ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার বেগুনবাড়ি ইউনিয়নের নতুনপাড়ায় বোরো জমির ওপর গজিয়ে ওঠা এক ‘গায়েবি’ মাদ্রাসার খোঁজে তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। রোববার (২০ এপ্রিল) সকাল সাড়ে ১১টার দিকে ঠাকুরগাঁও দুদকের সমন্বিত কার্যালয়ের কর্মকর্তারা সেখানে অভিযান পরিচালনা করেন।
এদিকে, দুদকের অভিযানের খবর পেয়ে প্রায় আড়াই কিলোমিটার দূর থেকে চকলেট খাওয়ানোর লোভ দেখিয়ে শিক্ষার্থীদের নিয়ে আসেন ওই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা।
অভিযান শেষে দুর্নীতি দমন কমিশন সমন্বিত ঠাকুরগাঁও জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক ও উপপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. আজমির শরিফ মারজী জানান, ‘বাস্তবে অস্তিত্বহীন একটি মাদ্রাসা কীভাবে ইবতেদায়ী নিবন্ধিত তালিকায় এলো, এমনকি এমপিওভুক্ত করারও চেষ্টা চালানো হচ্ছে—এমন অভিযোগের ভিত্তিতে দুদক এনফোর্সমেন্ট টিম আজ এই অভিযান পরিচালনা করে। দুদক আসার খবর পেয়ে প্রায় আড়াই কিলোমিটার দূর থেকে একটি কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষার্থীদের চকলেটের লোভ দেখিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে। বাস্তবে এই প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষাকার্যক্রম চালু নেই।
শিক্ষার্থীরাও জানিয়েছে, তাদের এখানে নিয়ে আসা হয়েছে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, দুদক আসার ৩০ মিনিট আগে শিক্ষা অফিসকে জানানো হয়। ধারণা করছি, তারা খবরটি জানিয়ে দিয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানটির বিষয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আগামীকাল দুদক কার্যালয়ে সরবরাহ করতে বলা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ১৯৮১ সালে কয়েকজন উদ্যোগী ব্যক্তির মাধ্যমে ‘নতুনপাড়া স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসা’ প্রতিষ্ঠিত হলেও ১৯৯৯ সালে এটি দাখিল পর্যন্ত একাডেমিক স্বীকৃতি লাভ করে এবং ২০০২ সালে ইবতেদায়ী ও দাখিল শাখা একত্রিত হয়ে এমপিওভুক্ত হয়। সেই সময় ইবতেদায়ী শিক্ষক আবুল বাশার, নুরনবী ও বেলী আক্তার পরবর্তীতে দাখিল শাখায় শিক্ষকতা করেন। তবে দাখিলের সঙ্গে একীভূত হওয়ার পরেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকির অভাবে প্রতিষ্ঠানটি কাগজে-কলমে নতুন পাড়া স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসা নামেই থেকে যায়।
নতুন পাড়া ইবতেদায়ী শাখার প্রধান শিক্ষক রেজাউল করিম দুদক কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ করে বলেন, প্রায় ৫০০ মিটার দূরে নতুন এই প্রতিষ্ঠানটি নতুনপাড়া স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসার নাম ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে। অথচ এই প্রতিষ্ঠানে এখনো তাঁরা কর্মরত আছেন।
সহকারী শিক্ষক নুর ইসলাম বলেন, ‘সম্পূর্ণ জালিয়াতি করে একটি চক্র এই গায়েবি প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, যা একেবারেই বেআইনি।’ একই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষিকা কৃষ্ণ রানী বইস্য বলেন, ‘আমাদের ইবতেদায়ী শাখাতেই শিক্ষার্থী সংকট। তারপরেও মাত্র ৫০০ মিটার দূরে কী করে একই নাম ব্যবহার করে আরেকটি প্রতিষ্ঠান তারা গড়ে তোলে?’
এদিকে, ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসকের নির্দেশে গত ৬ এপ্রিল জেলা শিক্ষা অফিসার শাহীন আকতার সরেজমিনে মাদ্রাসাটি তদন্ত করেন। পরদিন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে দাখিল করা তদন্ত প্রতিবেদনে তিনি স্পষ্ট উল্লেখ করেন, ‘নতুনপাড়া স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসা’ নামে কোনো বাস্তব কাঠামোর অস্তিত্ব নেই এবং সেখানে কোনো শিক্ষা কার্যক্রমও পরিচালিত হয় না।
প্রতিষ্ঠানপ্রধান হিসেবে দাবি করা শাহিনুর আলম প্রতিষ্ঠাকালীন কোনো কাগজপত্র, শিক্ষক নিয়োগের রেজুলেশন বা মাদ্রাসার কার্যক্রম সংক্রান্ত কোনো প্রমাণপত্র দেখাতে পারেননি। তদন্তকালে বর্তমান মাদ্রাসার জায়গায় কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এই ঘটনার প্রতিবাদে স্থানীয়রা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন করেছেন এবং একটি স্মারকলিপি জমা দিয়েছেন। তাঁরা অবিলম্বে এই মাদ্রাসার জাতীয়করণ বা এমপিওভুক্তির প্রক্রিয়া বন্ধের দাবি জানান।
এবিষয়ে নতুনপাড়া স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসার প্রধান মো: শাহানুর আলম জানান, আমাদের এই প্রতিষ্ঠানটি ১৯৮১ সালে স্থাপিত হয়। এর আগে যারা এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকতা করেছেন তারা নিয়মিত বেতন ভাতা পেতেন। তারা অন্যত্রে চলে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে আমরা এলাকার কয়েকজন মিলে পুনরায় প্রতিষ্ঠানটি চালু করি।
তিনি আরো বলেন, এলাকার কিছু কতিপয় ব্যক্তি আমাদের বিরুদ্ধে লেগে মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত ছড়াচ্ছে। যা সত্য নয়। আজ হঠাৎ করে দুদক অভিযান পরিচালনা করে। তারা যে সমস্ত অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়েছে তা আমরা ওনাদের সামনে তুলে ধরবো।
