পবিত্র কুরআনে সুরা ইউনুসের একটি অংশে বলা হইয়াছে,– ‘মহান আল্লাহ সূর্যকে তৈরি করিয়াছেন বিচ্ছুরিত আলোর উৎসরূপে, আর চাঁদকে করিয়াছেন জ্যোতির্ময়...মহান আল্লাহ এই সকল অনর্থক সৃষ্টি করেন নাই।' মানবজাতির ক্ষতিগ্রস্ততার কথা স্মরণ করাইয়া দিতে গিয়া সুরা আছরের মধ্যে আলাহ তাআলা ‘যুগ-সময়ের শপথ' করিয়াছেন । সময়জ্ঞানের এই বার্তা পাওয়া যায় প্রতিটি ধর্ম-অনুশাসনে। অর্থাৎ, ইহা একদম স্পষ্ট যে, যতটুকু সময় লইয়া একজন মানুষ পৃথিবীতে আসে, তাহা খুবই মূল্যবান এবং অনেক বড় প্রাপ্তি। মূলত এই কারণেই বিজ্ঞজনেরা মানবকুলের উদ্দেশে ‘সময় গেলে সাধন হবে না’, ‘সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ’, ‘সময় কারো জন্য অপেক্ষা করে না' ইত্যাদি নানা হিতোপদেশ দিয়া গিয়াছেন।
সফল ব্যক্তিদের জীবন অধ্যয়ন করিলেও একটি কমন সাদৃশ্য পাওয়া যাইবে—সময়ের প্রতি তাহারা প্রত্যেকেই ছিলেন অত্যন্ত সচেতন ও যত্নশীল । তাহাদের স্লোগান ছিল, ‘সময়ের মূল্য বুঝে করে যারা কাজ, তারা আজ স্মরণীয় জগতের মাঝ' ।
সময়ের মূল্য ও মর্যাদার এই পাঠ আমরা গ্রহণ করিয়া থাকি শৈশবেই; বলা যায়, ইহা বিদ্যাশিক্ষায় হাতেখড়ির প্রথম পাঠ। যদিও জীবনে চলার পথে আমরা করি উলটাটা। আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো লক্ষ করি, সময়ের বিরামহীন-ক্লান্তিহীন বহিয়া চলিবার দৃশ্য—তাহার যেন ফিরিয়াও তাকানোর ফুরসত নাই। সময়ের এই যে ‘গতিশীলতা’–এইখানেই মূলত নিহিত রহিয়াছে জীবনে সাফল্য অর্জনের মূলসূত্র। বিষয়টি আরো স্পষ্ট করিয়া বুঝাইতে সেই ব্যাঙের গল্পটির অবতারণা করিতে হয় ।
দুইটি ব্যাঙ পানিভর্তি কড়াইয়ের মধ্যে পড়িয়া খানিক বাদে বুঝিতে পারে, পানি ক্রমশ গরম হইয়া উঠিতেছে । কনকনে ঠান্ডার মধ্যে উষ্ণতার স্পর্শ কে না চাহিবে? ব্যাঙ দুইটি তাই মনের সুখে আরাম উপভোগ করিতে থাকে। তবে খুব ভালো কিছু যে ঘটিতেছে না, তাহারা ঠিকই বুঝিতে পারিতেছিল ।
যেই ভাবা সেই কাজ । একটি ব্যাঙ লাফ দিয়া পাত্রের বাহিরে চলিয়া আসে । তবে দ্বিতীয় ব্যাঙটি তাহা না করিয়া বরং মনের সুখে গরম পানিতে শরীর জুড়াইতে থাকে। তাহার ভাবনা ছিল, পানি যখন খুব গরম হইয়া অসহনীয় হইয়া উঠিবে, ঠিক সেই সময় লাফ দিবে; কিন্তু বিধি বাম! প্রকৃতি তো নিয়মের বাহিরে চলে না। ফলে একটি সময়ে আসিয়া ব্যাঙটি যখন লাফ দিতে উদ্যত হয়, তখন আর ‘সময়’ ছিল না! উত্তপ্ত কড়াইয়ের তীব্র গরম পানিতে তাহার শরীর অসাড় হইয়া আসে এবং সে ঝলসাইয়া মারা যায় ।
সত্যি বলিতে, মানুষের অবস্থাও গল্পের ব্যাঙের চাইতে ভিন্ন কিছু নহে! উত্তপ্ত অবস্থাকেও যেন আমরা গ্রাহ্য করিতে চাহি না । চারিপাশের নানা ঘটনার ঘনঘটাতেও যেন আমাদের টনক নড়ে না । আমরা যেন ‘সময়ের মার' বুঝিয়াও বুঝিতে চাহি না। ফলে একটি সময়ে আসিয়া আমাদের দশা হয় সেই ব্যাঙটির মতো—লাফ দেওয়ার ইচ্ছা থাকিলেও আর ‘উপায়’ বা ‘সুযোগ’ কোনোটিই থাকে না। এই বাস্তবতা সম্পর্কে জ্ঞানীরা ওয়াকিবহাল বিধায় তাহারা সময়কে ‘সমীহ' করিয়া চলেন। চারিপাশের পরিবেশ-পরিস্থিতি বুঝিয়া সেই মোতাবেক চলিতে চেষ্টা করেন । কখন লাফাইতে হইবে আর কখন স্থির, থিতু হইতে হইবে, সেই হিসাব মাথায় লইয়া তবেই পথে পা বাড়ান। উন্নত জাতি সময়ের কদর করিয়াই উন্নত হইয়াছে—এমন হাজারো দৃষ্টান্ত রহিয়াছে আমাদের চোখের সামনে।
একটি প্রসিদ্ধ ফারসি উক্তি হইল,– ‘যদি একটি মুহূর্ত উদাসীন থাকি, তাহলে হাজার মাস পিছনে পড়ে যাব।' আরেক বিদেশি প্রবাদে বলা হইয়াছে, ‘অদৃষ্টের হাতে সেই জাতি তরবারিসদৃশ, যারা প্রতি মুহূর্তে নিজেদের কাজ-কর্মের হিসাব কষে।' জীবন ও সময়ের আসল হিসাবনিকাশ মূলত এইখানেই!
কোন জাতির ভাগ্যে কী আছে কিংবা কাহার জীবনে কী ঘটিবে, তাহা সৃষ্টিকর্তা ব্যতীত কাহারো জানা নাই। সুতরাং, সময়ের প্রতি কোনো অবস্থাতেই বীতশ্রদ্ধ হইয়া যাইবে না। সময়ের পরিক্রমায় জীবনে ব্যর্থতা আসিতে পারে, পরাজয় ঘটিতে পারে, তথাপি সেই সময়ে কেবল ‘সময়ের নিকটেই আত্মসমর্পণ’ করিয়া ‘ওয়ার্ক আউট’ করিয়া যাইতে হইবে। খুঁজিয়া বাহির করিতে হইবে, মনের অজান্তে হইলেও সময়কে কখন, কীভাবে অবজ্ঞা-অবহলো করা হইয়াছে। মনে রাখিতে হইবে, ছোট্ট এই জীবনে সময় নষ্ট করিবার মতো ‘সময়’ আসলেই নাই !
