নদী

শঙ্খ

আপডেট : ১৮ জুলাই ২০১৯, ২০:২৯

সরকারি নাম সাঙ্গু। প্রাচীনকাল থেকে সবাই  চেনে শঙ্খ নদী বলে। বাংলাদেশের বান্দরবানের সীমান্তবর্তী থানচি থানার মদক নামের পাহাড় থেকে এ নদীর উত্পত্তি। শঙ্খ নদী পাহাড়ের কোল থেকে নেমে বান্দরবান ও চট্টগ্রাম বিস্তীর্ণ গ্রামের আঁকাবাঁকা পথে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মিশেছে। প্রাচীন সভ্যতার মিশর যেমন নীল নদের দান, ঠিক তেমনি শঙ্খ নদীর দান দক্ষিণ চট্টগ্রাম। রূপবতী শঙ্খর দুধারে সবুজ পাহাড়। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে বন্যায় পলি পড়ে শঙ্খ নদীর উভয় কূলের মাটি উর্বর হয়, ফলে শীত মৌসুমে প্রচুর তরিতরকারি উত্পাদন হয়। নদীর পাড়ের টাটকা সবজি দোহাজারী থেকে সড়ক ও রেলপথে চট্টগ্রাম শহরসহ বিভিন্ন জায়গায় যায়। শঙ্খ নদীতে অনেক জেলে মাছ ধরে জীবন জীবিকা নির্বাহ করে। এছাড়া নদীর দুই তীরের মানুষ যেমন সুফল পায়, ঠিক তেমনি বর্ষা মৌসুমে প্রলয়ঙ্করী বন্যায় ঘরবাড়িও হারাতে হয়। এ নদীর সঙ্গে বৈতরণী, ধর্মপুর, কাঠগর, দোহাজারী, নলুয়া, আমিলাইশ, চরতি ও চানপুরের মানুষের স্বার্থ জড়িত।

কথিত আছে, শঙ্খ নদীরা নাকি সাত বোন। প্রবাদ আছে ‘মরা গরু জিয়ি গিয়ে শঙ্খ নদী ফিরে গিয়ে’। কাহিনিটি এরকম—শ্রাবণের কোনো এক ঘন বর্ষণের ভোরে খরস্রোতা শঙ্খ নদী দিঘিতে ঢুকবে পণ করে প্রবল বেগে আছড়ে পড়েছিল পাড়ে। মঠের ধ্যানাসনে উপবিষ্ট শ্রী শুক্লাম্বর হাতে কমণ্ডলুটি নিয়ে এসে দাঁড়িয়েছিলেন এ প্রবল স্রোতের মুখে। তিনি দিঘির জল অপবিত্র হবে ভেবে নদীকে ফিরে যেতে অনুরোধ করেছিলেন। নদীর জল দিঘিতে ঢুকলে দিঘির জল অপবিত্র হওয়ার আশঙ্কা ছিল। কারণ নদীর স্রোতে ভেসে এসেছিল একটি মরা গরু। ইষ্টদেবতাকে স্মরণ করে এ সাধক হাতের কমণ্ডলুর জল ছিটিয়ে দিয়ে বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন মরা গরুটি। প্রাণ ফিরে পেয়ে সেটি গিয়ে দাঁড়িয়েছিল উঁচু ডাঙায়। মুহূর্তে স্থির হয়ে গিয়েছিল উন্মত্ত জলরাশি। জল থেকে উঠে এসেছিলেন মকর বাহনা গঙ্গা। তিনি বর দিয়েছিলেন যে শঙ্খ নদীর জল কোনোদিন দিঘিতে প্রবেশ করবে না। স্থানটি চন্দনাইশের বরমায় শ্রী শুক্লাম্বর দিঘি নামে সুপরিচিত।

এক সময় এই শঙ্খ দিয়েই ছুটে যেত রঙ্গিলা মাঝির সাম্পান। আঞ্চলিক গানের মুকুটহীন সম্রাজ্ঞী শিল্পী শেফালী ঘোষের কণ্ঠে ভুলতে পারি না—

পালে কী রং লাগাইলো রে মাঝি

সাম্পানে কী রং লাগাইলো

শঙ্খ খালর সাম্পানওয়ালা আঁরে

পাগল বানাইলো...

বর্ষা মৌসুমে প্রচুর বৃষ্টির কারণে শঙ্খ নদীর রুদ্ধ ভয়ঙ্কর রূপ আমি আমার শৈশবে দেখেছি। পূর্ব কাটগড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আমি ক্লাস টু কিংবা থ্রি-তে পড়ি—ঐ সময় শঙ্খ নদীর ভাঙনে বিদ্যালয়টি বিলীন হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে বিদ্যালয়টি স্থানান্তর করা হয় জয়নগরের পূর্ব পাশে। সে সময় টানা চার-পাঁচ দিন বৃষ্টিতে বর্ষা মৌসুমে শঙ্খ নদীর পানি বেড়ে গেলে আমাদের ঘরে হাঁটুর ওপরে পানি উঠত। ঘরের আসবাবপত্র খাট ইটের ওপর ইট দিয়ে উঁচু করতে হতো। পানি ওঠা যেমন কষ্টকর, ঠিক তেমনি পানি নেমে যাওয়ার পরের পরিষ্কারের সময়ও বড়োই যন্ত্রণাদায়ক।