জাল সার্টিফিকেট: হিমবাহের চূড়া মাত্র

আপডেট : ২৩ জানুয়ারি ২০২৫, ১৫:৪৪

গত বৎসর রাজশাহীর একটি ঘটনা দেশব্যাপী বেশ আলোচিত হইয়া উঠে। রাজশাহীর বাঘা উপজেলায় বিপ্লব নামের এক ব্যক্তিকে রাতারাতি আঙুল ফুলিয়া কলাগাছ হইয়া উঠিতে দেখিয়া স্থানীয় লোকজনের মধ্যে স্বভাবতই কৌতূহলের উদ্রেক ঘটে এবং অনেকে তাহার নিকট জানিতে চান যে, এই বিপুল অর্থের উৎস কী? জবাবে বিপ্লব জানান, ‘আমি আলাদিনের চেরাগ পাইয়া গিয়াছি, ঘষা দিলেই টাকা বাহির হইবে।' মজার ব্যাপার হইল, কিছু দিন পর এলাকার লোকজন গণমাধ্যমের খবরে দেখিতে পান যে, আলাদিনের চেরাগ হাতে পাওয়া তাহাদের সেই বিপ্লব পুলিশের জালে ধরা পড়িয়াছে! জানা যায়, একটি চক্রের সহিত যুক্ত হইয়া দীর্ঘদিন ধরিয়া বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সনদ, তথা সার্টিফিকেট জালিয়াতি করিয়া আসিতেছিলেন। আর এই ‘সার্টিফিকেট-বাণিজ্য' করিয়াই এক সময়ের নিম্নবিত্ত বিপ্লব বনিয়া গিয়াছেন অঢেল সম্পদের মালিক।

আলোচিত এই ঘটনার পর বাহির হইয়া আসিতে থাকে থলির বিড়াল। কেবল বিপ্লবের নিজ উপজেলারই পাঁচ শতাধিক ব্যক্তি তাহার জাল সনদে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করিতেছেন। বিষয়টি লইয়া সেই সময় উদ্বেগ প্রকাশ করিয়াছিলেন দেশের সচেতন মহল। কারণ, বিপ্লবের জাল সার্টিফিকেট লইয়া যাহারা চাকুরিতে ঢোকেন, তাহাদের অধিকাংশই চাকুরি বাগাইয়া নিয়াছেন স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। অর্থাৎ জাতি গড়িবার মহান দায়িত্ব পালন করিতেছেন কিছু কিছু জাল শিক্ষা সনদধারী—কী সাংঘাতিক বিষয়!

শিক্ষাসনদ প্রতারণার এই ধরনের ঘটনার কথা আমরা প্রায়ই শুনিয়া থাকি। তবে এই বারকার ঘটনাটা একটু ব্যতিক্রম! কারণ, এই বার সনদ বিক্রির অভিযোগ উঠিয়াছে একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে, বাস্তবে যাহার কোনো অস্তিত্বই নাই। গতকাল বুধবার দৈনিক ইত্তেফাকের একটি প্রতিবেদন হইতে জানা যায়, ইস্ট এশিয়ান ইউনিভার্সিটি নামে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্ধান পাইয়াছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। বাস্তবে এই বিশ্ববিদ্যালয়টির কোনো অস্তিত্ব না থাকিলেও ওয়েবসাইট খুলিয়া দেদার সার্টিফিকেট বিক্রয় করিতেছে তাহারা। এমনকি নিজেদের অনুমোদিত বিশ্ববিদ্যালয় দাবি করিয়া ওয়েবসাইটে বিভিন্ন তথ্যও আপলোড করিয়া থাকে ‘বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ'। আর এই সকল চটকদার তথ্য বা বিজ্ঞাপনের ফাঁদে পড়িয়া সহজ-সরল শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অনেকে আর্থিক ক্ষতির শিকার হইয়াছেন ও হইতেছেন।

অবশ্য এই ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর এক বিজ্ঞপ্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়টির অবৈধ এমন কার্যক্রম ও ভুয়া তথ্যে প্রলুব্ধ না হইতে ভর্তি-ইচ্ছুক শিক্ষার্থী, অভিভাবক, চাকুরিপ্রার্থী ও চাকুরিদাতাদের সতর্ক করিয়া দিয়াছে ইউজিসি। সংস্থাটি পরিষ্কার জানাইয়া দিয়াছে যে, উল্লিখিত নামে অনুমোদিত কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নাই। ওয়েবসাইটে মিথ্যা তথ্য উপস্থাপনের মাধ্যমে অবৈধভাবে কার্যক্রম চালাইতেছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। উল্লেখ্য, বিশ্ববিদ্যালয়টির নামে চালু থাকা ওয়েবসাইট অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ৪০টি স্নাতক প্রোগ্রামে ২ হাজার শিক্ষার্থী পড়িতেছেন ১৫০ জন শিক্ষক-কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে। শুধু তাহাই নহে, এখন পর্যন্ত এই বিশ্ববিদ্যালয় হইতে ২৫ হাজার গ্র্যাজুয়েট স্নাতক শেষ করিয়াছ বলিয়া তাহারা দাবি করিয়াছে। 

শিক্ষাসনদ বাণিজ্যের এই ধরনের চিত্র সম্ভবত আরো পাওয়া যাইবে অনুসন্ধান করিলে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত—এই বিষয়ে পর্যাপ্ত খোঁজখবর করা। এই ধরনের জালিয়াতির সংবাদ হিমবাহের চূড়া মাত্র, তলে লুকাইয়া রহিয়াছে বৃহৎ অংশ। বিভিন্ন সময় আমরা যেই ভুয়া ডাক্তার আটক হইতে দেখি, তাহারা মূলত এই সকল সিন্ডিকেটের নিকট হইতেই সনদ কিনিয়া চিকিৎসার ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বসিয়া যান! চিকিৎসা, শিক্ষাসহ প্রায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠান হইতেই এই ধরনের ভুয়া সার্টিফিকেটধারীকে শনাক্ত হইবার বহু উদাহরণ রহিয়াছে। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে প্রতারণার ধরন যেমন বদলাইয়াছে, বৃদ্ধি পাইয়াছে ইহার মাত্রাও। সময়ের সহিত পাল্লা দিয়া বাড়িতেছে প্রতারক ও প্রতারণার অভিনব সকল কৌশল।

সুতরাং, এই সকল বিষয়ে সকলকে সজাগ, সতর্ক থাকিতে হইবে। বিশেষত শিক্ষা, স্বাস্থ্যের ন্যায় খাতগুলোতে যাতে কোনোভাবেই সনদ জালিয়াতির সুযোগ না থাকে, সেই ব্যবস্থা করিতে হইবে। শিক্ষার্থী-অভিভাবকদেরও উচিত বিশদভাবে খোঁজখবর লইয়া সেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়া—নচেৎ মূল্যবান অর্থ ও সময় উভয়ই নষ্ট হইবে। সর্বোপরি, তাহাদের উপলব্ধি করিতে হইবে যে, ‘জ্ঞান ছাড়া একটি সার্টিফিকেট আপনার হাতে গুলিবিহীন বন্দুকের মতো।’

ইত্তেফাক/এসএএস