সৌদিতে মার্কিন সেনা যুদ্ধের ইঙ্গিত? তালেব রানা

আপডেট : ২১ জুলাই ২০১৯, ২০:৩৪

ইরানের সঙ্গে করা বহুজাতিক পারমাণবিক চুক্তি থেকে গতবছর যুক্তরাষ্ট্র বেরিয়ে আসার পর দেশ দুটির মধ্যে উত্তেজনার সূত্রপাত হয়। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের একের পর এক নতুন নিষেধাজ্ঞা এই উত্তেজনাকে আরো বাড়িয়েছে। সাম্প্রতিককালে হরমুজ প্রণালির কাছে ছয়টি তেল ট্যাংকারে হামলার ঘটনা ঘটে। যুক্তরাষ্ট্র এসব হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করেছে। যদিও ইরান এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এরই এক পর্যায়ে একটি মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করে ইরান। এ ঘটনায় ইরানের তিনটি সামরিক স্থাপনায় হামলার অনুমোদন দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন ট্রাম্প। বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে বড়ো ধরনের সামরিক সংঘাত এড়িয়েছে দুই দেশ। কারণ ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ বাধলে তা দ্রুত মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়তো! তবে পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক হয়নি। দিনকে দিন এই উত্তেজনা ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। এখনো মধ্যপ্রাচ্য ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধজাহাজ, যুদ্ধবিমান মোতায়েন করে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। একইসঙ্গে মার্কিন সেনাদের সংখ্যাও বাড়ানো হচ্ছে।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার মধ্যেই ‘এন্ট্রি’ হয়েছে আরেক পশ্চিমা ‘প্লেয়ারের’। চলতি মাসের শুরুর দিকে জিব্রাল্টারের কাছে ইরানের তেল ট্যাংকার গ্রেস ওয়ান আটকে দিয়েছে ব্রিটিশ রয়্যাল মেরিন সেনারা। এ ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত মিত্র ব্রিটেনকে সতর্ক করে প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকি দিয়েছিলো ইরান। এরপরই ইরানের কয়েকটি নৌযান একটি ব্রিটিশ তেল ট্যাংকারকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে বলে অভিযোগ করে ব্রিটেন। শেষ পর্যন্ত ব্রিটেন জানায়, ইরানের তেল ট্যাংকার তারা ছেড়ে দিতে রাজি। তবে এক্ষেত্রে ইরানকে নিশ্চয়তা দিতে হবে যে, ট্যাংকারটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞা ভেঙে সিরিয়ায় যাবে না। যদিও ব্রিটেনের এই প্রস্তাবের পর দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা কমেনি। এরই মধ্যে গত শুক্রবার হরমুজ প্রণালিতে একটি ব্রিটিশ তেল ট্যাংকার আটকের দাবি করেছে ইরান। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ডবাহিনী বা আইআরজিসি-র এক বিবৃতিতে বলা হয়, হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন লঙ্ঘনের দায়ে ট্যাংকারটি আটক করা হয়েছে। ‘স্টেনা ইমরো’ নামের ব্রিটিশ তেল ট্যাংকার আটক করার জন্য ইরানের হরমুজগানের বন্দর ও সামুদ্রিক যান চলাচল বিষয়ক সংস্থার অনুরোধে করেছিল। ট্যাংকারটি উপকূলে আনা হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়া চলছে। এটিতে তল্লাশি চালানো হবে।

যুক্তরাজ্য বলছে, এদিন আটককৃত ট্যাংকারের সংখ্যা আসলে দুটি। তবে ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিমের খবরে বলা হয়েছে, দ্বিতীয় ট্যাংকারটিকে আটক করা হয়নি, সেটি ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেরেমি হান্ট সতর্ক করে বলেছেন, ইরান তার দেশের তেল ট্যাংকার ছেড়ে না দিলে তেহরানকে ‘কঠোর পরিণতি’ ভোগ করতে হবে। তবে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা নাকচ করে তিনি বলেন, লন্ডন তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে বিষয়টি সুরাহার চেষ্টা করছে। যদিও ইতিমধ্যে পারস্য উপসাগরে দ্বিতীয় যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর কথা জানিয়েছে ব্রিটেন। দ্বিতীয় যুদ্ধজাহাজের পাশাপাশি ‘এলিট স্পেশাল বোট সার্ভিস’ মোতায়েন করবে ব্রিটেন। যার সদস্যরা মাইন অনুসন্ধান ও অপসারণে দক্ষ। ব্রিটেনের দাবি হরমুজ প্রণালির কাছে ব্রিটিশ তেল ট্যাংকারগুলোর নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্মুক্ত রাখতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যে দ্বিতীয় যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়ে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি জোরালো করতে চাইছে ব্রিটেন। একইসঙ্গে নতুন করে ঐ অঞ্চলে যুদ্ধের শঙ্কাও তৈরি করেছে।

ইরানের সঙ্গে ব্রিটেনের এই উত্তেজনার মধ্যে শুক্রবার ইরানের একটি ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে ইরান এ দাবি নাকচ করেছে। এরই মধ্যে সৌদি আরবে মার্কিন সেনা মোতায়েনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে পেন্টাগন। নির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ না করলেও কিছু মার্কিন গণমাধ্যম বলছে সেই সংখ্যা ৫০০ হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি- মধ্যপ্রাচ্যে ‘উদ্ভূত হুমকি’ থেকে মার্কিন স্বার্থকে রক্ষা করতেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। ইরাকের কুয়েত দখলের পর ১৯৯১ সালে ‘অপারেশন ডেজার্ট স্টর্মের’ মাধ্যমে সৌদি আরবে মার্কিন সেনা মোতায়েন শুরু হয়েছিল। ২০০৩ সালে ইরাকে হামলার পর সেটি বন্ধ রাখা হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন পর আবারও যুক্তরাষ্ট্র সেনা মোতায়েন করছে। খবরে বলা হচ্ছে, সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান ঘাঁটিতে বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাপনা প্যাট্রিয়ট ও এফ-২২ জঙ্গি বিমানের একটি স্কোয়াড্রন পাঠানোর পরিকল্পনা পেন্টাগনের আছে। এই ঘটনা এমন সময়ে ঘটছে যখন ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের সম্পর্ক ক্রমশই খারাপ হচ্ছে।

পর্যবেক্ষকরা বলছেন, সৌদি আরবে মার্কিন সেনা মোতায়েনের এ ঘটনা তেহরান-ওয়াশিংটন উত্তেজনা আরো বাড়াবে। কিংস কলেজের লন্ডনের প্রফেসর অ্যান্ড্রিয়াস ক্রায়েগের মতে, মার্কিন সেনা মোতায়েন ইরানের বিষয়ে একটি সামরিক ‘অপশন’। তবে আমরা যদিও ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের কথা চিন্তা করি, সেক্ষেত্রে ৫০০ সেনার মোতায়েন ততটা বড় পদক্ষেপও নয়।