‘এ কি অপরূপ রূপে মা তোমায় হেরিনু’

আপডেট : ২৩ জানুয়ারি ২০২৫, ১৯:০২

পর্যটন প্রকৃতির অপূর্ব সৌন্দর্য, ভ্রমণপিয়াসী মানুষের মেধার বিকাশ ঘটায়, সৃষ্টির রহস্য উদ্‌ঘাটনে আগ্রহ জন্মায়। ভ্রমণ জ্ঞানার্জন, বিনোদন, শিক্ষা গ্রহণের উপযুক্ত মাধ্যম। মানুষ দেশ-বিদেশের প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়। বদ্বীপসদৃশ এ বঙ্গভূমির বিচিত্র রূপ বিশ্বে আকর্ষণীয়। এ দেশের সমুদ্রতটরেখা, সমান্তরাল ভূমি, সারিবদ্ধ পাহাড়-পর্বত, জলপ্রপাত, সবুজ ঘেরা বন-বনানী, নদী, হাওর-বাঁওড়, বিল-ঝিল, হ্রদ, জলাশয়, বাংলাদেশকে সমৃদ্ধিশালী করেছে। প্রকৃতির নয়াভিরাম সৌন্দর্যের এশিয়ার কিংবদন্তি দেশ বাংলাদেশ।

এ বাংলা আপন মহিমায় সারা বিশ্বে বহুল পরিচিত। বাংলার সৌন্দর্যে বিভোর হয়ে কবি পেয়েছেন ভাষা, মানুষের হয়েছে আশা, ভ্রমণপিয়াসীদের মনের তৃষ্ণা মেটায়। এ কারণে কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায় বলেছিলেন, ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি।’ 

উত্তরে হিমালয়, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, জল-স্থল বিচিত্র রূপের সমারোহ প্রকৃতির রূপকন্যা বাংলাদেশ। কিন্তু, ‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া...একটি ধানের শিষের উপর একটি শিশির বিন্দু।' কম আয়তনের জনবহুল এ দেশের বন-জঙ্গল উজাড় হলেও জল পর্যটনগুলো খুবই সুন্দর ও আকর্ষণীয়। এমন এক মনোমুগ্ধকর জলাভূমির নাম 'লাল শাপলা বিল'। ইয়ামবিল, হরূপকাটাবিল ডিবিবিল ও কেন্দ্রীয় বিলসহ চারটি বিলকে একত্রে ডিবির হাওর বলা হয়। হাওরটি 'লাল শাপলা বিল' নামেও খ্যাতি অর্জন করেছে। এটি লাল শাপলা ফুলের বিশাল এক বাগান।

খুব ভোরে সূর্যোদয়ের আগ থেকে শাপলা ফুলের পাপড়ি একসঙ্গে বৈদ্যুতিক লাল বাতির মতো ফুটে ওঠে। সূর্যের তাপে কয়েক ঘণ্টা পর শাপলা ফুলের পাপড়ি ঝিমু হয়ে যায়। এ দৃশ্যটি দেখতে হাজার হাজার পর্যটক এ হাওরে ভিড় জমান। নভেম্বর থেকে জানুয়ারি—এ তিন মাস শাপলা হাওর ফুলের স্বর্গরাজ্য হয়ে যায়। ফুল থেকে মৌমাছিরা মধু আহরণে ওড়াউড়ি করে। নৌকা দিয়ে হাওরটি ঘুরে দেখা যায়।

৯০০ একর বা প্রায় চার বর্গকিলোমিটার আয়তনে এ বিলে একসময় কোনো শাপলা ছিল না। প্রায় ৩০০ বছর আগে সীমান্তের ওপারে ভারতীয় খানিয়া সম্প্রদায়, তাদের পূর্জা অর্চনার জন্য হাওরে লাল শাপলার বীজ ও চারা রোপণ করেছিলেন। তখন থেকে ধীরে ধীরে হাওরের প্রায় ৭০০ একর জলাভূমি শাপলা ফুলের গাছ দখল করে নেয়। এলাকার অনেক পুকুরেও শাপলা ফুল দেখা যায়। শাপলাগাছের বীজকে শালুক বলা হয়, শালুক ও ফুলের ডগা পুষ্টিকর খাদ্য।

