রাজনীতি জনকল্যাণের অন্যতম মাধ্যম হইলেও, তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহের মধ্যে একধরনের ব্রেইম গেমের প্রবণতা লক্ষ করা যায়। তাহারা পরস্পরের বিরুদ্ধে অতীতের ব্যর্থতা খুঁজিয়া বাহির করিতে অধিক মনোযোগী হন। উন্নয়নশীল বিশ্বের কোনো কোনো দেশে যাহারা যখন ক্ষমতায় আসীন হন, তাহারা অতীতের শাসকদের ভুলত্রুটির ফিরিস্তি লইয়া এতটাই ব্যস্ত থাকেন যে, সেই সকল দেশের প্রকৃত সমস্যাগুলির প্রতি মনোযোগ ও দৃষ্টি আড়ালে চলিয়া যায়।
বলিবার অপেক্ষা রাখে না, ইহা এক অর্থে কেবল দোষারোপের খেলাই নহে, বরং উন্নয়নের গতিধারার পথে একধরনের প্রতিবন্ধকতাও বটে। রাজনীতিতে গ্রাচো মার্কসের একটি বিখ্যাত উক্তি আছে, 'রাজনীতি হইল সমস্যার অনুসন্ধান করা, সকল জায়গায় ইহার খোঁজ করা এবং ইহার ভুল নির্ণয় করিবার শিল্প।'
এই উক্তি আমাদের শিখায় যে, রাজনীতির মূল কাজ হইল সমস্যার সমাধান; দোষারোপ করিয়া সময় নষ্ট করা নহে। অতীতের দিকে তাকাইলে দেখা যায়, তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশই স্বাধীনতার পর হইতে এক গভীর সংকটকাল অতিক্রম করিয়া থাকে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, একটি বিধ্বস্ত অর্থনীতি হইতে আজকের বাংলাদেশ দাঁড়াইয়াছে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তির উপর। উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় গ্রামীণ অবকাঠামো, শিক্ষার প্রসার, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এবং দারিদ্র্য বিমোচনে দেশ অনেক অগ্রসর হইয়াছে। এই সকল উন্নয়ন কোনো একক সরকারের অবদান নহে, বরং ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফল।
ইহা বিশ্বের সকল দেশের ক্ষেত্রেই সত্য। এই জন্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল পি হান্টিংটন বলিয়াছেন, উন্নয়নের জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।' যদিও দুর্ভাগ্যজনকভাবে তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশেই রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা অর্ধশতকেও দূর হয় নাই। ক্ষমতাসীনরা অতীতের শাসকদের ভুলত্রুটি লইয়া অধিক ব্যস্ত থাকিলে নিজেদের স্বীয় দায়িত্ব পালনে পিছাইয়া পড়িবার আশঙ্কা থাকে। ইহাতে জনমনে একপ্রকার হতাশা সৃষ্টি হয়।
তৃতীয় বিশ্বে ক্ষমতার বাহিরে থাকাকালীন যাহারা কেবল সমালোচনাই করিয়াছেন, তাহারা ক্ষমতায় আসিয়া দেখান যে, তাহাদের নিজস্ব সমস্যার সমাধানের কোনো সুসংগঠিত পরিকল্পনা ছিল না। তাহারা যেন ভুলিয়া যান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এডওয়ার্ড বুর্কের কথা-রাজনীতিতে নেতৃত্ব হইল প্রজ্ঞার প্রয়োগ।' কিন্তু নেতাদের এই অন্ধ সমালোচনার প্রবণতা প্রজ্ঞার অভাবের ইঙ্গিত দেয়।
সরকার পরিচালনায় ভুলত্রুটি হইতেই পারে; কিন্তু সেই ভুল শুধরাইবার সদিচ্ছা থাকিলে তাহাই প্রকৃত নেতৃত্বের পরিচায়ক। বিখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলিয়া থাকেন-নেতৃত্বের প্রকৃত মানদণ্ড হইল দায়িত্ব গ্রহণ এবং ভবিষ্যতের প্রতি দৃষ্টি রাখা। উন্নয়নের ক্ষেত্রে জনগণের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। নদী বা খাল দখল এবং দূষণের ক্ষেত্রে আমরা কেবল সরকারের উপর দোষ চাপাই; কিন্তু সাধারণ মানুষের ভূমিকাও উল্লেখযোগ্য। স্থানীয় জনগণের দায়িত্বহীনতা এবং উদাসীনতা পরিবেশের এই অবনতির জন্য দায়ী। সুতরাং, কেবল সরকার নয়, জনগণকেও তাহাদের ভূমিকার প্রতি সচেতন হইতে হইবে। বাংলাদেশের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা অস্বীকার করা যায় না।
দেশব্যাপী অবকাঠামো উন্নয়ন, অর্থনীতির প্রসার এবং শিক্ষার উন্নয়ন দৃশ্যমান। ইহা যদি ধারাবাহিকভাবে বজায় থাকে, তাহা হইলে বাংলাদেশ একটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হইতে বিলম্ব হইবে না। সুতরাং, শাসকগোষ্ঠীর উচিত অতীতের সমালোচনায় অধিক কালক্ষেপণ না করিয়া ভবিষ্যতের সমাধানকল্পে উদ্যোগ গ্রহণ করা।
জনগণের আস্থা অর্জন করিবার জন্য তাহাদের উচিত, ইহা প্রমাণ করা যে, তাহারা কেবল সমালোচনার জন্য রাজনীতি করেন না, বরং প্রকৃত অর্থে দেশের কল্যাণে কাজ করেন। তাহারা যদি সমস্যার সমাধানে মনোযোগী হন, তাহা হইলে তাহাদের সফলতা নিশ্চিত। সুতরাং, তাহাদের মনে রাখিতে হইবে- 'মাইন্ড ইওর ল্যাংগুয়েজ' কথাটি। তাহারা যেন স্মরণে রাখেন বিখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী উড্রো উইলসনের কথাটি-'রাজনীতি হইল মানুষের জন্য কাজ করিবার শিল্প।'
