ভূমিকম্পের ঝুঁকি মোকাবিলায় আমরা কতটা প্রস্তুত 

আপডেট : ০৭ মার্চ ২০২৫, ০৬:০০

সাম্প্রতিক কালে তুরস্ক ও সিরিয়ায় ভয়াবহ ভূমিকম্পের ঘটনা ঘটিবার পর হইতে আমাদের নগরবিদ হইতে শুরু করিয়া সাধারণ মানুষ পর্যন্ত বাংলাদেশে বড় ধরনের ভূমিকম্পের আশঙ্কায় বেশ উদ্বিগ্ন। বিশেষ করিয়া, রাজধানী ঢাকার মানুষের আশঙ্কা যে কোনো শহরের তুলনায় অধিক। কেননা ভূতাত্ত্বিক গঠন অনুসারে ঢাকা শহর মধুপুর ফল্ট বা বিভাজনের মধ্যে অবস্থিত। এইখানে প্রতিনিয়ত মাটির গভীরে টেকটোনিক প্রতিক্রিয়া বিরাজমান। ঢাকা বুড়িগঙ্গা নদী ও তুরাগ নদবেষ্টিত একটি শহর।

এই দুইটি নদনদীর সৃষ্টিই হইয়াছে মধুপুর টেকটোনিক বিভাজনের প্রতিক্রিয়ায়। প্রাকৃতিকভাবেই ঢাকা এবং ইহার পার্শ্ববর্তী এলাকায় টেকটোনিক প্রতিক্রিয়া চলমান থাকায় বড় ধরনের ভূমিকম্পের আশঙ্কা বহুলাংশে বিরাজমান। গত দুই দশকে ঢাকা শহরে নগরায়ণ বাড়িয়াছে ২৭ শতাংশ। ঢাকার জলাশয়ের আয়তন কমিয়াছে প্রায় ২০ শতাংশ। ইহা ছাড়া ২০১১ সালে ঢাকা শহরে ১ কোটি ২০ লক্ষ লোকের বাসস্থান থাকিলেও ২০২১ সালে আসিয়া তাহা প্রায় দ্বিগুণ হইয়াছে। তাই বড় ধরনের ভূমিকম্পে খোদ রাজধানীতে জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হইতে পারে।

এই প্রসঙ্গের অবতারণা এই জন্য যে, সার্বিক আলামত দেখিয়া আমরা মোটেও স্বস্তি বোধ করিতেছি না। বাংলাদেশে মাঝেমধ্যেই ছোট ও মাঝারি মাত্রার যে ভূকম্পন দেখা দিতেছে, তাহা এক কথায় উদ্বেগজনক। বিশেষ করিয়া, গত ১০ দিনে চার দফা ক্ষুদ্র হইতে মাঝারি আকারের ভূমিকম্প অনুভূত হইয়াছে এই দেশে। ইহার প্রায় প্রতিটিরই উৎপত্তিস্থল ছিল দেশের সীমানার ভিতর বা পার্শ্ববর্তী দেশসমূহে। সর্বশেষ গত বুধবার রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা কাঁপিয়া উঠে ভূমিকম্পে। মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পটির রিখটার স্কেলে মাত্রা ছিল ৫.৬। যদিও এই ভূমিকম্পে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পাওয়া যায় নাই, তথাপি শঙ্কা আমাদের পিছু ছাড়িতেছে না। যুক্তরাষ্ট্রের জিওলজিক্যাল সার্ভে (ইউএসজিএস) জানাইয়াছে, এই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ভারতের মণিপুরের রাজধানী ইম্ফলের ইয়ারিপক এলাকা।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণাকেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৭ সালে বাংলাদেশে এবং কাছাকাছি এলাকায় ২৮টি ভূমিকম্প হয়। ২০২৩ সালে ইহার সংখ্যা বৃদ্ধি পাইয়া দাঁড়ায় ৪১টি এবং গত বৎসর ২০২৪ সালে দেশে ও আশপাশে ৫৩টি ভূমিকম্প হইয়াছে। ইহা ছিল আট বৎসরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এমতাবস্থায় বিশেষজ্ঞরা বলিতেছেন, ছোট ও মাঝারি ভূকম্পনের কারণে যে কোনো সময় একটি বড় ভূমিকম্প সংঘটিত হইতে পারে। তাহাদের মতে, সাত মাত্রার ভূমিকম্পগুলি ফেরত আসিবার সময় হইয়া গিয়াছে। এমনটি ঘটিলে রাজধানী ঢাকার ৪০ শতাংশ বাড়িঘর ধ্বংস হইয়া যাইতে পারে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের তথ্যমতে, বাংলাদেশ ভূকম্পনের সক্রিয় এলাকায় অবস্থিত। দুর্যোগ সূচক অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী ভূমিকম্পের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ২০টি শহরের মধ্যে রহিয়াছে ঢাকা। ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা আরো বলিতেছেন, বার্মিজ প্লেট ও ইন্ডিয়ান প্লেটের পরস্পরমুখী গতির কারণেই ঘন ঘন এই ধরনের ভূমিকম্প হইতেছে। এই দুইটি প্লেটের সংযোগস্থলে প্রচুর পরিমাণে শক্তি জমিয়া রহিয়াছে, যাহা বাহির হইয়া আসিবার পথ খুঁজিতেছে।

বাংলাদেশ সরকার প্রণীত ভূমিকম্পঝুঁকি নিরূপণ মানচিত্রে দেখা যায়, সমগ্র দেশকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হইয়াছে। তাহার মধ্যে উচ্চঝুঁকিসম্পন্ন জেলাগুলি হইল-সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, শেরপুর ও নেত্রকোনা। আর ঝুঁকি-২ বা মধ্যম ঝুঁকিতে রহিয়াছে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল, টাঙ্গাইল, গাজীপুর, ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ, বগুড়া, গাইবান্ধা, রংপুর ও কুড়িগ্রাম। ইহার বাহিরে দেশের অন্যান্য এলাকাগুলি কম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসাবে চিহ্নিত করা হইয়াছে। তাই আমাদের জরুরি ভিত্তিতে এই শহরগুলিতে ভূমিকম্পের সময়ে কী করিতে হইবে, তাহার মহড়া দেওয়া শুরু করা প্রয়োজন। এই জন্য ভূমিকম্প মোকাবিলার প্রস্তুতি ও মহড়াকে নিয়মিত চর্চার মধ্যে লইয়া আসিতে হইবে। জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনায় (২০২১-২০২৫) বলা হইয়াছে, বাংলাদেশে যদি বড় মাত্রার ভূমিকম্প হয়, তাহা হইলে সমগ্র দেশে ৬ কোটি ১২ লক্ষ মানুষ ক্ষতির মুখে পড়িবে। সেই অনুযায়ী আমাদের প্রস্তুতি কোথায়? তাই ভূমিকম্পের সম্ভাব্য ঝুঁকি প্রশমনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ ও সামাজিক সচেতনতা গড়িয়া তুলিবার এখনই সময়।

ইত্তেফাক/এএম