>> শাহনেওয়াজ খান সিজু
দেশের তরুণদের নেতৃত্বচর্চা এবং স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করে যাওয়া প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইয়ুথ লিডারশিপ সেন্টারের (বিওয়াইএলসি) উদ্যোগে ষষ্ঠবারের মতো অনুষ্ঠিত হয়েছে তিন দিনব্যাপী ইয়ুথ লিডারশিপ সামিট। ঢাকার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে গত ১১ জুলাই এই সামিটের উদ্বোধন করা হয়েছিল। সারা বিশ্ব থেকে আসা ১৮০০-এর বেশি আবেদন থেকে নির্বাচিত ৩৭০ জন শিক্ষার্থী ও তরুণ পেশাজীবী এতে অংশ নিয়েছেন। তিনদিনের এই সামিটে প্যানেল ডিস্কাশন, প্ল্যানারি সেশন এবং সফলতার গল্প শোনান একদল প্রখ্যাত বক্তা। তাঁরা সামিটে অংশগ্রহণকারী তরুণদেরকে তাঁদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন এবং ক্যারিয়ারে সফল হওয়ার মাধ্যমে দেশ ও জাতির জন্য কাজ করার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করেন।
এবারের সামিটের প্রথম দিন সাজানো হয়েছিল ‘দৃঢ় একতা এবং ভবিষ্যত্ নীতি নির্ধারণে তরুণদের ভূমিকা’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনা ও বিভিন্ন পর্যালোচনার সমন্বয়ে। বিভিন্ন জাতিসত্তার ঊর্ধ্বে উঠে অংশগ্রহণমূলক নেতৃত্বচর্চার মাধ্যমে একটি দ্রুত পরিবর্তনশীল পৃথিবীর ভবিষ্যত্ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সকলের অংশগ্রহণের নিমিত্তে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহ আলোচনায় উঠে আসে।
উদ্বোধনী বক্তৃতায় ব্রিটিশ হাই কমিশনার রবার্ট চ্যাটার্টন ডিকসন বলেন, ‘বর্তমানে, যখন কিনা সমগ্র পৃথিবী বিভিন্ন মতাদর্শগত, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিকভাবে বিভক্ত, সেই সময়ে দৃঢ় একতা এবং ভবিষ্যত্ নীতি নির্ধারণে তরুণদের ভূমিকা বিষয়টি অত্যন্ত সময়োপযোগী।’
বিওয়াইএলসির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ইজাজ আহমেদ বলেন, ‘বর্তমান বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৪২ শতাংশেরও বেশি মানুষের বয়স ২৫ বছরের নিচে। বিওয়াইএলসি মনে করে, এই বিশাল তরুণ সমাজকে নেতৃত্বচর্চায় সম্পৃক্তকরণ এবং তাঁদের মধ্যে বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা সমাধানের দায়িত্ববোধ প্রতিস্থাপন বেশ কঠিন।’ তিনি নেতৃত্বচর্চাকে একটি শিক্ষণীয় দক্ষতা হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ‘নেতৃত্ব চর্চা করতে কোনো নির্দিষ্ট বয়স, পদ, লিঙ্গ বা সামাজিকভাবে অবস্থাপন্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই। নেতৃত্ব চর্চা করতে তরুণদের কেবল সদিচ্ছা এবং যোগ্যতা থাকতে হবে।’
‘একটি সমাজব্যবস্থা মানে কেবল কোনোভাবে বেঁচে থাকা নয়, বরং ন্যায়বিচার এবং গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠা লাভ করা।’ এমনটা উল্লেখ করেন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহিন আনাম।
সামিটের দ্বিতীয় দিনে এন্টারপ্রেনারশিপ শিরোনামের প্ল্যানারি সেশনে দেশের বাইরে থেকে আসা তরুণেরা অংশ নেন। সেখানে বক্তা এবং সফল উদ্যোক্তারা লাভজনক স্টার্টআপের জন্য নিজেদের উদ্যোগে নতুনত্ব এবং ঝুঁকি নেওয়ার বিষয়টিতে জোর দেন।
পাই স্ট্র্যাটেজির ম্যানেজিং পার্টনার ও প্ল্যানারি সেশনের মডারেটর পিয়াল ইসলাম বলেন, ‘বর্তমান পৃথিবীর সফল উদ্যোক্তাদের মধ্যে কেউই আগের জায়গায় পরে থেকে সফল হতে পারেননি। বরং নিজেদের পণ্য, টিম এবং বাজার চাহিদায় নতুনত্ব এনে তাঁরা মানুষের বিশ্বাস ও আস্থা অর্জন করেছেন।’ এছাড়াও মায়ার প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও আইভি এইচ রাসেল, লাইটক্যাসেল পার্টনার্সের সিইও বিজন ইসলাম এবং ওয়েবঅ্যাবলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা অভিক আলম উপস্থিত ছিলেন প্যানেলিস্ট হিসেবে। একই দিনে ‘মানুষের জন্য নেতৃত্বচর্চা’ শিরোনামে আরেকটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। ‘নেতৃত্বের মূল প্রতিপাদ্য-ই হলো দুর্বলকে শক্তি দেওয়া এবং ভিন্ন ভিন্ন খাতের মানুষদের মধ্যে সমতার পরিবেশ জন্ম দেওয়া।’ এই বলে আলোচনা শুরু করেন নাগরিক টিভির সিইও ডা. আব্দুন নুর তুষার। এছাড়াও এটুআই প্রোগ্রামের ই-লার্নিং এক্সপার্ট মো. আহসানুল আরেফিন চৌধুরী, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ৯টি সফল মাধ্যমিক স্কুল প্রজেক্টের স্বপ্নসারথি রায়হানা তাসলিম এবং টিচ ফর বাংলাদেশের সহকারী পরিচালক শাকিল আহমেদ উপস্থিত ছিলেন দিনের শেষ সেশনে।
‘সত্যিকারের নেতৃত্বচর্চা যাঁরা করেন, তাঁরা সবরকম প্রতিবন্ধকতা জেনেই নিজেদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের রাস্তা ঠিক করে সব অঙ্গনের মানুষদের সঙ্গে নিয়ে নিজেদের পথে এগিয়ে যান।’ এমন বক্তব্যে শেষদিনের কার্যক্রম শুরু করেন কি-নোট স্পিকার ও নেদারল্যান্ডসের প্রিন্স কন্সট্যাঞ্জিন ভ্যান ওরেঞ্জ। এছাড়াও আরো নানা রকম অভিজ্ঞতার কথা বলে সামিটে উপস্থিত তরুণ ডেলিগেটদের নিজেদের দক্ষতা ও মেধার সঠিক ব্যবহারে মনোযোগী হতে বলেন তিনি।
ইয়ুথ লিডারশিপ সামিট ২০১৯-এর সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক প্রধান উপদেষ্টা গওহর রিজভী। তিনি তাঁর সমাপনী বক্তৃতায় বলেন, ‘এবারের সামিট প্রমাণ করেছে যে, আলাদা আলাদা জায়গা, খাতের মানুষজন একত্রিত হলে তা মানুষে মানুষে ভিন্নতা দূর করতে দারুণ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এত এত ভিন্নমত, ভিন্ন স্বপ্নের মানুষকে একত্রিত হতে দেখে আমি বিশ্বাস করতে শুরু করেছি যে, তোমরাই আগামীর বাংলাদেশকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখবে।’
উল্লেখ্য, এই বছর ইউকেএইড এবং মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের পৃষ্ঠপোষকতায় ইয়ুথ লিডারশিপ সামিট অনুষ্ঠিত হয়েছে। অনুষ্ঠানে মিডিয়া পার্টনার হিসেবে ছিল দৈনিক ইত্তেফাক।
