তরুণরাই গড়িয়া তুলিবে নূতন পৃথিবী

আপডেট : ২৪ জানুয়ারি ২০২৫, ০৪:৩৩

প্রায় আড়াই হাজার বৎসর পূর্বে মহামতি সক্রেটিস বলিয়াছিলেন—‘যুবকেরা আমাদের আশা, তাহাদের মধ্যে নূতন চিন্তাধারা, নূতন শক্তি এবং নূতন উদ্যম রহিয়াছে।' পবিত্র কুরআন শরিফের সুরা আর-রুম, আয়াত ৫৪-এ বলা হইয়াছে যে, মহান আল্লাহ আমাদের সৃষ্টি করেন দুর্বলতা হইতে, দুর্বলতার পর তিনি দেন শক্তি; শক্তির পর আবার দেন দুর্বলতা ও বার্ধক্য। এখানে মহান আল্লাহ তাআলা স্বীয় অসীম ক্ষমতার আরো একটি পরিপূর্ণতার কথা বর্ণনা করিয়াছেন। আর তাহা হইল, মানুষ সৃষ্টির বিভিন্ন স্তর। দুর্বলতার অর্থ হইল, শিশু অবস্থা। আর শক্তির অর্থ হইল— যৌবনকাল, যাহাতে দৈহিক ও জ্ঞান-বুদ্ধির শক্তি পরিপূর্ণতা লাভ করিয়া থাকে। অর্থাৎ, শক্তির স্তরটি হইল তরুণদের। 

স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা তরুণদের নিকট শক্তি অর্পণ করিয়াছেন। প্রকৃত অর্থে পৃথিবীর ইতিহাস পর্যালোচনা করিলে দেখা যায়, প্রতিটি যুগে তরুণ প্রজন্মই নূতন চিন্তাধারা, নূতন আন্দোলন এবং নূতন পরিবর্তনের সূচনা করিয়াছে। বাংলাদেশেও তরুণদের উদ্যম, সৃজনশীলতা এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা সমাজকে নতুন রূপ দিয়াছে। বাংলাদেশের জাতীয় জীবনেও তরুণদের অবদান অপরিসীম। সম্প্রতি বাংলাদেশের একজন দায়িত্বশীল তরুণ নেতৃত্ব বলিয়াছেন যে, জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের ফলস্বরূপ আগামী দুই দশক ধরিয়া বাংলাদেশের রাজনীতি ও সমাজে তরুণদের প্রভাব অব্যাহত থাকিবে।

আমরা মনে করি, তরুণদের কেবল ‘প্রভাব' নহে, তরুণরাই তাহাদের চিন্তাভাবনা, ধারণা ও কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে রাষ্ট্র, রাজনীতি ও সমাজকে ব্যাপকভাবে পুনর্নির্মাণ করিবে। নেলসন ম্যান্ডেলা যেমন বলিয়াছেন, ‘আমি শিখিয়াছি যে বীরত্ব হইল প্রতিদিন উঠিয়া দাঁড়ানো।' তরুণরাই প্রতিদিন উঠিয়া দাঁড়াইতে পারে, আমাদের এই বীরত্ব শিখাইতে পারে। তরুণদের দৈনন্দিন জীবনে যেই সকল চ্যালেঞ্জ আসে, তাহা মোকাবিলা করিতে তাহারা পিছু হটে না। ইহা যুগে যুগে সমগ্ৰ বিশ্বেরই চিত্র। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাহার কপালকুণ্ডলার উপকূলে সর্গে লিখিয়াছেন যে, উপকূলে আশ্রয় নেওয়া সকল নৌকাযাত্রীর হিতার্থে নায়ক নবকুমার কাঠ আনিতে গিয়াছিল। এইদিকে জোয়ার চলিয়া আসায় দ্রুত নৌকা ছাড়িতে হইবে বিধায় সকলেই উদ্‌গ্রীব হইয়া গেল— কখন নবকুমার আসিবে; কিন্তু নবকুমার সহসা আসে না। তখন বাকি সকলে মিলিয়া নিজেদের প্রবোধ দিল ‘নবকুমারকে ব্যাঘ্রে হত্যা করিয়াছে। তাহাই সম্ভব। তবে এত ক্লেশ-স্বীকার কি জন্য?' তাহার নবকুমারকে সেইখানে একাকী রাখিয়াই নৌকা লইয়া চলিয়া গেল। আর এমন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা পাইলাম সেই বিখ্যাত উক্তি—‘তুমি অধম তাই বলিয়া আমি উত্তম হইব না কেন?' 

সবুজের অভিযানে রবীন্দ্রনাথ যেমন বলিয়াছেন—‘ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা,/ ওরে সবুজ, ওরে অবুঝ,/ আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা', তেমনি নবীন আর তরুণরাই চিরকাল আমাদের হতাশার সলতেতে আশার আলো জ্বালাইয়া দেয়। কয়েক বৎসর পূর্বে ইংল্যান্ডে ৮২ বৎসর বয়সি ব্রিটিশ নারীকে বাঁচাইবার চেষ্টা করিয়া ২০ বৎসর বয়সীয় এক ব্রিটিশ মুসলিম তরুণ মারা গিয়াছেন। তিনি মারা গিয়াছেন বটে, তবে তাহার বীরত্বপূর্ণ কাজের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সকলের নিকট প্রশংসিত হইয়াছেন তিনি। সেই সময় বাংলাদেশে নারায়ণগঞ্জে বখাটেদের কবল হইতে এক দম্পতিকে রক্ষা করিতে গিয়া ছুরিকাঘাতে সানজিদ দেওয়ান নামে এক তরুণ নিহত হইয়াছেন। এই ধরনের বিভিন্ন ঘটনা বলিয়া দেয়, এক মানুষের প্রাণ রক্ষার্থেও তরুণরা নিজেদের বিপন্ন করিতে দ্বিধা করে না। অর্থাৎ তাহারা সাহসী, দায়িত্ববোধসম্পন্ন এবং ন্যায়ের পক্ষে।

বস্তুত, তরুণদের হাতেই জাতির ভবিষ্যৎ। তাদেরকে উৎসাহিত করিতে হইবে, তাদেরকে সুযোগ দিতে হইবে। তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণের জন্য একটি সুস্থ পরিবেশ গড়িয়া তোলাটাই উন্নত রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য। আমাদেরও সেই বৈশিষ্ট্য ধারণ করিতে হইবে। এই জন্য তরুণদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করিতে হইবে। সুতরাং তরুণদের কেবল প্রভাব নহে, তরুণরাই গড়িয়া তুলিবে নূতন পৃথিবী।

ইত্তেফাক/এনএন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন