বাংলা লোকসংগীতের মহিরুহ, কিংবদন্তি শিল্পী আব্দুল আলীমের নামটি বাঙালির হৃদয়ে এক অপরিসীম শ্রদ্ধার আসনে আসীন রহিয়াছে। যাহার কণ্ঠে বাংলার মাটি ও মানুষের আত্মা গাহিয়াছে-তাহারই বাসায় চুরি হইল স্বাধীনতা পুরস্কার, একুশে পদকসহ আরো সাতটি মূল্যবান পুরস্কার ও স্মারক! এমন দুঃখজনক, লজ্জাজনক ঘটনা ঘটিল রাজধানীর খিলগাঁও এলাকায়, তাহা জানিবার পর জাতি কেবল হতবাক নয়, রীতিমতো ক্ষুব্ধ।
প্রথমত, চোর যদি সোনার দুল বা টাকা চুরি করিত-তাহা হইলে ইহা এক প্রকার সাধারণ চুরির ঘটনা বলিয়া বিবেচিত হইত। কিন্তু যেইখানে লক্ষ করিতে পাওয়া যায়, গৃহে রাখা ১০ হাজার টাকা, এমনকি গ্যাস-পানির বিল বাবদ নগদ অর্থও অক্ষত রহিয়াছে, অথচ রাষ্ট্রীয় সম্মাননাগুলিই চুরি হইয়াছে-সেইখানে প্রশ্ন জাগে, চোর কি সাধারণ চোর?
যাহাদের নিকট 'স্বাধীনতা পদক' কিংবা 'একুশে পদক'-এর বিশেষ কোনো অর্থমূল্য থাকিবার কথা নহে-তাহারা কী করিয়া জানিল, এই পদকগুলির মূল্য কত? রাষ্ট্রীয় সম্মাননার বাজারদর বা কালোবাজারি কি তবে এতটাই চাহিদাসম্পন্ন হইয়াছে, যাহা সাধারণ চোরের অভ্যন্তরীণ রুটিনে অন্তর্ভুক্ত হইয়াছে? আরো আশ্চর্য, শুধু পদক নহে, পাকিস্তানি প্রেসিডেন্টের দেওয়া 'তমঘা-ই-হুসন'-এর ন্যায় ঐতিহাসিক স্মারকও চুরি গিয়াছে, যাহা বাংলা সংগীত ইতিহাসের এক অনন্য দলিল।
এই ঘটনার মধ্যে যাহা আরো উদ্বেগজনক, তাহা হইল, পরিবার সন্দেহ প্রকাশ করিয়াছে-এই চুরির পিছনে 'ভেতরের কেউ' থাকিতে পারে। এই ধরনের ঘটনার নজির বিশ্বে অবশ্য বিরল নহে। ২০১৯ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ টাউনের এক জাদুঘর হইতে মুক্তিযুদ্ধ ও বর্ণবৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের বহু স্মারক চুরি হইয়াছিল। ঐতিহাসিক নেলসন ম্যান্ডেলার ব্যক্তিগত চিঠিপত্র, পদক, এমনকি কারাগারে ব্যবহৃত জিনিসপত্র চুরি হইয়াছিল। তদন্তে দেখা গিয়াছিল, সেই চুরির পিছনে ছিল কালোবাজারি ও ঐতিহাসিক স্মারকের অনলাইন বিক্রয় চক্র। অর্থাৎ, পদক বা স্মারক শুধু আবেগের নয়-ইহা এখন হইয়াছে একপ্রকার 'ক্রিপ্টো কালেক্টিবল', যাহা বিক্রয় হয় কালোটাকায়।
তাহা হইলে প্রশ্ন, আব্দুল আলীমের মতো এক মহান শিল্পীর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিসমূহ যদি চোরের হাত হইতে নিরাপদ না থাকে, তাহা হইলে আগামী প্রজন্মের শিল্পীদের মর্যাদা রক্ষা কী করিয়া হইবে? এই ধরনের পদক বা স্মারকই-বা নিরাপদ রহিবে কী করিয়া?
পুলিশ বলিয়াছে, পাঁচ জন সন্দেহভাজন চিহ্নিত হইয়াছে, যদিও তাহাদের মুখ স্পষ্ট নয়। রহস্যময় চোরেরা যেমন মুখ লুকাইয়া রাখে, তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব তেমনি হইতেছে মুখোশ উন্মোচন করা। তদন্ত চলিতে থাকুক, তবে এই ঘটনায় রাষ্ট্রের আত্মসম্মানও আজ প্রশ্নের মুখে। পদক চুরি মানে কেবল ধাতব বস্তু চুরি নহে, ইহা ইতিহাস চুরি, সংস্কৃতি চুরি এবং জাতীয় গৌরব চুরি।
একুশে ও স্বাধীনতা পদক কেবল পুরস্কার নহে, ইহা এক একটি প্রজন্মের সংগ্রামের স্বীকৃতি। এই চুরি কেবল আব্দুল আলীমের পরিবারকেই নয়, সমগ্র জাতিকেই অপমান করিয়াছে। এই অবস্থায় আব্দুল আলীমেরই এক গানের কলি যেন আরো একবার আমাদের হৃদয়ে বাজিয়া উঠে-
'আমি মনের দুঃখ কারে কই,
আমি তো সেই ঘরের মালিক নই-
পরের জায়গা, পরের জমি
ঘর বানাইয়া আমি রই।'
শিল্পী আব্দুল আলীমের আত্মা হয়তো আজ সুরের আড়ালে বলিয়া যাইতেছেন- 'আমি তো সেই ঘরের মালিক নই।'