এ হাওরে শাপলাগাছের পাতার ওপর দিয়ে ছোট-বড় পাখি হেঁটে খাদ্য সংগ্রহ করে থাকে। জৈন্তা রাজ্যের রাজা রামসিংহের স্মৃতিবিজড়িত এ হাওরটি। কথিত আছে, রামসিংহকে এ হাওরে পানিতে ডুবিয়ে মারা হয়েছিল। হাওরের মধ্যভাগে প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো জরাজীর্ণ রামসিংহের একটি মন্দির দেখতে পাওয়া যায়। হাওরের তীরে মনোমুগ্ধকর পাহাড়গুলো সবুজের সমারোহের বেষ্টনী, পর্যটকদের নজর কাড়ছে। এ দৃশ্য হিমালয় পর্বত আহরণের সমতুল্য।

পর্যটকদের যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্ত দেহ নিয়ে হাওরটি দেখতে এলে আনন্দে মন ভরে যায় । জাদুকর এ হাওরটি একবার দেখতে এলে পুনরায় দেখার ইচ্ছা হয়। ছোট্ট এ হাওরটিতে মিঠা পানির বোয়াল, পাবদা, কই, খইয়া, পুঁটি, টেংরা, বাইম, আইড়, সউলসহ অনেক প্রজাতির মাছ রয়েছে। শীতকালে পরিযায়ী পাখি, কাইম, সরাইল, হাঁস, ডাহুক, কুড়া, পানকৌড়ি, চিল, মাছরাঙাসহ বিভিন্ন ধরনের পাখি দেখতে পাওয়া যায়। হাওরটি খনন না করায় শীত মৌসুমে হাওরের উপরিভাগ শুকিয়ে যায়। বর্তমানে মূল হাওরে পানির গভীরতা প্রায় চার থেকে পাঁচ ফুট। হাওরের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় একটি কমিটি রয়েছে। এখানে পর্যটকদের বসা বা চা-নাশতা করার কোনো ব্যবস্থা নেই।

প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে দুইটি টং দোকান রয়েছে। সিলেট শহর থেকে প্রায় ৪২ কিলোমিটার দূরের হাওরটিতে যেতে হলে দূরের পর্যটকদেরকে সিলেট শহরে এসে রাত্রি যাপন করতে হয়। প্রতিদিন দুই- আড়াই হাজার পর্যটকের আগমন ঘটলেও শুক্র ও শনিবারে ৫ হাজার থেকে ৬ হাজারের মতো পর্যটকের ভিড় জমে। হাওরটি খনন করা হলে জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং এ অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এলাকাবাসীর দাবি-এসএ রেকর্ড মতে হাওরটি সীমানা নির্ধারণ করে খননের জন্য একটি পরিকল্পনা গ্রহণ আবশ্যক।

পশু-পাখি, মাছ জীববৈচিত্র্যের অভয়াশ্রমের দেশ সেরা বিলের নাম 'বাইক্কা' বিল। এ বিলে জলজ ও উভচর প্রাণীর বাস। মৌলভীবাজারের চা-সমৃদ্ধ শ্রীমঙ্গলের পাশে ১০০ একর আয়তনবিশিষ্ট বাইক্কা বিলের অবস্থান। বাইক্কা বিলটির একটি সুন্দর ঐতিহাসিক নামকরণও রয়েছে। প্রায় দেড় শ বছর আগে বাইক্কা হাওরের মূল বিলটি ছিল বক্র রেখার মতো আঁকাবাঁকা।

পরবর্তী সময়ে বাঁকা শব্দ থেকে বাইক্কা শব্দটির উৎপত্তি হয় এবং মুখে মুখে বাইক্কা বিল নামে পরিচিতি লাভ করে। হাওর ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি মিন্নত মিয়া এ নামকরণের সঙ্গে একমত পোষণ করে জানান, তিনিও আগেকার এলাকার প্রবীণ মুরুব্বিগণের মুখ থেকে এমন নামকরণ শুনেছিলেন। গরু, মহিষ, বুনোহাঁসের চারণভূমি এ হাওর। হাওরটিতে পার্পল, সোয়াম, হেন বা কালেম পাখির বিচরণ পর্যটকদের মন কেড়ে নেয়। পদ্ম ও শাপলা ফুল ফুটে হাওরটি শীতকালে নববধূর মতো সাজানো-গোছানো দেখা যায়। বাইক্কা বিলে সকাল-বিকাল বিরতিহীনভাবে লাল ও সবুজ রঙের ফড়িং ওড়াউড়ির এক নয়াভিরাম সৌন্দর্য অনুভব করা যায়।

