পুলিত্জার বিজয়ী লেখক হারপার লি’র অনবদ্য উপন্যাস ‘টু কিল অ্যা মকিংবার্ড’-এর কাহিনি নিয়ে তৈরি হয়েছে এই মুভি। ছবি মুক্তির সময়কাল :১৯৬২ সাল। ছবির পরিচালক :রবার্ট মালিগান।
মাঝবয়সী বিপত্নীক আইনজীবী এটিকাস ফিঞ্চ এবং তার দুই সন্তান—৬ বছর বয়সী মেয়ে স্কাউট এবং ১০ বছর বয়সী ছেলে জিমকে ঘিরে গড়ে উঠেছে ছবির কাহিনি।
স্কাউটের বয়ানে—ছোটবেলার স্মৃতি পর্দায় আমরা দেখতে পাই! বাবা-সন্তানের ভালোবাসা এবং তাদের একে অপরের প্রতি নির্ভরতা, সেই সময়ের সামাজিক প্রেক্ষাপট, মূল্যবোধ, বর্ণবাদ, মানুষের প্রতি মানুষের আস্থা ইত্যাদি বিষয়গুলো অনবদ্যভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন ছবির পরিচালক।
১৯৩০ সালের পটভূমিতে তৈরি এ ছবিতে আমরা দেখতে পাই—আমেরিকার এলাবামা প্রদেশের অবহেলিত, অযত্নে গড়ে ওঠা ছোট্ট এক শহরের পুরনো একটা বাড়িতে আইনজীবী এটিকাস তাঁর দুই সন্তানকে নিয়ে থাকতেন। এই বাড়িতে হাউসকিপার হিসেবে কাজ করে এক নিগ্রো মহিলা যার নাম ক্যালপার্নিয়া।
প্রতিদিন সকালবেলায় এটিকাস সাহেব কাজে বেরিয়ে যান। জিম ও স্কাউট গ্রীষ্মের উত্তপ্ত দিনে খেলে সময় পার করে। প্রতিবেশী বাচ্চা ডিলের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় দুই ভাইবোনের। তিন বন্ধুতে সারাদিন খেলা চলতে থাকে। কিন্তু যতই এটা ওটা খেলুক না কেন তাদের সব আগ্রহ রাস্তার শেষ মাথায় বো রেডলির বাসার দিকে। শিশুমনে আগ্রহ তৈরি হওয়াটাই স্বাভাবিক। বো ৩০ বছর ধরে বাড়ি থেকে বের হয়নি। বোকে নিয়ে অনেকরকম গল্প প্রচলিত আছে।
জিমকে বলতে শোনা যায়—বোকে ওই অন্ধকার রহস্যময় বাড়িতে বিছানার সঙ্গে চেইন দিয়ে বেঁধে রেখে গিয়েছে মিস্টার রেডলি (বো’র বাবা)! এ কথাও ছড়িয়েছে বো নাকি কাঁচা কাঠবিড়ালি আর বিড়াল ধরে ধরে খায়, দেখতেও ভয়ংকর। মুখে একটা বিশাল আকৃতির ক্ষতও নাকি আছে। তার দাঁত হলুদ এবং মুখ দিয়ে ক্রমাগত লালা পড়ে! শিশুদের মনে এসব অদেখা রহস্যময় ব্যাপারগুলো কী ভীষণ ছাপ ফেলতে পারে সেটা এটিকাস সাহেবের দুই ছেলেমেয়ে আর তাদের বন্ধু ডিলের কর্মকাণ্ডে দেখতে পাই। শিশুরা অদেখা-অজানা যেকোনো রহস্যের একটু ছিটেফোঁটা পেলেই ওটার ওপর ভিত্তি করে কল্পনার পাহাড় গড়ে ফেলে এবং একসময় সেই ব্যাপারগুলোকে সত্য বলে বিশ্বাস করতে থাকে। অহেতুক ভীতি জন্ম নেয় শিশুমনে। ঘুরেফিরে তিন বন্ধুর খেলা, গল্প গিয়ে শেষ হয় বো রেডলির রহস্যময় অন্ধকার বাড়িকে ঘিরে।
এদিকে জিম ও স্কাউটের বাবা আইনজীবী মিস্টার এটিকাস ফিঞ্চকে কোর্টে লড়তে হচ্ছে টম রবিনসন নামে এক নিগ্রোর পক্ষ হয়ে—যার বিরুদ্ধে মায়েলা নামের শ্বেতাঙ্গ এক মহিলাকে রেপ করার মিথ্যা দোষ আরোপ করা হয়েছে। বেশির ভাগ শ্বেতাঙ্গ টম রবিনসনের বিপক্ষে। তারা চায় এই নির্দোষ লোকটার আচ্ছামতো শাস্তি হোক। ১৯৩০ সালের পটভূমিতে এটাই যেন স্বাভাবিক। ব্ল্যাক আমেরিকানরা নিষ্ঠুরভাবে বর্ণবাদ-বৈষম্যের শিকার সব জায়গায়। সাদা আমেরিকানরা যদি একবার কালোদের বিপক্ষে যায়, যতই যুক্তি থাকুক না কেন ম্বেতাঙ্গরাই সবসময় জয়ী হয়েছে ওই সময়টাতে। এলাবামার ওই