ফেসঅ্যাপ :গোপন কথাটি রহিবে না গোপনে

আপডেট : ১৯ জুলাই ২০১৯, ২০:৩৪

বৃদ্ধ বয়সে আপনাকে দেখিতে কেমন লাগিবে—এই কৌতূহলের ফাঁদে পড়িয়া স্মার্টফোনে ‘ফেসঅ্যাপ’ সফটওয়্যার ডাউনলোডের ধুম পড়িয়াছে। ২০১৭-এর শুরুর দিকে প্রথম এই ‘ফেসঅ্যাপ’ আত্মপ্রকাশ করে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার করিয়া এই অ্যাপ্লিকেশনটি অবলীলায় যে কাহারো চেহারাকে কমবয়সি বা বুড়া করিয়া দিতে পারে। পুরুষ হইয়া যাইতে পারেন নারী অথবা ইহার উলটোটা। গোমড়া মুখেও হাসি ফুটাইতে পারে এই অ্যাপ। ইহা লইয়া কিছুদিন উন্মাদনা চলিলেও তাহা সাময়িক চাপা পড়িয়া গিয়াছিল। তবে চলতি সপ্তাহে ফের একবার ‘ফেসঅ্যাপ’ ইনস্টল করিয়া সোশ্যাল মিডিয়ায় বুড়া বয়সের ছবি দেওয়ার উন্মাদনার মাত্রা বৃদ্ধি পায়।

মানুষ চিরকালই নিজের ভবিষ্যত্ দেখিতে চাহে। মানুষ যেহেতু ভিতরে ভিতরে নার্সিসাস—সেই কারণে নিজের চেহারা বৃদ্ধ বয়সে কেমন হইতে পারে—সেই কৌতূহল মিটাইবার মতো চমত্কার প্রযুক্তির খেলা বিনামূল্যে হাতের কাছে থাকিলে তাহা নাড়িয়া-চাড়িয়া দেখাটার মধ্যে বিস্ময়ের কিছু নাই। এই অবধি সকল কিছু ঠিকই ছিল বলা যায়। তবে বিপত্তিটা বাধে গত বুধবার। মার্কিন সংবাদপত্র ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ বুধবার জানাইল যে, এখন আমাদের সব পুরাতন ছবি রাশিয়ানদের হাতে। অর্থাত্, রুশ সংস্থা ‘ফেসঅ্যাপে’র মাধ্যমে বিশ্ববাসীর সব ফটো সংগ্রহ করিয়া লইতেছে। এই ক্ষেত্রে বিশ্বের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তুলিয়া ধরা হইয়াছে ‘ফেসঅ্যাপ’-এর টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশনের একটি শর্তের ভাষ্য। সেই শর্তখানিতে বলা হইয়াছিল, ‘আপলোডিং অল ইয়োর ফটোস’। খুঁটাইয়া না পড়িয়াই ব্যবহারকারীরা সাধারণত একটি অ্যাপের শর্তে সম্মতি দিয়া থাকেন। এইক্ষেত্রেও যাহারা শর্তে সম্মতি দিয়াছেন, তাহাদের ফোনের সকল ছবি চলিয়া যাইতেছে ‘ফেসঅ্যাপ’ সংস্থার হাতে। সুতরাং বিষয়টি অনেকের জন্যই মাথাব্যথার কারণ হইবে। কারণ, প্রায় সকলেরই ‘ব্যক্তিগত’ বলিয়া একটি ব্যাপার আছে। ‘ফেসঅ্যাপ’ কর্তৃপক্ষ অবশ্য বলিয়াছে যে, আপলোড হইবার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ‘অধিকাংশ’ ছবি তাহাদের সার্ভার হইতে ডিলিট হইয়া যায়। এইখানে ‘অধিকাংশ’ বলিয়া একটি শব্দ আছে—যাহার মাধ্যমে তাহারা আসলে শুভংকরের ফাঁকি দিতেছে বলিয়া মনে করেন অনেকে। আরো মজার ব্যাপার হইল, ‘ফেসঅ্যাপ’ সংস্থাটির বিবৃতির সারাংশ হইল—তাহাদের অ্যাপ্লিকেশনখানি ফেসবুক ব্যবহারকারীদের ছবি লইয়া যাহা খুশি করিতেই পারে, কিন্তু তাহারা যেহেতু ‘খুব ভালো’ সংস্থা, তাই তাহারা ইহা করিবে না। কিন্তু আমরা এইক্ষেত্রে কবি হরিশচন্দ্র মিত্রের সুরে বলিতে পারি—‘আপনারে বড় বলে, বড় সেই নয় লোকে যারে বড় বলে বড় সেই হয়’। সুতরাং ‘ফেসঅ্যাপ’ কর্তৃপক্ষ যে ‘ভালো’—সেই সার্টিফিকেট তাহারা নিজেরা দিলেই বিশ্বাসযোগ্য হইবে কেন?

আরো মনে রাখিতে হইবে, ফেসবুকের নিজস্ব ‘টার্মস অব সার্ভিসে’ বলাই আছে যে, ‘আপনি যদি ফেসবুকে কোনো ছবি শেয়ার করেন, তাহার অর্থ সেই ছবি স্টোর, কপি ও শেয়ার করিবার অনুমতি দিতেছেন।’ অর্থাত্, ফেসবুকের হাতেও ইতিমধ্যে আপনার বহু ছবি চলিয়া গিয়াছে। একইভাবে ‘পার্সোনালিটি টেস্টে’র মতো অ্যাপও বহু ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহারকারীর অজান্তে কুক্ষিগত করিয়া থাকে। সেইক্ষেত্রে ‘ফেসঅ্যাপ’-এর ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার ভঙ্গ করিবার বিষয়টি নূতন নহে। আসলে আমরা এমন এক সময়ের স্রোতের ভিতরে পড়িয়াছি—যেইখানে গোপন কথাটি রহিবে না গোপনে।