জীবনযুদ্ধে হাফিজের এগিয়ে চলা আমজাদ

আপডেট : ০৪ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৭:৫৩

 

জীবন থেমে থাকার নয়। ইচ্ছা ও মানসিক শক্তির জোরে নিজেকে গড়ে তুলতে পারলে সবকিছু করাই সম্ভব হয়। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১-১২ সেশনের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী হাফিজুর রহমান জন্ম থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার। কিন্তু প্রতিবন্ধকতা তাকে দমাতে পারেনি। মুখে কলম দিয়ে লিখে শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপ সফলতার সাথে উত্তীর্ণ হয়েছেন।

বগুড়া জেলার ধুনট উপজেলার বেলকুচি গ্রামে মফিজউদ্দীন ও ফিরোজা বেগমের সন্তান হাফিজ। চার ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট। তার অন্য ভাইয়েরা স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠেছেন। কিন্তু অন্যদের মতো চলাফেরা বা  খেলাধুলা কিছুই করতে পারতেন না তিনি। তার মা অন্যের বাড়িতে কাজ করতেন, আর বাবা কৃষিকাজ করলেও শারীরিক অসুস্থতার কারণে পরিবার চালাতে কষ্ট হতো। বড় তিনভাই বিয়ে করে আলাদা হয়ে যায়। এরমধ্যে হাফিজ বসে থাকেননি। সপ্তম শ্রেণিতে পড়াকালীন টিউশনি করা শুরু করেন। টিউশনি করে মাসে পেতেন মাত্র ৫০০-৭০০ টাকা। গ্রামে প্রাইমারি স্কুল থাকলেও, সেখানে কখনো যাওয়া হয়নি। ২০০১ সালে গ্রামে ব্র্যাকের স্কুল চালু হলে সেখানে ভর্তি হন। সহপাঠীরা তাকে ‘বিয়ারিং গাড়িতে’ করে ঠেলে নিয়ে যেত। ২০০৪ সালে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মাসে ১০০ টাকার অনুদান দেওয়ার আশ্বাস দিলে সেই ভরসায় বাবা ধুনট এনইউ পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ে হাফিজকে ভর্তি করিয়ে দেন। তখন পা দিয়ে লিখতেন। এতে বারবার শরীর নাড়াতে কষ্ট হতো। সপ্তম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষার পর মুখ দিয়ে কলম ধরে লেখার চেষ্টা শুরু করেন। এসএসসিতে ৪.১৯ পেয়ে মানবিক বিভাগ থেকে উত্তীর্ণ হন। ভর্তি হন ধুনট ডিগ্রি কলেজে। ২০১১ সালে রাজশাহী বোর্ডের অধীনে মুখে কলম ধরে লিখেই মানবিক বিভাগ থেকে এইচএসসিতে ৩.৫০ পেয়ে পাস করেন। তারপর নিজে বাড়িতে বসে প্রস্তুতি নিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে ভর্তি হলেন। ঘরে বসে পড়াশোনা করে শুধু পরীক্ষা দেওয়ার আবেদন করেন। বিভাগের চেয়ারম্যান তার আবেদন মঞ্জুর করেন। এভাবে মুখে কলম ধরে লিখেই অনার্স ও মাস্টার্স শেষ করেছেন তিনি। করেছেন ভালো ফলাফল। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের কাছে টি-শার্ট বিক্রি করে অর্থোপার্জন করছেন তিনি। এই টাকায় পরিবারের খরচও জোগাচ্ছেন, চালিয়ে যাচ্ছেন জীবনযুদ্ধ। শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে সবধরনের কাজ করা তার পক্ষে সম্ভব নয়, তবে সুযোগ পেলে ভালো চাকরি করবেন বলে আশা তার।