প্রথমবার জিতিয়া, দ্বিতীয়বার পরাজিত হইয়া এবং তৃতীয়বার আসিয়া ভূমিধস বিজয় অর্জন করিয়া আক্ষরিক অর্থেই ইতিহাস তৈরি করিয়াছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদকাল অনেকের মতে এক নতুন যুগের সূচনা। এই সময়কালে তাহার প্রশাসনের নীতি ও কার্যক্রমে যেসকল পরিবর্তন সম্ভাব্য, তাহা যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বব্যাপী গভীর প্রভাব ফেলিতে পারে। প্রথম মেয়াদেই ট্রাম্প ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির মাধ্যমে বাণিজ্য চুক্তি, অভিবাসন নীতি এবং প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করিয়াছিলেন। দ্বিতীয় মেয়াদেও তিনি এই নীতির অনুশীলন আরো শক্তিশালী করিতে পারেন। বিশেষত, অভিবাসন নীতিতে কঠোরতা এবং সীমান্ত নিরাপত্তাসংক্রান্ত কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ তাহার প্রশাসনের অগ্রাধিকার হইতে পারে। পাশাপাশি, ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতিতে চীন এবং অন্যান্য বাণিজ্য অংশীদারদের সহিত সম্পর্ক আরো কঠোর হইবার সম্ভাবনা রহিয়াছে। ইহা আমেরিকার অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারে সহায়ক হইতে পারে, যদিও বৈশ্বিক বাণিজ্যিক সম্পর্ক জটিলতায় পড়িতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমে তাহার গণমাধ্যম এবং সংস্থাসমূহের প্রতি অসন্তোষ বিশেষভাবে লক্ষণীয়। দ্বিতীয় মেয়াদে তিনি ইহা আরো প্রসারিত করিতে পারেন, যাহা প্রশাসনিক কাঠামো এবং গণতান্¿িক মূল্যবোধে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলিতে সক্ষম। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলির উপর বিধিনিষেধ আরোপ বা তাহাদের নিয়ন্¿ণ কঠোর করা হইতে পারে। অন্যদিকে, জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত নীতিতে পরিবেশগত নিয়ম শিথিল করিবার মাধ্যমে শিল্প ও জ্বালানি উত্পাদনকে প্রাধান্য দেওয়ার সম্ভাবনা রহিয়াছে। ট্রাম্পের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ন্যাটো এবং অন্যান্য সংস্থার প্রতি তাহার বিরূপ মনোভাব এই মেয়াদে আরো বৃদ্ধি পাইতে পারে। ইহা বৈশ্বিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে সংকট তৈয়ার করিতে পারে। একইসঙ্গে, সুপ্রিম কোর্ট ও ফেডারেল কোর্টে রক্ষণশীল বিচারকদের সংখ্যা বৃদ্ধির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিস্তার করিবার সম্ভাবনাও অস্বীকার করা যায় না। তাহার সমর্থকেরা মনে করেন যে, দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প আরো কার্যকরভাবে আমেরিকার অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করিতে সক্ষম হইবেন। কিন্তু সমালোচকেরা শঙ্কিত যে, এই নীতিসমূহ সমাজে বিভাজন গভীর করিবে এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব হ্রাস করিবে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদকাল সত্যিই যদি একটি নতুন যুগের সূচনা হয়, তাহা হইলে ইহার প্রভাব হইবে বহুমুখী। স্বাভাবিকভাবেই আমরা অনুধাবন করিতে পারি যে, এই মেয়াদকাল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সমগ্র বিশ্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের উপর গভীর ছাপ ফেলিবে। সুতরাং আজি হইতে শুরু হইল ট্রাম্প-বিস্ময়যুগ। ‘বিস্ময়’ অনেক কারণেই। প্রেসিডেন্ট হিসাবে তাহার প্রথমবারের বিজয়ের মতো এইবারেও জয় পাওয়াটাই ছিল বিস্ময়কর। অত্যন্ত ধনী ব্যবসায়ীর লেবাস হইতে প্রথমবার ২০১৭ সালে তিনি রাজনীতির শাঁখের করাতের ওপর আসীন হন। অতঃপর তিনি ইতিহাস সৃষ্টি করিয়া ২০২৪ সালে পুনরায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হইলেন। মধ্যিখানে তিনি ২০২০ সালে পরাজিত হইয়াও তাহা মানিয়া লইতে পারেন নাই। আর দশজন রাজনীতিকের মতো নহেন তিনি। তিনি তাহার সমস্ত শরীরীভাষা ব্যবহার করিয়া ইতিপূর্বে নানানভাবে বলিয়াছেন—অভিবাসনের কারণে আগামী দুই যুগের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যার ৫০ শতাংশের অধিক হইবে অশ্বেতাঙ্গ। আমেরিকা যতোই অভিবাসীদের দেশ হউক, শ্বেতাঙ্গদের মনে নিজভূমে পরবাসী হইবার ভয় কৃতিত্বের সহিত উসকাইয়া দেওয়াটা হইল—‘ট্রাম্পইজম’। তীব্র জাতীয়তাবাদীদের নিকট এই ‘ট্রাম্পইজম’ হইয়া ওঠে মধুর বাঁশির সুরের মূর্ছনা। মনে করা হইয়াছিল—গত ৫ নভেম্বর ৪৭তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক দলের ভোটের ‘সুনামি’তে ট্রাম্প ভাসিয়া যাইবেন খড়কুটার মতো। অথচ ঘটিল কি না ‘ট্রাম্প-টর্নেডো’! তিনি ভূমিধস বিজয় অর্জন করিলেন!
ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদকাল সত্যিই একটি নতুন যুগের সূচনা করিতেছে কি না—তাহা সময়ই বলিয়া দিবে। ভূ-রাজনীতির তরণি কোন ঘাট হইতে কোথায় ভিড়িবে—আমরা বলিতে পারি না। কেবল বলিতে পারি—ট্রাম্পীয় স্টাইল আর কাহারো সহিত মিলে না।
অভিনন্দন গ্রহণ করুন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭তম প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জন ট্রাম্প।

