‘একটি মাদক মামলার আইনজীবী হিসেবে আমি ওই কোর্টে ছিলাম। তখন দেখতে পাই এক আসামি হাতে ছুরি নিয়ে ফিল্মি স্টাইলে আরেক আসামির পিছনে ছুটছে। এ দৃশ্য দেখে আমি বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ি। আদালতে এমন ঘটনা ঘটলে আমাদের নিরাপত্তা কোথায়?’
গত সোমবার কুমিল্লায় আদালতের ভেতরে বিচারকের খাস কামরায় উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে এক আসামির হাতে আরেক আসামি খুনের ঘটনায় এভাবেই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন আইনজীবী শাহিদ বেগম। এই হত্যাকান্ডের পর বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে আদালতকক্ষে কর্মরত বিচারক ও বিচার কাজে জড়িতদের নিরাপত্তা নিয়ে। এ নিয়ে উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা প্রকাশ করেছেন আদালতের কর্মকর্তা-কর্মচারী, আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীরা।
কুমিল্লা আদালত ভবনের তৃতীয় তলায় অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ ৩য় আদালতে মামলার বিচারিক কার্যক্রম চলাকালে একটি হত্যা মামলার হাসান নামের এক আসামি একই মামলার ফারুক নামের অপর আসামিকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে। এসময় এএসআই ফিরোজ আহম্মেদ ঘাতককে রক্তমাখা ছুরিসহ ঝাপটে ধরেন। তিনি ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে বাদী হয়ে সোমবার রাতেই জেলার লাকসাম উপজেলার ভোজপুর গ্রামের শহীদ উল্লাহর ছেলে হাসানের বিরুদ্ধে কোতয়ালী মডেল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। পরে মামলাটি ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়।
ঘাতকের জবানবন্দি:এ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রদীপ মন্ডল গতকাল মঙ্গলবার জানান, ‘জিজ্ঞাসাবাদে আসামি হাসান ১৬১ ধারার জবানবন্দিতে ঘটনার দায় স্বীকার করেছে। বিকালে তাকে কুমিল্লার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট জালাল উদ্দিনের আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি প্রদানের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেও সে (হাসান) ফারুক হত্যার দায় স্বীকার করে। জবানবন্দি দেওয়ার পর তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।’ তদন্তকারী কর্মকর্তা আরও জানান, গতকাল কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ফারুকের ময়নাতদন্ত শেষে বিকালে মরদেহ তাঁর স্বজনদের নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে।
এদিকে কুমিল্লা আদালত অঙ্গণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। আদালতের প্রধান ফটকসহ প্রতিটি ফটকে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা অবস্থান নিয়ে দেহ তল্লাশী করে লোকজনকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেন। তবে দিনভর আদালত এলাকায় আতংক ও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছিল।
এজলাসকক্ষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ:এদিকে এ ঘটনার পর আদালতের বিচারক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও বিচারকার্যে সংশ্লিষ্টরা নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন। তারা আদালতের প্রতিটি ফটকে নিয়মিত পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য নিয়োজিত করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য দাবি জানান। গতকাল আদালত অঙ্গণে ঘুরে এ ঘটনার বিষয়ে আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীসহ কমপক্ষে ১৮ জনের সঙ্গে এই প্রতিনিধির কথা হয়। তারা এ ঘটনায় প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে প্রশ্ন ছুঁড়ে বলেন, ছোড়া নিয়ে আসামি কিভাবে বিচারকের এজলাসকক্ষে প্রবেশ করলো? সেখানে প্রবেশের আগে দায়িত্বরত পুলিশ আসামিদের চেক করলো না কেন? তারা বলছেন, মানুষের বিচার পাওয়ার একমাত্র আশ্রয় যেখানে, সেখানেই মানুষের নিরাপত্তা নেই!
আদালতে আসা বিচারপ্রার্থী জেলার দেবিদ্বার উপজেলার ফতেহাবাদ গ্রামের আহসান উল্লাহ, চৌদ্দগ্রামের কোমারডোগা গ্রামের ফজলুর রহমানসহ বেশ কয়েকজন জানান, আদালতে বিচারকের সামনে প্রকাশ্যে যদি ছুরি দিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে তাহলে আমাদের নিরাপত্তা কোথায়? আমরা জীবনের নিরাপত্তা চাই, বিচারালয়ের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বেষ্টনী গড়ে তোলার জন্য সরকারের নিকট দাবি জানাই।
সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) কুমিল্লার সভাপতি বদরুল হুদা জেনু বলেন, এজলাসে ছোড়া নিয়ে আসামি ঢুকবে, মানুষ খুন করবে তা মেনে নেওয়া যায় না। ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনা না ঘটে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সেদিকে সর্বোচ্চ নজর দিতে হবে।
বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা কুমিল্লা শাখার সভাপতি অ্যাডভোকেট নাজমুল আলম চৌধুরী নোমান বলেন, আদালতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পুলিশের দায়িত্ব। এজলাসের ভেতর কোন প্রকার অস্ত্র নিয়ে প্রবেশ নিষিদ্ধ। তারপরেও অনাকাঙ্ক্ষিত এ হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছে। এ ঘটনায় আমরা বিব্রত।
সিনিয়র আইনজীবী আবুল হাসেম বলেন, বিচারকের এজলাসে যদি কেউ অস্ত্র নিয়ে ঢুকে মানুষ হত্যা করে, তাহলে মানুষ কোথায় বিচারপ্রার্থী হবে? পুলিশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আধুনিকায়ন করা জরুরি।
আদালতের পুলিশ পরিদর্শক (কোর্ট ইন্সপেক্টর) সুব্রত ব্যানার্জি জানান, ‘আদালতের ইতিহাসে এমন ঘটনা আর ঘটেনি, এটা অবিশ্বাস্য। এতে পুলিশের কোনো অবহেলা ছিল না। এ ঘটনার পর আদালত ঘিরে কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী গড়ে তোলা হয়েছে।’
কুমিল্লা পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম জানান, ‘এ ঘটনায় গঠিত ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। দু’-এক দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া যাবে। আদালতের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে।’
পূর্বপরিকল্পিত হত্যা :ঘাতক হাসানের জবানবন্দির বরাত দিয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রদীপ মন্ডল জানান, ‘সম্পত্তির ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে বিরোধের জেরে ২০১৩ সালের ২৬ আগস্ট আবদুল করিমকে তাঁর ছেলে-সন্তান ও নাতি ফারুকসহ অন্যরা মিলে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করে। ওই ঘটনায় হাসান জড়িত না থাকলেও তাকে মামলায় আসামি করা হয়। এ মামলায় ফারুকের বাবা ছাড়া সকলে জামিনে আছেন। কিন্তু ফারুকের বাবা অহিদ উল্লাহ মামলা দায়েরের পর থেকে পলাতক থাকায় মামলায় দীর্ঘসূত্রিতা দেখা দেয় এবং জামিনপ্রাপ্তদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। এতে তাঁর (ঘাতক হাসান) মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। সেই ক্ষোভ থেকে সে হাজিরা দিতে আসার সময় পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ধারালো ছুরি সঙ্গে নিয়ে আদালতের ভেতরে প্রবেশ করে এবং সেখানে ফারুককে হত্যার উদ্দেশ্যে ছুরিকাঘাত করে।’
