ট্রাম্পের নতুন শুল্কনীতি

বিশ্বব্যাপী যে ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যেতে পারে

আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০২৫, ১২:২৫

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন শুল্কনীতি ঘোষণার পর স্বাভাবিকভাবেই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে অর্থনৈতিক অঙ্গন। বিশ্লেষকরা বলছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এহেন অস্থিরতা আগে দেখা যায়নি। ট্রাম্পের এই শুল্কনীতি এবং তার জবাবে দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া সার্বিকভাবে বিশ্ব অর্থনীতিকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে, বিশ্বব্যাপী কী ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে, সে সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের থিংকট্যাংক ‘আটলান্টিক কাউন্সিল’ কর্তৃক প্রকাশিত কয়েক জন বিশেষজ্ঞের মতামত পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো। অনুবাদ করেছেন সুমৃত্ খান

 

আগের জামানার অসমাপ্ত কাজ শেষ করছেন ট্রাম্প

জোশ লিপস্কি

ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের সময় থেকেই, বিশেষ করে ২০১৮ সালের বাণিজ্যযুদ্ধের (ট্রেড ওয়ার) পর, ওয়াশিংটনসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে একটি জল্পনা ছড়িয়ে পড়ে। ঐ সময় দাবি ওঠে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিশ্বকে কেবল মিত্র ও শত্রু—এ দুই ক্যাটাগরিতে বিভক্ত না করে বরং দেশ বা পক্ষগুলোকে যদি এভাবে দেখেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেসব দেশের ‘বাণিজ্য ঘাটতি’ আছে, তাদের রাখা হবে এক সারিতে এবং যাদের ‘বাণিজ্য উদ্বৃত্ত’ আছে, তারা থাকবে আরেক পাশে; তাহলে কেমন হবে?

লক্ষণীয়, দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে ট্রাম্প যেন তার আগের জামানাতেই ফিরে গেলেন! গত বুধবার রোজ গার্ডেনে তিনি যখন দেশগুলোর ওপর আরোপিত শুল্কহার-সংবলিত একটি ‘সারণি’ তুলে ধরেন, তখন ’১৮ সালের ‘সেই জল্পনা’ই যেন বাস্তবায়িত হতে দেখল বিশ্ববাসী। সারণি দেখে যে কেউই বলবেন, এটা যেন বাণিজ্য ঘাটতি ও বাণিজ্য উদ্বৃত্তের হিসাবের নিরিখে এক বিশেষ পদ্ধতিতে তৈরি করা হয়েছে।

অনেকে প্রশ্ন তুলতে পারেন, এই কথার ভিত্তি কী? তাদের জন্য সহজ উত্তর হলো, লক্ষ করুন—কেন জাপানের ওপর ২৪ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হলো, যেখানে ইরানের ওপর মাত্র ১০ শতাংশ? মিত্র টোকিওর ওপর শুল্কের বোঝা ঠিকই চেপে বসেছে, কিন্তু যার সঙ্গে দা-কুমড়া সম্পর্ক, সেই তেহরানের ওপর বলা যায়, ট্রাম্পের কড়া শুল্কের কোনো আঁচই লাগেনি।

ট্রাম্প কেন এমন কর্মপন্থা গ্রহণ করে বসলেন, এ প্রশ্নের জবাবে অনেকে টানতে চাইবেন দেশগুলোর সরকারব্যবস্থা, সামরিক জোট বা ঐতিহাসিক সম্পর্কের প্রসঙ্গ। যদিও এটা ট্রাম্প প্রশাসনের নিজ হাতে গড়া ‘এক নতুন সমীকরণ’, যেখানে বিশ্বকে ট্রাম্প দেখতে চাইছেন কেবল ‘অর্থের চোখ’ দিয়ে, যার প্রধান ভিত্তিই হলো ‘বাণিজ্য’। ফলে দ্বিতীয় জামানায় এটাই যে তার বৈদেশিক সম্পর্কের মূল চালিকাশক্তি হতে যাচ্ছে, তা একপ্রকার নিশ্চিত।

নজিরবিহীন শুল্ক আরোপের ঘোষণার পর ইতিমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থ ও বাণিজ্যমন্ত্রীরা হোয়াইট হাউজের কাছে পালটা যুক্তি দাঁড় করাতে চেষ্টা করছেন। এতে ব্যর্থ হলে পালটা ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনাও করছেন অনেকে। চীন এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর সমপরিমাণ পালটা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে।

জানা গেছে, আগামী সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যে দেশগুলো আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের বসন্তকালীন বৈঠকে ওয়াশিংটনে জড়ো হবেন। সেখানে স্বভাবতই নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরবেন তারা। কেউ কেউ হয়তো শুল্ক ছাড়ের আহ্বান জানিয়ে সাড়াও পাবেন। ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্টের কথায়ও সেই ইঙ্গিতই পাওয়া যায়। দেশগুলোর প্রতি তিনি আলোচনার আহ্বান জানিয়েছেন।

আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের ওয়াশিংটন বৈঠকে সব দেশের প্রত্যাশা পূরণ হবে না, এ কথা যেমন সত্য, তেমনি কেউ কেউ গ্রহণযোগ্য যুক্তি তুলে ধরে, তথা দরকষাকষি করে শুল্ক ছাড় পেয়ে যাবেন। তবে যে যা-ই বলুক না কেন, ট্রাম্পের এই ‘নতুন শুল্ক কাঠামো’ আমেরিকার ইতিহাসে ‘বিগত ১০০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ’ হিসেবে রেকর্ড হয়ে থাকবে।

লেখক :আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাবেক উপদেষ্টা

 

অর্থনীতি, রাজনীতি ও আদর্শগত ব্যবধান বাড়বে

ইয়োর্ন ফ্লেক ও জাকোপো পাস্তোরেলি

ট্রাম্পের এই তথাকথিত ‘মুক্তির দিন’ শুল্কনীতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য স্বাভাবিকভাবেই বিশাল ধাক্কা। এই ধাক্কাকে দুইভাবে দেখা যেতে পারে—অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক।

অর্থনৈতিক দিক থেকে দেখলে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ওপর যে ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, তা প্রায় দুই ট্রিলিয়ন ডলারের মার্কিন-ইইউ পণ্য ও সেবাবাণিজ্যের ওপর প্রভাব ফেলবে। এর অভিঘাতে আগামী বছর দুয়েকের মধ্যে ইউরোজোনের মোট দেশজ উত্পাদন (জিডিপি) আনুমানিক ০.৩ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে।

রাজনৈতিক দিক থেকে দেখলে, ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক আরোপ ইউরোপের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বাস ও নির্ভরতার ওপর চপেটাঘাতের শামিল। ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড-সংক্রান্ত খায়েশ, ইউরোপীয় ডিজিটাল নীতিমালার বিরুদ্ধে অবস্থান এবং ইউক্রেনকে সাময়িকভাবে সামরিক সহায়তা স্থগিত করার মতো বিষয়গুলোও এই বাস্তবতার বাইরে নয়।

অর্থনীতির ও রাজনীতির চেয়েও বড় বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্র ১৯৩৩ সালের পর সর্বোচ্চ শুল্ক আরোপ করতে যাচ্ছে, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের দীর্ঘদিন ধরে গড়া বহুপাক্ষিক নিয়মভিত্তিক বাণিজ্য ব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত বা ধ্বংস করতে পারে।

ইউরোপীয় নীতিনির্ধারকদের মনে ‘সিগনালগেট’ কেলেঙ্কারি (চ্যাট ফাঁসের ঘটনা) এখনো দগদগে ঘা হয়ে আছে। ট্রাম্প ঘনিষ্ঠদের ইউরোপবিরোধী মনোভাব প্রকাশ পেয়েছিল ঐ স্ক্যান্ডালে। ফলে ট্রাম্প-ঘোষিত নতুন শুল্কনীতি শুধু বাণিজ্য নয়, বরং ইউরোপ-আমেরিকা সম্পর্কে আদর্শগতভাবে প্রভাব ফেলবে। বিশেষত, ইউরোপের জন্য এ এক নতুন চ্যালেঞ্জ। যদিও গোটা ইউরোপ এককাট্টা হয়ে পালটা বা বিকল্প পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

লেখকদ্বয় :যথাক্রমে অ্যাটলান্টিক কাউন্সিলের  ইউরোপ সেন্টারের সিনিয়র ডিরেক্টর এবং প্রোগ্রাম সহকারী

 

বেইজিংয়ের পালটা পদক্ষেপ হবে ‘বাণিজ্যযুদ্ধের নতুন পর্ব’

