কৃষিপ্ৰধান দেশ হিসেবে খাদ্যশিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে কাজ করে। দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠী ও ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ খাদ্যশিল্পকে দেশের জন্য একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় খাত হিসেবে গড়ে তুলেছে । এটি শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি প্রধান চালিকাশক্তি নয়, বরং দেশের মানুষের পুষ্টি, স্বাস্থ্যের মান ও সামাজিক অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি। তবে, এ খাতটি বর্তমানে বহুবিধ সমস্যার সম্মুখীন, যা তার স্থিতিশীলতা ও টেকসই উন্নয়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যে সমস্যাগুলো মোকাবিলা করতে হয়, তার মধ্যে অন্যতম হলো খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণ ও গুণমান বজায় রাখা । বাংলাদেশে খাদ্যনিরাপত্তার সমস্যা শুধু অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থার ওপর নয়, বরং এটি বৈশ্বিক পরিবর্তন, যেমন জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতি ও প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মেলাতে না পারার কারণেও জটিল রূপ ধারণ করেছে। খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে তা ভোক্তাদের কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে একাধিক সমস্যা দেখা যায়। এসব সমস্যা নিরসনে একটি শক্তিশালী ও সমন্বিত পরিকল্পনা অপরিহার্য।
বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেকাংশে কৃষির ওপর নির্ভরশীল । দেশের মানুষের খাদ্যের একটি বড় অংশ কৃষি থেকে আসে, বিশেষ করে ক্ষুদ্র কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য থেকে। তবে, ক্ষুদ্র কৃষকদের জীবনযাত্রা উন্নত করার জন্য পর্যাপ্ত পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
বাংলাদেশের কৃষকদের মধ্যে অনেকেই উন্নত কৃষিপ্রযুক্তি, উচ্চ মানের বীজ ও চাষাবাদের আধুনিক পদ্ধতির সুবিধা পান না। তারা প্রায়ই জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব; যেমন- খরা, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের কারণে ফসল হারানোর ঝুঁকিতে থাকেন। এ কারণে, খাদ্য উৎপাদন- প্রক্রিয়া অনেকাংশে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং দেশের খাদ্যনিরাপত্তা বারংবার হুমকির সম্মুখীন হয়েছে।
বাংলাদেশে খাদ্যসুরক্ষার জন্য আইনি কাঠামো থাকা সত্ত্বেও, সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। ২০১৩ সালে চালু হওয়া ‘খাদ্য সুরক্ষা আইন' একটি বড় পদক্ষেপ ছিল । এই আইনের উদ্দেশ্য ছিল খাদ্য ব্যবসায়ীদের দায়িত্ব নির্ধারণ করা এবং খাদ্যের মান বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করা । আইনটি খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহ প্রক্রিয়ায় মান নিয়ন্ত্রণ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একটি কাঠামো তৈরি করে । তবে, বাস্তবতায় দেখা যায় যে এই আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব হচ্ছে না । আইনের প্রয়োগে দুর্বলতা, পরিদর্শকের অভাব ও প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে আইনটি এখনো কার্যকর করা সম্ভব হয়নি ।
বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) খাদ্যশিল্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা, যা দেশের খাদ্যের গুণমান নিশ্চিত করতে কাজ করে । বিএসটিআই- এর কাজের মধ্যে রয়েছে খাদ্যপণ্যের মান নির্ধারণ, পণ্য পরীক্ষা ও পণ্যের গুণমান বজায় রাখার জন্য বিভিন্ন নির্দেশনা প্রদান। তবে, বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও ক্ষুদ্র উৎপাদকদের মধ্যে অনেকেই বিএসটিআই-এর নির্ধারিত মান সম্পর্কে জানেন না। যারা জানেন, তাদেরও অনেকে সেই মান বজায় রাখার সামর্থ্য রাখেন না। ফলে, দেশের খাদ্যের গুণমান অনেক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে তাল মেলাতে পারে না, যা শুধু দেশের ভোক্তাদের জন্য নয়, বরং বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও একটি বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে ।
এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানের একটি পদ্ধতি হলো 'হ্যাকেপ' ( Hazard Analysis and Critical Control Points)। এটি এমন একটি পদ্ধতি, যা খাদ্যপ্রস্তুতির সময় সম্ভাব্য ঝুঁকি চিহ্নিত করে এবং তা নিয়ন্ত্রণের জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করে। হ্যাকেপ পদ্ধতি ব্যবহারের মাধ্যমে খাদ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। এটি শুধু খাদ্যের গুণমান বজায় রাখে না, বরং আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকার কারণে বিদেশি বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকারের সুযোগও বাড়ায়।
বাংলাদেশে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায়ও নানা ধরনের অপ্রতুলতা দেখা যায়। দেশের অনেক এলাকায় ভালো রাস্তাঘাটের অভাব, পর্যাপ্ত হিমাগার বা সংরক্ষণাগার না থাকা, এবং সঠিক পরিবহন ব্যবস্থার অভাবের কারণে খাদ্য সরবরাহে সমস্যা হয়। বিশেষ করে, পচনশীল পণ্যগুলো পরিবহনের সময় নষ্ট হয়ে যায়, যার ফলে উৎপাদক ও ভোক্তা উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ধরনের সমস্যা সমাধানের জন্য দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে বিনিয়োগ করা প্রয়োজন ।
ক্ষুদ্র কৃষকদের সমস্যাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, তাদের আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সুবিধার অভাব। তাদের অনেকেই উন্নত কৃষি সরঞ্জাম বা প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারেন না। তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করা ও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ করে দেওয়া উচিত। পাশাপাশি, তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন, যাতে তারা নতুন চাষাবাদ পদ্ধতি ও টেকসই কৃষি সম্পর্কে সচেতন হতে পারেন ।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশের খাদ্যব্যবস্থার জন্য যত হুমকি আছে, তার মধ্যে অন্যতম। দেশের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ প্রায়ই বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন হয়। এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে ব্যাপকভাবে ব্যাহত করে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই প্রভাব মোকাবিলায় জলবায়ু- সহনশীল চাষাবাদ পদ্ধতি, খরা সহনশীল শস্য ও উপকূলীয় এলাকায় ম্যানগ্রোভ গাছ লাগানোর মতো উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন ।
খাদ্য ও পুষ্টি সম্পর্কে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের অনেক মানুষ এখনো সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টির গুরুত্ব সম্পর্কে জানেন না। এ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে পুষ্টি শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। এর পাশাপাশি গণমাধ্যম ও সরকারের মাধ্যমে খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টি সম্পর্কে প্রচারণা চালানোর প্রয়োজন ।
সবশেষে বলা যায়, দেশের খাদ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করতে সরকার, বেসরকারি খাত ও জনগণের মধ্যে সমন্বিত প্রচেষ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্যনিরাপত্তা, পুষ্টি এবং সবার জন্য সহজলভ্য খাদ্য নিশ্চিত করতে একটি শক্তিশালী এবং টেকসই কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন । এই কাঠামো শুধু দেশের মানুষের স্বাস্থ্য উন্নত করবে না, বরং দেশের অর্থনীতিকেও আরো স্থিতিশীল করে তুলবে।
লেখক : ব্যাচেলর অব প্যাটিসারি আর্টস, টেইলরস ইউনিভার্সিটি, মালয়েশিয়া ও ফ্রান্সের ইউনিভার্সিটি অব তালুস-এর সঙ্গে যৌথ ডিগ্রি
