ফুটপাতে পথিকের ঠাঁই নাই! 

আপডেট : ২৪ মে ২০২৫, ০৬:০০

বাংলাদেশের ফুটপাতগুলির বেহাল দশা প্রত্যক্ষ করিয়া অনেকে রসিকতা করিয়া বলিয়া থাকেন, 'এইখানকার ফুটপাতগুলি এখন আর ফুটপাত নাই, বরং উহা পরিণত হইয়াছে ফুটো-পাতে!' যাহারা হররোজ ট্রেনে-বাসে বাদুড়ঝোলা হইয়া রাজধানী ঢাকা কিংবা অন্যান্য শহর-নগরে চলাচল করেন, তাহারা সাধারণত বাহন হইতে নামিয়া খানিকটা পথ হাঁটিয়া স্ব-স্ব কর্মস্থলে যান। এই ক্ষেত্রে ফুটপাতই প্রধান অবলম্বন; কিন্তু মুশকিল হইল, সেইখানেও নাই কোনো স্বস্তি! ফুটপাতে নামিলেই পড়িতে হয় হকারদের উপদ্রব বা দৌরাত্ম্যের মুখে। বর্তমানে অবস্থা এতটা বেগতিক হইয়া উঠিয়াছে যে, ফুটপাতের গণ্ডি পার হইয়া মূল সড়কগুলিতে পর্যন্ত পসরা সাজাইয়া ব্যবসা করিয়া যাইতেছে বিভিন্ন অসাধু গোষ্ঠী।

স্থানীয় মাস্তান, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নামধারী নেতা এবং সর্বোপরি হকার সিন্ডিকেটের সম্মিলিত দাপটে ফুটপাতগুলি পরিণত হইয়াছে ভাগাড়ে! এমনকি উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত ফুটপাত বেদখলের বহু ঘটনার কথা শুনিতে পাওয়া যায়। অর্থাৎ, ফুটপাত এখন আর ফুটপাত নাই, বরং বেশির ভাগই চলিয়া গিয়াছে দখলদার ও হকারদের কবজায়। কোথাও গড়িয়া তোলা হইয়াছে অবৈধ স্থাপনা, কোথাও-বা ত্রিপল খাটানো অস্থায়ী তাঁবু: কোথাও আবার ফুটপাতের উপরেই বসানো হইয়াছে মোটর মেকানিক গ্যারেজ। এইভাবে কত রকম ছোটখাটো ব্যবসা যে ফুটপাতগুলিতে জাঁকাইয়া বসিয়াছে, তাহার ইয়ত্তা নাই। ফুটপাত দখলকারী এই দুষ্কৃতকারীদের থামাইবার যেন কেহ নাই!

মাঝেমধ্যে ফুটপাত দখলমুক্ত করিতে অভিযান চালানো হয় বটে। তখন অন্তত দিন কয়েকের জন্য হইলেও ফুটপাতগুলি পথচারীর চলাচলের উপযোগী হইয়া উঠে; কিন্তু কিছু দিন যাইতে না যাইতেই পুনরায় বেদখল হইয়া যায় উদ্ধারকৃত ফুটপাত। ইহা যেন চোর-পুলিশ বা রোদ-বৃষ্টির লুকোচুরি খেলা এবং এই খেলা চলিয়া আসিতেছে মান্ধাতা আমল হইতে। জানা যায়, ইহার নেপথ্যে যাহারা থাকেন, তাহাদের 'হাত অনেক লম্বা'! ফুটপাত দখলমুক্ত রাখিবার দায়িত্ব যাহাদের ওপর ন্যস্ত, সেই কর্তাব্যক্তিদের কাহারো কাহারো ইহার পিছনে হাত থাকার পাশাপাশি বিভিন্ন মহলের থাকে হরেক রকম 'অজুহাত'। অনেকে বলিয়া থাকেন যে, এইভাবে এত মানুষের পেটে লাথি মারাটা কি ঠিক? বিজ্ঞ মহল হইতেও বিভিন্ন সময় দাবি তোলা হয়, পুনর্বাসনের বন্দোবস্ত করিবার পরেই কেবল হকার উচ্ছেদ বা ফুটপাত দখলমুক্ত করা উচিত। অথচ এই কথা অনস্বীকার্য, ফুটপাত বেদখল বা জবরদখল হইয়া যাওয়ার কারণে পথচারীরা মূল সড়কের ধার দিয়া চলাচল করিতে বাধ্য হইতেছেন, যাহার ফলে অনেক সময় দুর্ঘটনা ঘটিতেছে; ঘটিতেছে জীবনহানির ঘটনা। তথাপি এই কথা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট যে, সরকার বা প্রশাসনের রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকিলে ফুটপাত দখলমুক্ত করা মুহূর্তের ব্যাপার!

ফুটপাত দখলমুক্ত করিবার আহ্বানে সাড়া দিয়া সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন সময় আলাপ-আলোচনা, গবেষেণা-জরিপ চালানোর কথা আমরা শুনিয়া থাকি; তথাপি অবস্থার কোনোই পরিবর্তন না! এই ক্ষেত্রে আমাদের সোজাসাপটা কথা হইল, যানজট মুক্ত করিবার প্রশ্নে সরকার কোটি কোটি টাকা খরচ করিয়া শহর কিংবা নগরাঞ্চলগুলির বুক চিরিয়া একের পর এক উড়ালসেতু, ফুটওভারব্রিজ, আন্ডারপাস বা সাবওয়ে-যাহাই নির্মাণ করুক না কেন, যত ব্যয়বহুল প্রযুক্তিই স্থাপন করুক না কেন, তাহাতে না গণপরিবহনে পর্যাপ্ত গতি আসিবে, না পথচারীরা নির্বিঘ্নে-স্বস্তিতে চলাচল করিতে পারিবেন। বরং 'অপারেশন সানশাইন' বা ফুটপাত দখলমুক্ত করিবার পূর্বে সঠিক কর্মপন্থা নির্ধারণ করিয়া তবেই মাঠে নামিতে হইবে।

ফুটপাত হকারমুক্ত হইলে মানুষ বা নিত্যযাত্রীরা গণপরিবহনে যাতায়াত করিয়া স্বস্তি পাইবেন। ইহার ফলে শহরের সৌন্দর্যও বৃদ্ধি পাইবে, হাল বা স্বাস্থ্য ফিরিবে শহরের। মনে রাখিতে হইবে, যানজটে স্থবির নগরীতে ফুটপাতগুলিই পথচারীদের প্রধান ভরসা! সুতরাং, ফুটপাত বিক্রি, লিজ বা ইজারা দেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করিতে হইবে: তোলাবাজ-মাসোহারাবাজদের দৌরাত্ম্য থামাইতে হইবে; হটাইতে হইবে দালাল চক্র এবং সর্বোপরি লাগাম টানিতে হইবে সেই অপকর্মকারীদের, যাহারা জনগণের ফুটপাতকে করিয়া তুলিতেছে জনদুর্ভোগের আঁতুড়ঘর।

ইত্তেফাক/এএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন