শ্রীমঙ্গল থানায় চা-বাগানের সংখ্যা ৪৭টি। এত বেশি চা-বাগান দেশের আর কোথাও নেই। ব্রিটিশ ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামে চা-শ্রমিকদের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা ছিল। দেশের নিঃস্বার্থ কর্মী হিসেবে ১৯৭১ সালে দেড় শতাধিক চা-বাগানে ছিল মুক্তিসংগ্রামে সহযোগিতা। চা-বাগান এলাকা ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। ১৯৭১ সালের পয়লা মার্চ শ্রীমঙ্গলের চা-শ্রমিকরা বিক্ষোভ মিছিল বের করে। তখন শ্রীমঙ্গল শহরে ন্যাপ ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সারা থানায় বিক্ষোভ-আন্দোলন হচ্ছিল। এসব আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন ন্যাপ নেতা রাসেন্দ্র দত্ত, মো. শাহজাহান মিয়া, ক্ষীরোদ দেব চৌধুরী, অধ্যাপক সাইয়িদ মজিবুর রহমান, সৈয়দ মূয়ীজুর রহমান প্রমুখ।
আওয়ামী লীগ নেতা ডা. মো. আব্দুল আলী, মো. ইলিয়াস এমসিএ, মোহাম্মদ আলতাফুর রহমান এমসিএ, কমলেশ ভট্টাচার্য, বিমল জ্যোতি চৌধুরী ননীসহ নাম জানা-অজানা অনেক নেতার নেতৃত্বে আন্দোলন পরিচালিত হতো।
ন্যাপ ও আওয়ামী লীগের আন্দোলনের সঙ্গে চা-শ্রমিকনেতা হীরালাল হাজরা, রাধাকান্ত তাঁতী, গোপাল গোয়ালা, মনু ব্যানার্জী, বাসন্তী দেবী, নারায়ণ মাস্টার, দামিনী গোয়ালা, পবন তাঁতি, বিমল ব্যানার্জি প্রমুখ নেতা শরিক হন। তখন মিছিল চলতে থাকে।
২৭ মার্চ বালিশিরা ভেলী চা-বাগান এলাকায় গণপরিষদ সদস্য মো. ইলিয়াস, মো. আলতাফুর রহমান চৌধুরী আত্মপ্রচার করে স্বাধীনতাযুদ্ধ পরিচালনার জন্য গোপন সভা করেন।
ঢাকা সিলেট হাইওয়ের ওপর চা-বাগান এলাকায় চা-শ্রমিকরা বড় বড় গাছ ফেলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। মুক্তিবাহিনী খাদ্য ও জ্বালানি হিসেবে পেট্রোল বর্মাছড়া চা-বাগান এলাকার ট্রেনিং ক্যাম্পে নিয়ে জমা করে।
৩০ এপ্রিল রাতে পাকিস্তানি বাহিনী জেট বিমান দ্বারা বৃষ্টির মতো গোলা বর্ষণ ও মেশিনগানের গুলি বর্ষণ করে শ্রীমঙ্গলে প্রবেশ করে। এরপর থেকে চা-বাগান ও গ্রামাঞ্চলে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, নারী ধর্ষণ ও নাটকীয় হত্যাকাণ্ড চালাতে থাকে। প্রাণভয়ে হাজারে হাজারে আবালবৃদ্ধবনিতা সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে আশ্রয় নেয়।
শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে স্টেশন থেকে পূর্ব দিকে কালীমন্দিরের সামনে যাদের পেল, জড়ো করল পাকিস্তানি সেনা। প্রায় ১ ফালং দূরবর্তী শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজের পার্শ্ববর্তী ব্রিজের কাছে নিয়ে যায়। গভীর খাদের পাশে দাঁড় করিয়ে গুলি ছোড়ে। অনেক শ্রমিক মরার ভান করে খাদে পড়ে যায় এবং তার ওপর গুলিবিদ্ধ লাশ পড়তে থাকে। লাশের তলে যারা পড়ে প্রাণে বাঁচেন, তাদের মধ্যে ছিলেন রামদড়ি হাজরা। গুলি খেয়েও পড়ে বেঁচে যান অসংখ্য! শ্রীমঙ্গল শহরের পূর্বাশা আবাসিক এলাকার একটি খালে চা-শ্রমিক বংশোদ্ভূত আট জন যুবকের স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় পাকিস্তানি বাহিনী গুলি করে হত্যা করে।
জেমস ফিনলে কোম্পানির আওতাধীন শ্রীমঙ্গল শহরসহ বিডিআর ক্যাম্প-সংলগ্ন সাধু বাবার বটগাছতলে চা-বাগানের কত লোককে যে হত্যা করেছে, তার সঠিক হিসাব পাওয়া খুবই কঠিন। চা-বাগানের চা-শ্রমিক ছাড়াও শ্রীমঙ্গল ও বৃহত্তর সিলেটের অসংখ্য নারী-পুরুষকে ধরে এনে নির্যাতন করে লাশ ভূরভূরিয়া ছড়ার পাড়ের বধ্যভূমিতে ফেলে দিত। কঙ্কালে-কঙ্কালে ভরপুর ছিল এ বধ্যভূমিটি। স্বাধীনতার প্রায় চার দশক পর ২ হাজার ১০ শহিদের স্মরণে স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয়।
জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহের রবিবার গভীর রাতে মুক্তিবাহিনী ফুলছড়া চা-বাগানের নাচঘরের সামনে ব্রিজটি ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দেয়। ফুলছড়া চা-বাগানের পঞ্চায়েত সভাপতি বীরবল রায়কে পাকিস্তানি সেনারা জিপের পেছনে বেঁধে টেনে-হিঁচড়ে গাড়িতে করে তাকেসহ ছয় জন চা-শ্রমিককে পাকিস্তানি বাহিনীর সদর দপ্তর শ্রীমঙ্গল ওয়াপদা রেস্টহাউজে নিয়ে আসে। চা-শ্রমিক নেতা রাজেন্দ্র ব্যানার্জির পিসতুতো ভাই সিন্দুরখান চা-বাগানের কবিরাজ গোবিন্দ চন্দ্র সোমকে পাকিস্তানি সেনারা ‘ভারতীয় স্পাই’ বলে ভানুগাছ রোডস্থ ডিডিএল-এর অফিসে নিয়ে মুক্তিবাহিনী সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে নির্যাতন করে। পরে তাকে সাধুবাবার গাছতলার নিচে গুলি করে হত্যা করে।
ফুলছড়ার ব্রিজ ভাঙার অজুহাতে সিন্দুরখান ক্যাম্প থেকে পাকিস্তানি বাহিনীর সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট ইয়ামিন বাট ফোর্স নিয়ে বাড়ি থেকে রাজেন্দ্র ব্যানার্জীকে নির্যাতন ক্যাম্পে ধরে নেয়। সেখানে অমানুষিক নির্যাতন করে তার পা ভেঙে দেয়। সারা শরীর জখম করে। নির্যাতনকালে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আসারাম বাড়ি থেকে মুক্তিবাহিনী সিন্দুরখানসহ পাকিস্তানি বাহিনীর অবস্থানে বৃষ্টির মতো গুলি বর্ষণ করতে থাকে। যার কারণে পাকিস্তানি বাহিনী তাকে মারাত্মক আহতাবস্থায় ফেলে রেখে মুক্তিবাহিনীকে মোকাবিলা করার জন্য সীমান্তের দিকে ছুটে যায়। সারা রাত মুক্তিবাহিনী ও পাকিস্তানি বাহিনীর মধ্যে গুলিবর্ষণ হয়। ঐ রাতেই পাকিস্তানি সেনারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও রাজঘাট চা-শ্রমিকনেতা পবন তাঁতীকে শ্রীমঙ্গলে ধরে এনে হত্যা করে।
চা-শ্রমিকনেতা ও কালীঘাট ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান সুরেন্দ্র ব্যানার্জিকেও পাকিস্তানি বাহিনীর মিথ্যে অজুহাতে ভানুগাছ রোডস্থ ডিডিএল-এর কার্যালয়ে ধরে আনে। নির্যাতনকালে তিনি তাদের মেজরকে বলেন, ‘আমি রাজনীতি করি না, শ্রমিকদের দাবিদাওয়া নিয়ে ইউনিয়নের কাজে ব্যস্ত ইত্যাদি। পরে তার বিরুদ্ধে মিথ্যা রিপোর্ট পরিবেশনের জন্য ছালিক আহমদ চৌধুরীকে পাকিস্তানি বাহিনী নানাভাবে শায়েস্তা করে বলে শ্রমিকনেতা সুরেন্দ্র ব্যানার্জি জানান। পরে তাকে পাকিস্তানি বাহিনী ছেড়ে দেয়।
রাজঘাট চা-বাগানের সন্তোষ কর্মকারকে মুক্তিযোদ্ধা বলে ধরে এনে সিন্দুরখান ক্যাম্পের পাশে হত্যা করে। খেজুরিছড়া চা-বাগানের লক্ষ্মী গোয়ালাকে পাকিস্তানি সেনারা সিন্দুরখান ক্যাম্পে নিয়ে সারা রাত ধর্ষণ করে হত্যা করে। শিশিরবাড়ি চা-বাগানের মহালি নামক এক মহিলাকে সিন্দুরখান ক্যাম্পে ধরে এনে পাকিস্তানি বাহিনী পালাক্রমে ধর্ষণ করে। স্বাধীনতার পর বেদনায় তিনি মারা যান।
সিন্দুরখান চা-বাগান শ্রমিক প্রতিনিধি সনাতন ব্যানার্জি, রাজঘাট চা-বাগানের বাসু তাঁতী ও ফুলছড়া চা-বাগানের ফাইমুলাকে সাধুবাবার গাছতলে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এভাবে শ্রীমঙ্গল থানার ৪৭টি চা-বাগানে পাকিস্তানি বাহিনীর লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, নারী ধর্ষণ, হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে। তাদের এই অবদানের কথা গুটিকয়েক স্বার্থপর একপেশে লেখকদের লেখা ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাসে এদের ত্যাগ, তিতিক্ষা, নির্যাতন, নিপীড়ন ও মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের কথা স্বর্ণাক্ষরে লিখিত থাকবে। দীর্ঘ আট মাস তিন দিন পর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অধীনতার জিঞ্জির ছিঁড়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় মুক্তিবাহিনী ৪ নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর সি আর দত্তের নেতৃত্বে ৪ ডিসেম্বর ’৭১ শ্রীমঙ্গল শত্রুমুক্ত হয়।
লেখক :শ্রীমঙ্গলভিত্তিক সাংবাদিক