২০০৩ সালের পয়লা জুলাই ভূমি মন্ত্রণালয় বাইক্কা বিলকে পশু-পাখি, মৎস্য ও জীববৈচিত্র্যসম্পদ রক্ষায় অভয়াশ্রম হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ২০১১ সালে এক গবেষণামূলক জরিপে ১৫৩ প্রজাতির পরিয়া ও ৫০ প্রজাতির স্থানীয় পাখি শনাক্ত করে ১৭টি পরিয়া ও ১৪টি স্থানীয় পাখির পায়ে আংটি পরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বিলটিতে পশু-পাখি ও মাছ শিকার নিষিদ্ধ করায় পশু-পাখির বংশ বৃদ্ধি অনেক গুণ বেড়েছে। উত্তর মেরু, ইউরোপ, সাইবেরিয়া, রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল, মঙ্গোলিয়া ও হিমালয়ের পাদদেশের দেশগুলো থেকে পরিয়া পাখি দলবেঁধে এ হাওরটিতে আসে। হাওয়টির সৌন্দর্য উপভোগের জন্য একটি দ্বিতল টাওয়ার নির্মাণ করা হয়েছে।

পাখিরা দিনে খাবারের পর, হাওরে থাকা হিজল, করস, কলমি, নয়নকারা, পানা, সিংড়া, মামনার, শাপলা ও নীল পদ্ম উদ্ভিদের ওপর বিশ্রাম নেয়। এ হাওরের অতিথি পাখি ল্যাঙ্গাহাঁস, গিরিয়াহাস ভূতিহাঁস, সুরচেরং, রাজস রাইল, পাতি সরাইল, ঠেঙ্গি মেটেমাথাটিটি, গেওলা বাটান, সৈকত, পালান, কাস্তেচরা, কালোমাথা, বেগুনি কালেম, পানমুরগি, নেউপিপি, দলপিপি, রাঙ্গাবক, পানকৌড়ি, মাছরাঙা, শামুক ভাংড়ি, গাংচিল ধনেশসহ বাংলাদেশের বিলুপ্ত অনেক প্রজাতির পাখির দেখা মেলে বাইক্কা বিলে।

বর্তমানে ১৮ প্রজাতির বিলুপ্তপ্রায় মাছসহ ১৬০ প্রজাতির মাছ রয়েছে হাওরে। এ হাওরে বোয়াল, মেনি, ফলি, রানি, আইড়, পাবদা, সউল, গজার, পুঁটি টেংরা, বাইম, রুই, কাতলাসহ অনেক প্রজাতির মাছে ভরপুর। কয়েক বছর আগে বিদেশি একটি সংস্থার উদ্যোগে হাওরে কিছু উন্নয়ন করা হলে এ পর্যন্ত সরকারিভাবে হাওর উন্নয়নে কোনো কাজ করা হয়নি।

লক্ষণীয় বিষয় যে, গত দুই দশকে দেশের জলপর্যটন কেন্দ্রগুলোতে বিপুল পরিমাণ পর্যটকের সমাগম ঘটছে। এর মধ্যে বাইক্কা বিলে পর্যটকের আগমন অনেক বেশি। কিন্তু পিকনিকের নামে পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে যত্রতত্র ময়লা, আবর্জনা, পলিথিন, খাবারের প্যাকেট, প্লাস্টিক ফেলে পর্যটনকেন্দ্র ও আশপাশ এলাকায় ময়লার স্তূপ করে রাখা হয়। কিছু কিছু পর্যটন এলাকায় কিশোর গ্যাংদের অশ্লীলতা, উচ্চ স্বরে মাইকে গান-বাজনায় শব্দদূষণ যন্ত্রণাও বেড়েছে।

হাওর, বিল শুধু প্রকৃতির শোভা নয়, দেশ ও জাতির বড় সম্পদ। জলপর্যটন হাওর-বিল জলাশয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে শক্তিশালী হাতিয়ার। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্যের বিশাল ভান্ডার বাইক্কা বিল উন্নয়নে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা আবশ্যক এবং পর্যটকরা পর্যটনকেন্দ্রগুলোর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দিকে সজাগ দৃষ্টি রাখা একান্ত প্রয়োজন।

লেখক : বিশ্লেষক ও নিবন্ধকার

ইত্তেফাক/এসএএস