সম্ভব হয়নি। শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশন না হওয়ায় নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি হতে পারছেন না। তবে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের টাকা ব্যবস্থাপক ফেরত দিতে চেয়েছেন বলে জানান তিনি।

জানতে চাইলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ পরিদর্শক অধ্যাপক মজিবুর রহমান বলেন, ঐ ইনস্টিটিউট গত তিন বছর বিএসসি শাখার কোনো নবায়ন ফি জমা দেয়নি। তারা শিক্ষার্থী ভর্তি করালেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রেশন হয়নি। ফলে তাদের পরীক্ষা নেয়ার সুযোগ নেই। আমরা ইউনাইটেড ইনস্টিটিউটের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করব। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদন বাতিল করা হবে।

নগরীর শাহ মখদুম থানার ওসি মাসুদ পারভেজ বলেন, শিক্ষার্থীরা ইউনাইটেড টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটের ব্যবস্থাপকের বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।