ছোট্ট শহরের টম রবিনসনের ঘটনা যেন গোটা আমেরিকার প্রতিচ্ছবি। এদিকে মায়েলার বাবা মিস্টার ইউয়েল (কথিত রেপ ভিক্টিমের বাবা)। আইনজীবী এটিকাস ফিঞ্চ একজন কালো আমেরিকানের পক্ষ নিয়ে লড়ছে বলে তাকে থামানোর জন্য এটিকাসের দুই সন্তানকে বিভিন্নভাবে হুমকি-ধামকি এবং ভয় দেখিয়ে বেড়াচ্ছিল। কোর্টে ট্রায়ালের পর ট্রায়াল চলতে থাকে। যথেষ্ট যুক্তি প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও জুরিবোর্ড (হোয়াইট আমেরিকানরা) টমকে দোষী সাব্যস্ত করে। নির্দোষ টম এই অন্যায় মেনে নিতে পারেনি বলে জেল থেকে পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করায় তাকে গুলি করে মারা হয়। টম রবিনসন বর্ণবাদের নির্মম শিকার। সিনেমার শেষের দিকে দেখা যায়—রাতের আঁধারে মিস্টার ইউয়েল (মায়েলার বাবা) মিস্টার এটিকাসের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য জিম ও স্কাউটকে বাড়ি ফেরার পথে কাপুরুষিত আঘাত হানে! বাচ্চাদুটোকে বাঁচাতে অতর্কিতে হাজির হয় সেই রহস্যময় বাড়ির রহস্যময় চরিত্র বো রেডলি (৩০ বছর ধরে যে বাড়ি থেকে বের হয়নি)! এবং ধ্বস্তাধস্তির একপর্যায়ে বো রেডলির ছুরিকাঘাতে মারা যায় মিস্টার ইউয়েল।
মুভির নাম ‘টু কিল অ্যা মকিংবার্ড’ কেন? সিনেমার একপর্যায়ে মিস্টার এটিকাসকে ছেলের উদ্দেশে বলতে শোনা যায়—‘it’s a sin to kill a mockingbird.’ মিস্টার এটিকাস ছেলেমেয়েকে বলে—তোমরা যত খুশি নীলকণ্ঠ পাখি মেরে ফেলো—পাপ নেই। নীলকণ্ঠ পাখিদের নিজেদের জোরালো স্বর আছে, নিজের গান আছে, কিন্তু মকিংবার্ডদের নিজেদের কোনো গান নেই। অন্য পাখিদের গানই তারা গেয়ে যায়। এই মুভিতে মকিংবার্ড-কে রূপক অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। ব্ল্যাক আমেরিকান টম রবিনসন এবং রহস্যময় বো রেডলি—এই দুজনকে মকিংবার্ডের সঙ্গে তুলনা করা যায়। তারা নির্দোষ, নিষ্পাপ। অন্য মানুষরা তাদের নিয়ে (টমকে রেপিস্ট হিসেবে এবং বোকে রহস্যময় ভয়ংকর মানুষ হিসেবে যা তারা নয়) যে গুজব ছড়িয়েছে সেভাবেই সবাই তাদের চেনে। মানুষজন সত্যমিথ্যা যাচাই না করেই দোষী আখ্যা দিয়েছে। টম এবং বো’র নিজেদের বলার সুযোগ রাখেনি—ঠিক যেন মকিংবার্ডের মতো। আর তাই নিরীহ, নিষ্পাপ, নির্দোষকে মেরে ফেলা মকিংবার্ড হত্যা করার মতোই পাপ।
দর্শক হিসেবে আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে এটিকাস এবং তার দুই ছেলেমেয়ের সম্পর্ক, তাদের আলাপচারিতা, একজনের প্রতি আরেকজনের মমত্ববোধ, ভালোবাসা। পুরো ছবিতে এটিকাসকে দেখা যায় সন্তানদের সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে, উচিত-অনুচিতের ব্যবধান বোঝাতে। সে যে স্তরের মানুষই হোক না কেন, তাকে সম্মান করতে হয়, ঔদ্ধত্য দেখাতে হয় না—তা মি. এটিকাস বিভিন্নভাবে সন্তানদের বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। চলচ্চিত্রটিতে আমার পছন্দের কিছু দৃশ্যের কথা না বললেই নয়।