মেলানি হাট

ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন এবং বিপুল হারে আরোপিত শুল্কের পরিপ্রক্ষিতে এরই মধ্যে প্রথম পালটা জবাব দিয়েছে বেইজিং। তারাও ওয়াশিংটনের ওপর পালটা ৩৪ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। শুধু তা-ই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আইএমএফে এরই মধ্যে মামলা ঠুকে দিয়েছে বেইজিং।

এতটুকুতেই থেমে থাকেনি চীন। তারা যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর কাছে ১৬টি দুর্লভ খনিজ উপাদান রপ্তানি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। পাশাপাশি ১১টি মার্কিন কোম্পানিকে ‘অবিশ্বস্ত সত্তা’ তালিকাভুক্ত (আনরিলায়েবল এনটিটি লিস্ট) করেছে, যার অর্থ এই যে, কোম্পানিগুলো চীনের সঙ্গে ব্যবসা করতে পারবে না বা বাধার মুখে পড়বে।

অনেক মার্কিন বিশ্লেষক অবশ্য মনে করেন, চীনের অর্থনীতিতে দুর্বলতা থাকায় এই শুল্ক-বোঝা থেকে মুক্তি পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছে বেইজিং। চীন হয়তো ধরেই নিয়েছে যে, চীনের সাধারণ মানুষ—বিশেষ করে, যারা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে আছে এবং বেকার তরুণেরা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে ট্রাম্পের দাবি মেনে নিতে বাধ্য করবে। যদিও বাস্তবতা ভিন্ন।

চীন যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অর্থনৈতিকভাবে ভালো অবস্থানে রয়েছে বটে। কিন্তু চীন আর যুক্তরাষ্ট্রের মাঠের পরিবেশ এক নয়। চীন-আমেরিকা পালটাপালটি ‘শুল্ক-শুল্ক খেলা’র সূত্র ধরে মার্কিন ভোক্তারা যেখানে বিক্ষোভ করতে রাস্তায় নামতে পারবেন, সেখানে চীনে কেউ প্রতিবাদ করলে তাদের ঠাঁই হবে মিস্টার শি জিনপিংয়ের কয়েদখানায়; অর্থাত্, এই শুল্কনীতির পটভূমিতে কোনোভাবে ট্রেড ওয়ার শুরু হলে অভ্যন্তরীণভাবে ট্রাম্পের চেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবেন শি।

লেখক :আটলান্টিক কাউন্সিলের গ্লোবাল চায়না হাবের সিনিয়র ডিরেক্টর

 

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাণিজ্যিক বৈষম্যের ফলে ‘আস্থাহানি’ ঘটবে

পার্কার নোভাক

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো বহুদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদার করার চেষ্টা চালিয়ে আসছে। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে প্রত্যাশিত আগ্রহ দেখা যায়নি। এমন একটি অবস্থায় নতুন শুল্কনীতির ঘোষণা সেই দূরত্বকে আরো বাড়িয়ে দেবে নিঃসন্দেহে।

এই অঞ্চলে বাণিজ্য শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং নিরাপত্তার সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত। এ অঞ্চলের সরকারগুলো স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং যুবসমাজের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে চায়, যার জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। ফলে ট্রাম্পের নবঘোষিত শুল্কনীতির প্রভাবে অনেক দেশ অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে, যাতে করে অভ্যন্তরীণ বা আঞ্চলিক নিরাপত্তা হতে পারে বিঘ্নিত।

এই শুল্কের চূড়ান্ত প্রভাব আগামী সপ্তাহে প্রকাশ্য হতে শুরু করবে এবং পরবর্তী সময়গুলোতে তা ক্রমশ স্পষ্ট হবে। এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায়, এর ফলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মার্কিন-চীন ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার গতিপথ প্রভাবিত হবে। এমনকি এতদঞ্চল বিশ্বের দুই মহা প্রতাপশালী শক্তির মধ্যে প্রভাব বিস্তার কিংবা মুখোমুখি সংঘর্ষের অন্যতম মঞ্চ হয়ে উঠলেও অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না।

লেখক :আটলান্টিক কাউন্সিলের ইন্দো-প্যাসিফিক সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভের ননরেসিডেন্ট ফেলো

 

ইত্তেফাক/টিএইচ