সাড়ে চার বছরে নিহত ৬১
হুমায়ূন রশিদ চৌধূরী, সিলেট অফিস
সিলেটের হাওরাঞ্চলে বজ্রপাতে মৃত্যুর ঘটনা বেড়েই চলছে। বৃষ্টি মানেই যেন খোলা আকাশের নিচে থাকা লোকজনের ওপর বজ্রাঘাত! ঘন ঘন এমন বজ পাত ও মৃত্যুর ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। মেঘলা পরিবেশে কাজে কিংবা অন্য প্রয়োজনে বের হতে ভয় পাচ্ছে তারা। বজ্রপাত কমাতে সরকারি উদ্যোগে হাওর এলাকায় তালগাছ লাাগনোর মতো দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনার সাথে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি উঠেছে।
এদিকে, শুক্রবার কোম্পানীগঞ্জে ও সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জের হাওরে বজ্রপাতে তিন জন নিহত হয়েছে। এহসানুল ইসলাম নামে ১৩ বছরের স্কুলছাত্র উপজেলার পাড়ুয়া লামাপাড়া গ্রামে নিহত হয়। সে শামসুল হকের ছেলে ও পাড়ুয়া আনোয়ারা উচ্চবিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। বাবার সঙ্গে ধানখেতে জমির পানি ছেড়ে দেওয়ার কাজ করছিল এহসানুল। ঐ সময় হঠাত্ বজ পাত হলে ছেলে নিহত ও বাবা আহত হন।
অন্যদিকে, গত বৃহস্পতিবার সকালে সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জের হাওরে মাছ ধরতে গিয়ে বজ পাতে বানু হোসেন (৪০) ও তার ছেলে সুমন মিয়ার (১১) মৃত্যু হয়। নিহতরা উপজেলার ফেনারবাক ইউনিয়নের শান্তিপুর গ্রামের বাসিন্দা।
স্থানীয়রা বলছে, আগে সাধারণত বৈশাখে বজ্রপাত হতো। বর্তমানে বৃষ্টি হলেই বজ্রপাত হচ্ছে। এতে প্রাণহানির সঙ্গে ক্ষতিও বেড়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত বছর সিলেট আবহাওয়া অফিসে স্থাপন করা হয় বজ্রপাত পূর্বাভাস যন্ত্র ‘থান্ডারস্টর্ম ডিটেকটিভ সেন্সর’। এই যন্ত্রের মাধ্যমে প্রতিদিনই বজ্রপাতের পূর্বাভাস আসে। কিন্তু এই পূর্বাভাস মাঠপর্যায়ে প্রান্তিক মানুষের কাছে সে ভাবে পৌঁছে না। তাই মৃত্যুর ঘটনা বাড়ছে।
সরকারি হিসাবে ২০১৬ সাল থেকে ২০১৯ এর এপ্রিল পর্যন্ত সিলেট ও সুনামগঞ্জে ৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এপ্রিল থেকে জুলাইয়ের ১৯ তারিখ পর্যন্ত আরো ১০ জনের মৃত্যু হয়। বিশেষ করে সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে গত কয়েক বছর থেকে বজ্রপাত ও প্রাণহানির সংখ্যাও বেড়ে গেছে। গত বছর নাসার রিপোর্টে জানা যায়, বিশ্বে সব চেয়ে বেশি বজ্রপাতপ্রবণ এলাকা সিলেটের সুনামগঞ্জ। পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা বলেন, এ জন্য হাওরে আশ্রয় কেন্দ্র ুনির্মাণ, বজ্রপাত নিরোধক দণ্ডও স্থাপন করা দরকার।
ঝুঁকি বাড়ছে:বজ্রপাত আশঙ্কাজনক হারে বাড়লেও এ ব্যাপারে কৃষকদের অগ্রিম সতর্ক করতে তত্পরতা কম। সিলেট আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ সাঈদ আহমদ চৌধুরী বলেন, ২০১৬ সালের পর থেকে বজ্রপাতকে দুর্যোগ হিসেবে চিহ্নিত করেছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়। তিনি বলেন, সিলেট বজ্রপাতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। ‘বৈশাখে হাওরের একমাত্র ফসল বোরো ধান তুলতে কৃষকদের মাঠে যেতেই হয়। কিন্তু এ সময় প্রাণহানির আশঙ্কা বেশি। তিনি বলেন, ‘১২ ঘণ্টা আগে আমরা বজ্রপাতের পূর্ভাবাস পেয়ে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে পাঠাই সেটি। আর সেই বার্তাটি হাওরাঞ্চলে পৌঁছালে অন্তত ঐ সময় হাওরে যাওয়া থেকে বিরত থাকতে পারেন হাওরবাসী।
সিলেট বিভাগের সবচেয়ে বেশি ১০৫টি হাওর আছে সিলেট জেলায়। আর সুনামগঞ্জ জেলায় হাওর আছে ৯৫টি। আয়তনের দিক দিয়ে হাওর এলাকা বেশি সুনামগঞ্জে। বজ্রপাতে বেশি প্রাণহানিও ঘটে এই জেলায়। সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বজ্রপাতে ক্ষতি কমাতে হাওর এলাকায় তালবীজ রোপণ ও বিতরণ করা হয়। কিন্তু বেশিরভাগ তালবীজ থেকেই চারা গজায়নি। সুনামগঞ্জ জেলাতেই ২০১৮ সালে ৩৪ হাজার ও চলতি বছরে ৮০ হাজার তালবীজ বিতরণ করা হয়।