প্রতিরাতে ঘুমের আগে মেয়ে আর বাবার গল্প বলা, আলাপচারিতা, স্কাউটের একের পর এক প্রশ্নের ধৈর্য ধরে উত্তর দেওয়া—এসব দৃশ্য মন ছুঁয়ে গেছে। চলচ্চিত্রটির একদম শুরুতে দেখা যায়, ওয়াল্টার কানিংহাম নামে এক গরিব কৃষক কৃতজ্ঞতা প্রকাশে এটিকাসের বাসায় এসে খাবার রেখে গেছে। স্কাউট এটিকাসকে বাড়ির ভেতর থেকে ডেকে নিয়ে এসে ধন্যবাদ দিতে বলে মিস্টার ওয়াল্টারকে। ওয়াল্টার চলে গেলে এটিকাস মেয়েকে বারণ করে দেন পরেরবার ওয়াল্টার এলে যাতে তাকে ডাকা না হয়। ধন্যবাদ দিলে বিব্রত বোধ করেন তিনি। এটিকাস কোনো একসময় বিনা পয়সায় লড়েছিলেন ওয়াল্টারের হয়ে। গরিব ওয়াল্টারের খাবার রেখে যাওয়া সেই কৃতজ্ঞতার প্রকাশ। সন্তানদের ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য বড় বড় উপদেশের বুলি আওড়ানো লাগে না—বাবা-মা প্রাত্যহিক জীবনে যা করেন, তা দেখেই শেখে সন্তানরা। স্কাউট তার স্কুলের প্রথম দিন মারামারি করে ফিরলে এটিকাস মেয়েকে বোঝাতে গিয়ে বলেন—
‘You never really understand a person until you consider things from his point of view... Until you climb inside of his skin and walk around in it.’ মুভিতে আমার প্রিয় উক্তির একটি। এটিকাস একজন নিগ্রোর হয়ে লড়েছেন বলে স্কাউটকে স্কুলে হিউমিলিয়েট করা হলে বাসায় ফিরে স্কাউট জানতে চায়, তার বাবা কেন একজন ‘নিগার’-এর হয়ে লড়ছে। ‘নিগার’ শব্দটা ব্ল্যাক আমেরিকানদের অসম্মান করে ব্যবহার করা হতো। এটিকাস স্পষ্ট করে স্কাউটকে জানিয়ে দেন যাতে এ শব্দটা কখনো আর না বলে, যুক্তি থাকুক বা না থাকুক—কখনো যাতে কারো সঙ্গে মারামারি না করে।
কোর্টে ট্রায়ালের আগেরদিন যখন টমকে তার ফ্যামিলির সঙ্গে রাখা হয়, সে রাতে একজন দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে মিস্টার এটিকাস টমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পাহারায় বসেন—যাতে টমের ওপর কোনো আক্রমণ না আসে। একদল শ্বেতাঙ্গ যখন টমকে বাড়ি থেকে বের হতে বলে, এটিকাস তা প্রতিহত করার চেষ্টা করেন। দূর থেকে জিম এবং স্কাউট টমের বাড়ির সামনে জটলা দেখে বাবার বিপদ আঁচ করে চলে আসে জটলার মধ্যে। এটিকাস চলে যেতে মানা করা সত্ত্বেও তারা যায় না। এ দৃশ্যটিতে ছেলেমেয়ের বাবার জন্য দুশ্চিন্তা, ভালোবাসা, মমতা কী সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলেছেন ছবির পরিচালক। ছোট্ট মেয়ে স্কাউট কী পরিমাণ দক্ষতার সঙ্গে পরিস্থিতির সামাল দেয়! মাঝে মাঝে ছোটরা বড়দের থেকেও অনেক বেশি যে সমঝদার হয়, তা এই দৃশ্যতে ধরা পড়ে।
ছবির প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত অনবদ্য। কাহিনির ওঠানামা, সাসপেন্স, ডায়ালগ সবকিছু দর্শককে বাধ্য করবেই পুরো ছবিটি দেখার। প্রতিটি চরিত্রের অভিনয় অসাধারণ। এটিকাস চরিত্রে গ্রেগরি পেক এবং জিম, স্কাউট চরিত্রে দুই শিশুর সাবলীল অভিনয় অনবদ্য, অতুলনীয়। দর্শক হিসেবে আমি জানি এ ছবিটি আমি আরো বেশ ক’বার দেখব।
অসাধারণ এই ছবিতে ছবির পরিচালক সুনিপুণভাবে বর্ণবাদ, বৈষম্য, দারিদ্র্য, মমতা, মানবিকতা, ভালোবাসা অর্থাত্ তখনকার সামাজিক পরিস্থিতির কুিসত রূপের পাশাপাশি নরম, হূদয়স্পর্শী দিকটাও ফুটিয়ে তুলেছেন।
