‘প্রসেস অব আনলার্নিং'

আপডেট : ১১ জানুয়ারি ২০২৫, ০৪:১৩

তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরিয়া শিক্ষাব্যবস্থায় নানা ধরনের কাটাছিড়া হয় । এই ব্যাপারে একজন রাজনীতিক দুঃখ করিয়া বলিয়াছিলেন, ইহা হইল—‘প্রসেস অব আনলার্নিং’। আমরা শিখি এবং ভুলিয়া যাই। অথবা যাহা অতীতের প্রজন্মে শিখানো হয়, তাহা যেন পরের প্রজন্মে আসিয়া বৃথা হইয়া যায় । ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিক্ষাব্যবস্থা বারংবার ক্ষমতাসীন শক্তির আদর্শিক স্বার্থে পরিবর্তিত হয়। সেই পরিবর্তনের ফলে উত্তর মেরু দক্ষিণে চলিয়া যায়, দক্ষিণ মেরু উত্তরে চলিয়া আসে । উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, দক্ষিণ আফ্রিকার অ্যাপারথাইড যুগে পাঠ্যপুস্তকে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্বকে বৈধতা দেওয়া হইয়াছিল। স্বাধীনতা লাভের পরে এই শিক্ষাব্যবস্থা পালটাইয়া বর্ণবৈষম্যের বিপক্ষে শিক্ষাদান শুরু হইলেও, পুরাতন বিষের প্রভাব সহজে মুছিয়া যায় নাই। 

অনুরূপভাবে, রুয়ান্ডার গণহত্যার পূর্বে ও পরে শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে জাতিগত বৈষম্যের এক বড় পরিবর্তন দেখা গিয়াছে । এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কণিকা- অন্তর্গত ‘অধিকার' কবিতাটি স্মরণ করা যাইতে পারে । অধিকার কবিতায়—বনের উপর অধিকারের প্রশ্নে বিভিন্ন গাছপালা নিজেদের গুণাবলির ভিত্তিতে অধিকারের দাবি জানাইতেছিল। বকুল গন্ধে, পলাশ রঙে, আর গোলাপ গন্ধ ও শোভায় নিজেদের শ্রেষ্ঠ বলিয়া প্রচার করিল । সাধারণ কচু বলিল, সে মাটির গভীরে শিকড় ছড়াইয়া অধিকারের প্রমাণ দিয়াছে। এইভাবে প্রত্যেকেই নিজেকে শ্রেষ্ঠ বলিতে চাহে । আমরা যখন তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির এই শিক্ষাগত সমস্যার দিকে দৃষ্টিপাত করি, তখন ‘অধিকার’ কবিতার সারাংশ আমাদের শিক্ষা দেয় যে, প্রকৃত অধিকার সেই গোষ্ঠীর, যাহারা মাটির গভীরে দখল রাখে। রাজনীতি কিন্তু ইহার বিপরীত পথে চলে। পাঠ্যপুস্তকের বারংবার পরিবর্তন দ্বারা ইতিহাসের মূলে আঘাত হানা হয় এবং তাহাকে উপড়াইয়া ফেলিবার চেষ্টা করা হয় । এক প্রজন্মকে শিখানো হয় এক রকম, পরবর্তী প্রজন্মকে শিখানো হয় অন্য রকম। ফলত, জনগণের মস্তিষ্কে ঐতিহাসিক সত্যের প্রতি অবিশ্বাস ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়।

উপযুক্ত উদাহরণ হিসাবে, নাইজেরিয়া ও জিম্বাবুয়ের কথাও উল্লেখ করা যায় । নাইজেরিয়াতে পাঠ্যপুস্তকের পরিবর্তনের মাধ্যমে একাধিক সামরিক শাসক নিজেদের আদর্শ ও রাজনৈতিক সাফল্যকে অতিরঞ্জিত করিয়াছে। অন্যদিকে, জিম্বাবুয়ের রবার্ট মুগাবে তাহার শাসনের সময় শিক্ষাব্যবস্থাকে এমনভাবে গড়িয়াছিলেন, যাহাতে তাহার ব্যক্তিগত মহিমা সর্বোচ্চ স্থানে থাকে । শিক্ষার্থীরা সত্য ইতিহাস জানিতে ব্যর্থ হইয়াছে । কিন্তু ইহার চেয়েও গভীর ক্ষতি হইতেছে, যখন পাঠ্যপুস্তকের পরিবর্তন নূতন প্রজন্মকে এমন এক অবস্থানে রাখে, যেইখান হইতে তাহাদের পুরাতন শিক্ষা বৃথা বলিয়া প্রতীয়মান হয় । সত্য যদি বিকৃত হয়, তবে তাহার ফলে শিক্ষার্থীরা এক অবিরাম শূন্যতায় পতিত হয়। সত্য কী? সত্য হইল কণিকার আরেকটি কবিতার মতো—‘দেহটা যেমনি ক'রে ঘোরাও যেখানে/ বাম হাত বামে থাকে, ডান হাত ডানে ।’

এইভাবে শিক্ষা, রাজনীতি এবং পুনরাবৃত্তির দুর্ভোগের দুষ্টচক্র আর কতদিন ধরিয়া চলিবে? যখন একটি দেশের জনসাধারণ বুঝিতে পারেন, শিক্ষার মাধ্যমে তাহাদের সত্যশিক্ষার পরিবর্তে ক্ষমতাসীনদের স্বার্থ রক্ষা করা হইতেছে, তখন তাহাদের নিকটও শিক্ষার গুরুত্ব কমিয়া যায়। রুয়ান্ডায় অনেক দ্বন্দ্ববিবাদের পর শিক্ষাব্যবস্থার পুনর্গঠন হয়। এবং সেইখানে জাতিগত ঐক্যের উপর জোর দেওয়া হয় । প্রকৃত স্বাধীনতা তখনই সম্ভব হইতে পারে যখন তাহা আত্মনির্ভরশীল এবং সত্যের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ হয় । শিক্ষাব্যবস্থার স্বাধীনতাকে নিশ্চিত করিবার মাধ্যমেই তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলি এই সমস্যার সমাধান পাইতে পারে। অন্যথায় শিক্ষাকে যদি নিজস্বার্থে আত্মপ্রচারের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা হয়, তাহা হইলে এই ‘প্রসেস অব আনলার্নিং' চলিতেই থাকিবে। এইভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরিয়া চলিতে পারে না। সুতরাং জাতির বৃহত্তর স্বার্থে ঐকমত্য প্রয়োজন । ইহা ছাড়া উপায় নাই ।

ইত্তেফাক/এনএন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন