মহাকালের অনন্ত নক্ষত্রবীথির পথে চিরদিনের জন্য চলে গেছেন নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ—ভাটিবাংলার জলমগ্ন হাওরের ‘লিলুয়া’ বাতাসে ভেসে, অপরূপ জোছনার স্মৃতিতে ভিজে ভিজে ‘শ্রাবণ মেঘের দিনে’র অন্বেষায়। সাত বছর আগে হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যু এমনই এক চলে যাওয়া, যার অন্য নাম ‘মায়াবী প্রস্থান’—বাংলাদেশের মানুষ আর প্রকৃতির যাবতীয় সত্তাস্পর্শী সেই চিরযাত্রাপথ। ক্ষণিকের প্রস্থান কখনোই বিদায় নয়। ছাপান্ন হাজার বর্গমাইলের ক্যানভাস জুড়ে তিনি আছেন তাঁর অঝোর লেখনীর মাধ্যমে। গোড়ার দিকে নগণ্যসংখ্যক মানুষ ছিলেন তাঁর সমালোচক। তবে সমঝদার ছিলেন বৃহত্তর পাঠকশ্রেণি। তিনি পাঠ-বিপ্লবের প্লাবনে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন তুচ্ছ বিরোধিতা। পরিণত হয়েছিলেন অখণ্ড-বাংলার কথাসাহিত্যের এক ও অনন্য আইকনে। কিংবদন্তি লেখক বলতে সত্যি সত্যিই যদি কাউকে চিহ্নিত করা হয়, তাহলে তিনি অবধারিতভাবে হুমায়ূন আহমেদ। ঈর্ষণীয় পাঠকপ্রিয়তার জাদুকরি ছোঁয়ায় তিনি বাংলা সাহিত্যের মরাগাঙে প্রাণের বন্যা জাগিয়েছিলেন।
হুমায়ূন জন্মেছিলেন হাওর জনপদের উত্তর-পশ্চিম তীরের বৃহত্তর ময়মনসিংহের নেত্রকোনায়। বেড়ে উঠেছিলেন হাওরের পূর্বপার্শ্বস্থ সিলেটের মীরাবাজারে। তারপর বৃহত্তর বরিশালের শ্যামল পিরোজপুরে এবং বাংলাদেশের আরো কিছু চমত্কার স্থানে। পড়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও উত্তর আমেরিকার নর্থ ডেকোটায়। কর্মসূত্রে ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বল্পকালীন শিক্ষকতার পর বহু বছর ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, লেখালেখি ও চলচ্চিত্র নির্মাণে পূর্ণকালীন আত্মনিয়োগের প্রয়োজনে একসময় ছেড়ে দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা। তাঁর জন্য নিরাপদ পেশা ছেড়ে সাহিত্যাঙ্গনে চলে আসার প্রয়োজন ছিল। কেননা, প্রবল প্রত্যাশার কারণে তাঁকে অবিরাম লিখতে হয়েছে। লক্ষ লক্ষ কপি বিক্রি হয়েছে হুমায়ূনের একেকটি বই। তুঙ্গস্পর্শী, বিরল ও অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তার কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন তিনি।
শেষদিকে তিনি ‘কবি’, সম্রাট হুমায়ূনের জীবনালেখ্যের ভিত্তিতে ‘বাদশাহ নামদার’, উনসত্তরের প্রেক্ষাপটে ‘উতাল হাওয়া’ ইত্যাদি ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহে মানবীয় দুঃখ-বেদনা-সংকটের অপূর্ব বিন্যাস নির্মাণ করেছেন। আনিস, শাহানা, বাকের ভাই, নীরা, পরী, বিনু, হিমু, মিসির আলীর মতো শত শত চরিত্র তিনি তৈরি করেছেন, যাদেরকে নিত্য দেখা যায়, কখনো চারপাশের জগতে, কখনো আমাদেরই সমান্তরালে।
