চন্দ্রাভিযান মানবজাতির জন্য যুগান্তকারী এক পদক্ষেপ। ১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই চাঁদের বুকে প্রথম অবতরণের পর গত ৫০ বছরে বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তিগত বিশাল অগ্রগতি হয়েছে। অন্যভাবে বললে ঐ চন্দ্রাভিযানের কারণেই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে যা কিনা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনেও নানাভাবে প্রভাব রেখে চলেছে। ওই কর্মসূচি এমন কিছু ক্ষেত্রের অগ্রগতিতে ভূমিকা রেখে চলেছে যা জেনে অনেকেই অবাক হবেন।
১. প্রযুক্তির নতুন আবিষ্কার
অ্যাপোলো অভিযানের ১০ বছর পর সেই প্রযুক্তি থেকেই তৈরি হয় ডাস্টবাস্টার ভ্যাকুয়া, ক্লিনারের। অ্যাপোলো অভিযানের আগে থেকেই তারবিহীন শক্তির ব্যাপারটি প্রচলিত ছিল। কিন্তু ওই অভিযান এসব পণ্যের উন্নতিতে ভূমিকা রেখেছিল, যার সুফল এখন আমরা ভোগ করছি। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, আমেরিকান সরঞ্জাম নির্মাতা কোম্পানি ব্লাক এন্ড ডেকার ‘স্যানস কেবল’ ড্রিলের বা শক্তি প্রয়োগের সরঞ্জামের উদ্ভাবন করে ১৯৬১ সালে। এই একই কোম্পানি নাসাকে এমন বিশেষ একটি শক্তি প্রয়োগের যন্ত্র তৈরি করে দিয়েছিল, যা স্যাটেলাইট থেকে মূল নমুনা সংগ্রহ করতে সহায়তা করে।
২. নির্ভুল সময় রক্ষার প্রযুক্তি
চাঁদে সফলভাবে অবতরণের জন্য নির্ভুলতা বা যথাযথতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সেকেন্ডের সামান্য একটি অংশের পার্থক্য হলে সেটি নভোচারীদের জন্য জীবন-মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারত। সুতরাং মিশন পরিচালনা করার জন্য নাসার দরকার ছিল বিশ্বের সবচেয়ে নির্ভুল ঘড়ির। ফলে এর সমাধান বের করতে গিয়ে আজকের কোয়ার্টাজ ঘড়ির উন্নত সংস্করণ বের হয়ে আসে।
৩. পানি পরিষ্কারের উন্নত পদ্ধতি
সুইমিং পুলের পানি পরিষ্কারের জন্যও নাসার অবদান রয়েছে। অ্যাপোলো মহাকাশযানে পানি পরিষ্কার করার প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল, যা এখন অনেক পানির উেস ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস এবং জলজ উদ্ভিদ দমনে ব্যবহার করা হয়। রূপালী আয়ন ব্যবহারের মাধ্যমে ক্লোরিনমুক্ত প্রযুক্তি ব্যবহারের সূচনা হয় তখন থেকেই। এখন এই প্রযুক্তি সুইমিং পুলের পানি আর ঝর্ণার পানি পরিষ্কারের ক্ষেত্রে সারা পৃথিবী জুড়েই ব্যবহূত হচ্ছে।
৪. দীর্ঘমেয়াদী জুতা তৈরির কৌশল উদ্ভাবন
মহাকাশ পোশাক তৈরির প্রযুক্তি এখন অনেক স্পোর্টস পোশাক তৈরিতে ব্যবহূত হয়। চাঁদে হাঁটাহাঁটি করার জন্য ১৯৬৫ সালে যে ধরনের পোশাকের নকশা করা হয়েছিল, এখনো বিশ্বের নভোচারীরা সেই ধরনের পোশাক ব্যবহার করেন। তবে ঐ প্রযুক্তি জুতা তৈরিতেও অনেক অবদান রেখেছিল।
৫. আগুন প্রতিরোধী কাপড়ের ব্যবহার
নভোচারীদের রক্ষায় যে অগ্নিপ্রতিরোধী পোশাক তৈরি করেছিল নাসা, তা এখন পৃথিবীর অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহূত হয়। ১৯৬৭ সালে একটি প্রশিক্ষণ মহড়া চলার সময় অ্যাপোলো-১ আগুন লেগে তিন জন নভোচারী মারা যান, যা আমেরিকান মহাকাশ কর্মসূচিতে বিপর্যয় ডেকে আনে। ঐ ঘটনার পর নাসা এমন একটি আগুন প্রতিরোধী কাপড় তৈরিতে উদ্যোগী হয় যা এখন বিশ্বে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়।
৬. জীবন বাঁচানো হূদরোগ প্রযুক্তি
নাসার একটি ক্ষুদ্র আকারের সার্কিটের প্রযুক্তি অনুসরণ করে হূদযন্ত্রের চিকিত্সায় ইমপ্লান্টেবল ডিফ্রিবিলিটার আবিষ্কৃত হয়। ইমপ্লান্টেবল ডিফ্রিবিলিটার, যা হূদযন্ত্রের বিপজ্জনক এবং অস্বাভাবিক কম্পনের চিকিত্সায় ব্যবহূত হয়, সেটি প্রথমে আবিষ্কার করা হয়েছিল নাসার একটি ক্ষুদ্র আকারের সার্কিটের প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে গিয়ে।
৭. শুকনো খাবার
অ্যাপোলো অভিযানে খাবার সংরক্ষণের প্রযুক্তি এখন ছড়িয়ে পড়েছে বাণিজ্যিকভাবেও। চাঁদে যাওয়ার পরিকল্পনা করতে গিয়ে নাসাকে চিন্তা করতে হয়েছে কীভাবে জায়গার সবচেয়ে ভালো ব্যবহার করা হয় এবং মহাকাশযানটিকে যতটা সম্ভব হালকা রাখা যায়। ফলে অ্যাপোলো মিশনের খাবার নিয়েও গবেষণা করতে শুরু করেন নাসার বিজ্ঞানীরা। এর ফলে ঠাণ্ডা-শুকনো প্রযুক্তির উদ্ভাবন হয়।
৮. টিকে থাকার কম্বল
মহাকাশ কম্বল প্রযুক্তি এখন পৃথিবীর অনেক মানুষের জরুরি সহায়তায় ব্যবহূত হচ্ছে। মহাকাশের কম্বল হচ্ছে এমন একটা অপরিবাহী জিনিস, যা অ্যাপোলোর লুনার মডিউলকে সূর্যের তাপ থেকে রক্ষায় ব্যবহার করছে মহাকাশ এজেন্সিগুলো। প্লাস্টিক, ফিল্ম এবং অ্যালুমিনিয়াম দিয়ে তৈরি করা মহাকাশ কম্বল এখনো নভোচারীদের রক্ষা করে চলছে। অনেক সময় এ ধরনের পোশাক ম্যারাথন ইভেন্টে ব্যবহার করা হয়। অনেক হাসপাতাল রোগী এবং কর্মীদের উন্নতির জন্য নিয়মিতভাবে এই মহাকাশ প্রযুক্তি ব্যবহার করে। -বিবিসি
