তুরস্কের সঙ্গে পাশ্চাত্যের সম্পর্ক ভেঙে যাচ্ছে?

আপডেট : ১৯ জুলাই ২০১৯, ২১:১১

 

মুসলিম প্রধান তুরস্কের সাথে পাশ্চাত্যের দীর্ঘদিনের সামরিক এবং রাজনৈতিক মৈত্রী যে মাত্রায় হুমকিতে পড়েছে তা প্রায় নজিরবিহীন।

যুক্তরাষ্ট্র এবং নেটো সামরিক জোটের বহু অনুরোধ উপরোধ এবং সবশেষে হুমকির তোয়াক্কা না করে তুরস্ক গত সপ্তাহ থেকে রাশিয়ার কাছে থেকে অত্যাধুনিক এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্রের চালান নিতে শুরু করেছে। তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায়, যুক্তরাষ্ট্র জানিয়ে দিয়েছে তুরস্ককে একশর মতো অত্যাধুনিক এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির চুক্তি তারা স্থগিত করছে। একইসাথে, তারা তুরস্কের ওপর নিষেধাজ্ঞা চাপানোর পরিকল্পনা শুরু করেছে, যদিও সেই নিষেধাজ্ঞার মাত্রা কী হবে তা এখনও খোলাসা করা হয়নি।

তুরস্কের পাশ্চাত্য সামরিক মিত্ররা মানতে পারছে না যে ন্যাটোর সদস্য হয়েও তুরস্ক রাশিয়ার কাছে থেকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এমন ক্ষেপণাস্ত্র কিনছে। তুরস্কের বক্তব্য যে তারা বাধ্য হয়েছে। বেশ কয়েক বছর আগেই তুরস্ক আমেরিকার কাছ থেকে তাদের প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র কিনতে চেয়েছিল। ওবামা প্রশাসন বেশ কিছুদিন ঝুলিয়ে রেখে তুরস্ককে জানিয়ে দেয় প্যাটিয়ট তাদের দেয়া হবেনা। প্রত্যাখ্যাত হয়ে ২০১৭ সালে তুরস্ক নেটোর সদস্য হওয়া স্বত্বেও জোটের প্রধান বৈরি শক্তি রাশিয়ার দ্বারস্থ হয়। প্রস্তাব সাথে সাথেই লুফে নেয় রাশিয়া, যদিও এখন পর্যন্ত চীন ছাড়া অন্য কোনো দেশে এখনও তারা এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রি করেনি। তখন থেকেই আমেরিকা এবং নেটো জোটের পক্ষ থেকে তুরস্ককে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র কেনা থেকে বিরত রাখার বহু চেষ্টা হলেও প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানকে টলানো যায়নি।

তুরস্ক এবং তার পশ্চিমা মিত্রদের সম্পর্কে অবিশ্বাস এতদূর গড়ালো কীভাবে? কুয়ালালামপুরে মালয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং সমর-বিদ্যা বিশেষজ্ঞ ড. সৈয়দ মাহমুদ আলী বিবিসিকে বলেন, এই দূরত্ব একদিনে তৈরি হয়নি। অনেক বছর ধরে ধীরে ধীরে এটি বেড়েছে। তুরস্ক এই সম্পর্ককে আর আগের মতে গুরুত্ব দিচ্ছেনা। বিবিসির প্রতিরক্ষা বিষয়ক ভাষ্যকার জনাথন মার্কাস বলছেন, নেটোর দাবি- হুমকি-অনুরোধ উপেক্ষা করে রাশিয়ার কাছ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ক্রয় তুরস্কের ‘সামরিক-রাজনৈতিক কৌশলে’ মৌলিক একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত। তিনি মনে করেন এর পেছনে তুরস্কের যে তাড়না তার মূলে রয়েছে কুর্দিদের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থান। “এক কথায় সেটিই মূল কারণ।”

ইরাক এবং সিরিয়ায় আমেরিকার ভূমিকা গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করেছে তুরস্ক। কীভাবে কুদির্রা শক্তিশালী হচ্ছে তা দেখছে। জনাথন মার্কাস বলছেন, “এটিই এখন তুরস্কের এক নম্বর নিরাপত্তা উদ্বেগ।” প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের সাথে প্রেসিডেন্ট পুতিনের ঘনিষ্ঠতা বাড়ছে।

পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রশ্ন উঠছে তুরস্ক কি পাশ্চাত্যের সামরিক বলয় থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে? ড. সৈয়দ মাহমুদ আলী বলছেন, “তুরস্ক বেরিয়ে যেতে চায়না, কিন্তু গত ৬/৭ বছরে তাদের যে অভিজ্ঞতা হয়েছে তাতে তুরস্কের ভেতর সংশয় দেখা দিয়েছে যে পাশ্চাত্য তাদের সত্যিকারের মিত্র হিসাবে দেখেনা এবং কোনো দিন হয়তো দেখবেও না।” এ মাসের গোঁড়ায় তুরস্কের কাদির হাস ইউনিভার্সিটি ব্যাপক একটি জনমত জরিপ করেছে। জরিপে প্রশ্ন করা হয় - আমেরিকা এবং নেটোর তীব্র আপত্তি এবং নিষেধাজ্ঞার হুমকি উপেক্ষা করে রাশিয়ার কাছ থেকে এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র কেনা কি উচিত্ হচ্ছে? ৪৪% উত্তরদাতা বলেছেন, কেনা উচিত্। অন্যদিকে ২৫ শতাংশের মত বলেছেন উচিত্ নয়। আমেরিকা এবং রাশিয়ার সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও তুরস্কের সাধারণ মানুষের মনোভাবও যে বদলে যাচ্ছে সেটাও বেরিয়ে এসেছে এই জরিপে। প্রায় ৮১% উত্তরদাতা বলেছেন আমেরিকা তুরস্কের জন্য হুমকি। অন্যদিকে ৫৫% উত্তরদাতা রাশিয়ার সাথে সম্পর্ককে ইতিবাচক বিষয় বলে মতামত দিয়েছেন।

ন্যাটোতে তুরস্কের অবস্থান কি আল্গা হয়ে পড়বে? নাকি আমেরিকা তুরস্কের গুরুত্ব বুঝে আপোষ করবে? ড. সৈয়দ মাহমুদ আলী মনে করেন, যদি আমেরিকা নমনীয় না হয় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তুরস্কের অর্থনীতির বর্তমান সঙ্কট আরো বাড়বে। তবে তিনি বলেন, ন্যাটোর জন্য তুরস্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। তুরস্ক নিষ্ক্রিয় হলে ইউরোপের পূর্ব সীমান্তে ন্যাটোর প্রতিরক্ষা বলয় হুমকিতে পড়বে। তার মতে, এ কথা এখনই বলা যাবেনা যে তুরস্ক পাশ্চাত্য বলয় থেকে নিশ্চিতভাবে সরে যাচ্ছে। যদিও এটা ঠিক যে তুরস্ক পাশ্চাত্যের কাছ থেকে অনেক কিছু প্রত্যাশা করেছিল, কিন্তু তাদের সেই প্রত্যাশা মিটছে না। সে কারণেই রাশিয়ার দিকে ধীরে ধীরে তারা মুখ ঘুরিয়েছে। সূত্র - বিবিসি