বাংলার আধুনিক সাহিত্যধারায় নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণির সংকট ও অবদমন ফেটে বেরিয়েছে তাঁর কলমে। তিনিই দূর-মফস্সলের একটি অদ্ভুত, বিচিত্র মানব বা মানবীর মনোজগতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন ইংলিশ মিডিয়ামে অধ্যয়নরত পাঠক-পাঠিকাকে। আবার গ্লোবালাইজেশন তাড়িত বিশ্বের বিভিন্ন অংশে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের পরম্পরায় আবদ্ধ করেন। তিনি তাঁর নাটকে বাংলার মরমি, আউল, বাউল, বিচ্ছেদের গানগুলোকে নবতর আবহে তুলে ধরেছেন; ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় করেছেন। পূর্ব মৈমনসিংহ, ভাটিবাংলা, হাওরের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, বৃহত্তর সিলেটের লোকজ-সংগীতের অপরূপ জগেক তিনি নতুনভাবে উন্মোচিত করেছেন। তাঁর মতো করে সেসব কথা আর কেউ লিখে যেতে পারেননি।
বাংলা ভাষার একজন লেখক কতটা জননন্দিত হলে তাঁর মৃত্যুর দিনক্ষণে স্তব্ধ হয়ে যায় গোটা পাঠকসমাজ! হুমায়ূন আহমেদ তাঁর সবচেয়ে বড়ো উদাহরণ। উন্মাতাল শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কষ্টের বাতাবরণের মধ্যে তাঁকে বিদায় জানায় আপামর শ্রেণির মানুষ। বাংলাদেশের মানব-হূদয়ে বিষাদের মগ্নমন্দ্রিত সুরে তিনি যাপন করলেন তাঁর অন্তিম যাত্রা! একটি আস্ত জাতিসত্তাকে আন্দোলিত করে চলে গিয়েছেন তিনি। চলে গিয়েছেন মানবসত্তার হূদয়ে একটি কোমলপরশের ব্যথা-জাগানিয়া মরমি সংগীতের মতো করে।
মানব-ইতিহাস একজন থেকে আরেকজনে উত্তীর্ণ হতে হতে গড়ে তোলে নতুন ইতিহাস। এভাবেই সভ্যতার মুকুটে যুক্ত হয় নতুন নতুন সোনার পালক। হুমায়ূন সোনার পালক নয়, কোহিনূর খচিত আস্ত একটি হীরকদীপ্ত মুকুট সমকালীন বাংলা সাহিত্যের শিরে স্থাপন করে গেছেন। তিনি বহুমাত্রিক জ্যোতির নান্দনিক বলয় আর দ্যুতিমান নক্ষত্রের মতো আমাদের হূদয় দখল করে আছেন।
বাংলাদেশের পাঠককে তিনি বাংলাদেশের বইমুখী করতে এক জাদুকরের ভূমিকা পালন করেছেন। বিশ্বায়নের তীব্র প্রতিযোগিতার মুখেও বাংলাদেশের প্রকাশনাশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে তাঁর অনন্য ভূমিকা স্মরণীয় হয়ে থাকবে চিরকাল।
হুমায়ূন আহমেদ আমাদের ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়ে তোলার কামনায় যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি জানাতে লিখেছেন ‘জলিল সাহেবের পিটিশন’ নামের গল্পে। তাঁর ‘ জ্যোত্স্না ও জননীর গল্প’, ‘১৯৭১’, ‘শ্যামল ছায়া’, ‘আগুনের পরশমণি’ প্রভৃতি উপন্যাস হতে পারে নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়ে তোলার একটা ভালো উপায়। আর তাঁর এই গ্রন্থগুলো গুরুত্বের সঙ্গে পাঠ করে এবং অন্যদের তা পাঠে উদ্বুদ্ধ করানোর মাধ্যমে আমরা হুমায়ূন আহমেদের এই প্রয়াণ দিবসে তাঁর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানাতে পারি।
n লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক
