বায়ুদূষণকে বলা হয় নীরব ঘাতক। যেহেতু নীরবে-নিভৃতে ধীরে ধীরে ইহা আমাদের প্রাণবায়ু নিঃশেষিত করে, তাই ইহা লইয়া আমাদের মাথাব্যথা ও জনসচেতনতা কম। বলিতে গেলে বিষয়টি আমরা তেমন একটা গ্রাহ্যই করি না। বিশেষত উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলিতে যেহেতু সমস্যার অন্ত নাই, তাই ইহা আমাদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে যেমন নাই, তেমনি এই সমস্যার সমাধানেও নাই কোনো অগ্রাধিকার; কিন্তু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করিলে দেখা যাইবে জনস্বাস্থ্যের উপর ইহার নেতিবাচক প্রভাব সুদূরপ্রসারী ও সর্বব্যাপী।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী বিশ্বের মোট মৃত্যুর দ্বিতীয় কারণ হইল বায়ুদূষণ। গতকাল ইত্তেফাকের এক রিপোর্টে বলা হইয়াছে, রাজধানী ঢাকার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট যক্ষ্মা হাসপাতালে চলতি বৎসর জানুয়ারি মাসের ৩১ দিনে চিকিৎসা লইয়াছে ৮ হাজার ৬১৪ জন রোগী। ফেব্রুয়ারি মাসে ইহাই দাঁড়াইয়াছে ৯ হাজার ৬৪০ জনে। অর্থাৎ দেশে বায়ুদূষণ ক্রমশ বাড়িয়াই চলিয়াছে; কিন্তু সেই ব্যাপারে আমাদের তেমন ভ্রুক্ষেপ নাই।
বেশ কয়েক বৎসর ধরিয়া আন্তর্জাতিকভাবে বলা হইতেছে যে, বিশ্বের মধ্যে অন্যতম শীর্ষ বায়ুদূষিত দেশ বাংলাদেশ, তাহার পরও আমাদের টনক নড়িতেছে না! গত মঙ্গলবার সুইজারল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ারের 'বৈশ্বিক বায়ুমান প্রতিবেদন ২০২৪' হইতেও পাওয়া গেল উদ্বেগজনক তথ্য। বিশ্বের ১৩৮টি দেশ ও অঞ্চলের ৮ হাজার ৯৫৪টি শহরের প্রায় ৪০ হাজার নজরদারি স্টেশন হইতে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা হইয়াছে এই প্রতিবেদনটি। তাহাতে বলা হইয়াছে, বায়ুদূষণে ২০২৪ সালে দেশ হিসাবে শীর্ষে ছিল আফ্রিকার চাদ। আর নগর হিসাবে শীর্ষে ছিল ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি।
ইহার পর দ্বিতীয় অবস্থানটিই বাংলাদেশের। আর নগর হিসাবে বিশ্বের তৃতীয় শীর্ষ দূষিত নগর ছিল ঢাকা। দেশ হিসাবে তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম স্থানে ছিল যথাক্রমে পাকিস্তান, গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র ও ভারত। উল্লেখ্য, ইহার পূর্বে তথা ২০২৩ সালে বায়ুদূষণে বাংলাদেশ শীর্ষে ছিল। নগর হিসাবে ঢাকার অবস্থান ছিল দ্বিতীয়। অর্থাৎ সার্বিকভাবে বায়ুদূষণে পূর্বের বৎসরের তুলনায় গত বছর বাংলাদেশের অবস্থানের সামান্য পরিবর্তন হইয়াছে। শীর্ষ অবস্থান হইতে বাংলাদেশের স্থান হইয়াছে দ্বিতীয়। আর নগরীগুলির মধ্যে ঢাকা দ্বিতীয় হইতে তৃতীয় হইয়াছে। তবে এই পরিবর্তনকে তাৎপর্যপূর্ণ বলিয়া মনে করিতেছেন না পরিবেশবিদগণ। কেননা গবেষণায় দেখা যাইতেছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই দূষণ আরো বিস্তৃত হইয়াছে।
রাজধানীর তুলনায় দেশের সার্বিক গড় বায়ুমান পূর্বে যেইখানে কিছুটা ভালো ছিল, সেইখানে এখন সেই মান প্রায় একই দেখা যাইতেছে। তাহা ছাড়া গবেষণাপ্রতিষ্ঠান বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) এক তথ্য অনুযায়ী চলতি বৎসরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে পূর্বের ৯ বৎসরের চাইতে অধিক দূষিত ছিল বাংলাদেশ। তাই এখন শুধু রাজধানী ঢাকা নহে, সমগ্র দেশেই বায়ুদূষণ রোধে সচেষ্ট হইতে হইবে। এই জন্য শহর অঞ্চলের রাস্তার পার্শ্ববর্তী উন্মুক্ত স্থান ঘাস দ্বারা আচ্ছাদিত করা, ধূলিদূষণ হ্রাসে জল ছিটানোসহ নানা পদক্ষেপ লইতে হইবে। অবৈধ ইটভাটাসহ দূষণ সৃষ্টিকারী প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিকে শাস্তির আওতায় আনিতে হইবে। এই জন্য নিয়োগ দিতে হইবে পর্যাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট। আবার দূষণের উৎস নিয়ন্ত্রণেও জাতীয় ও আঞ্চলিক ভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করিতে হইবে।
বিশ্বব্যাংকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০১৯ সালে বায়ুদূষণসহ চার ধরনের পরিবেশদূষণে ২ লক্ষ ৭২ হাজারের অধিক মানুষের অকালমৃত্যু হইয়াছে। তাহার মধ্যে ৫৫ শতাংশ মানুষের মৃত্যু হইয়াছে বায়ুদূষণের কারণে। ইহা ছাড়া দূষণের কারণে ঐ বৎসর দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১৭ দশমিক ৬ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এমনকি বায়ুদূষণের কারণে বিনিয়োগ ও পর্যটনের মতো খাতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অতএব, বায়ুদূষণ যে জনস্বাস্থ্য ও জাতীয় অর্থনীতির জন্য বিষফোড়াস্বরূপ, তাহা আমাদের সর্বান্তঃকরণে উপলব্ধি করিতে হইবে। এই পরিস্থিতির উন্নতি সাধনে গাছপালা রোপণ, পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহারে উৎসাহিত করা, শিল্পকারখানার দূষণ নিয়ন্ত্রণ, ইলেকট্রিক যানবাহনের ব্যবহার বৃদ্ধি, বর্জ্যব্যবস্থাপনার উন্নতি ইত্যাদিসহ গ্রহণ। হণ করিতে হইবে সর্বাত্মক উদ্যোগ।
