বর্ষার আগেই ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামত প্রয়োজন

আপডেট : ২৫ মে ২০২৫, ০৩:৩০

পত্রিকান্তরে প্রকাশ, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার বেড়িবাঁধের অবস্থা নাজুক। বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে এই সংক্রান্ত যেই চিত্রটি ফুটিয়া উঠিয়াছে, তাহা স্থানীয় মানুষের জন্য উদ্বেগজনক। সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া সৈকত হইতে কুমিরা ফেরিঘাট পর্যন্ত বিস্তৃত এই বেড়িবাঁধের চার কিলোমিটারের মধ্যে তিন কিলোমিটারে ব্লক বসানো থাকিলেও জোয়ারের আঘাতে ১৬টি স্থানে তাহা ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছে। ব্লক সরিয়া গিয়া অনেক স্থানে সৃষ্টি হইয়াছে বৃহৎ গর্ত। অধিকন্তু, বাঁশবাড়িয়া ফেরিঘাটসংলগ্ন সিকদার খালের ব্লুইসগেটটিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এইবার বর্ষা মৌসুমে স্থানীয় অধিবাসীদের দুর্ভোগের আশঙ্কা করা যাইতেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, ক্ষতিগ্রস্ত অংশের পরিমাণ প্রায় ৫০০ মিটার এবং ইহার স্থায়ী সংস্কারের জন্য একটি প্রকল্প প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে প্রেরিত হইয়াছে। তবে এই প্রকল্প এখনো অনুমোদিত হয় নাই। অথচ বর্ষার পূর্বেই বাঁধ মেরামত না করা হইলে স্থানীয় জনজীবন ও কৃষিক্ষেত্রে ব্যাপক বিপর্যয় ডাকিয়া আনিবে। যথাসময়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তাহা বাস্তবায়ন না করিবার ফলে সাধারণ মানুষ অনেক সময় সরকারি প্রকল্প হইতে কাঙ্ক্ষিত সুবিধা লাভ করিতে পারে না।

কেবল সীতাকুণ্ড নহে, সমগ্র বাংলাদেশেই বেড়িবাঁধের এই প্রকার ভঙ্গুর দশা এক সাধারণ চিত্র। সাম্প্রতিক ঘটনাবলি হইতে দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন স্থানে বহু বেড়িবাঁধ জীর্ণদশার কারণে প্রতিনিয়ত ভাঙিয়া পড়িতেছে, যাহার ফলে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হইয়া জনজীবন বিপর্যস্ত হইতেছে। উদাহরণস্বরূপ, সাম্প্রতিক কালে ঘূর্ণিঝড় রেমালের প্রভাবে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ১০০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ৫ হাজার ৭০০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ বিদ্যমান, যাহার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাঁধই সংস্কারের অভাবে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রহিয়াছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন হইতে জানা যায়, দেশের প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ সংস্কার বা পুনর্নির্মাণ অত্যাবশ্যক। এই সকল বাঁধের দুর্বলতার কারণে প্রতি বৎসর বর্ষা ও ঘূর্ণিঝড়ের সময় দেশের বিস্তীর্ণ কৃষিজমি, মৎস্য খামার, বসতবাড়ি ও অবকাঠামো ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হইতেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধসমূহ মেরামতের জন্য বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করিলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, অর্থ বরাদ্দের অভাব এবং সঠিক সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন না করায় অনেক ক্ষেত্রেই কাঙ্ক্ষিত ফল লাভহইতেছে না। সীতাকুণ্ডের উদাহরণেই স্পষ্ট যে, প্রায় চার কিলোমিটার বেড়িবাঁধ সংস্কারের জন্য ৫৬০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে প্রেরিত হইলেও, তাহা অনুমোদনের অপেক্ষায় রহিয়াছে। এই দীর্ঘসূত্রতা বর্ষার প্রাক্কালে জনমনে শঙ্কা বৃদ্ধি করিতেছে।

এমতাবস্থায়, আসন্ন বর্ষা মৌসুমের পূর্বেই এই সকল ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ জরুরি ভিত্তিতে মেরামত করা প্রয়োজন। যেই সকল এলাকায় এইরূপ সমস্যা প্রকট, সেইখানে প্রয়োজনে নূতন বাঁধ নির্মাণেরও উদ্যোগ গ্রহণ করা অত্যাবশ্যক। বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারে বিলম্ব হইলে একদিকে যেমন জানমালের ক্ষয়ক্ষতি বৃদ্ধি পাইবে, তেমনই দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে পড়িবে নেতিবাচক প্রভাব। আমরা মনে করি, উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার এবং জোয়ার-ভাটার চাপ সহনশীল বৃহৎ আকারের ব্লক দ্বারা বাঁধ নির্মাণ করিলে তাহার স্থায়িত্ব বৃদ্ধি পাইবে। বাঁধ নির্মিত হইলে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পাইবে, মৎস্য চাষ সুরক্ষিত হইবে, বসতবাড়ি ও জনজীবন হইবে নিরাপদ। সর্বোপরি ইহাতে দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা হইবে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সংখ্যা ও তীব্রতা উভয়ই বৃদ্ধি পাইতেছে। তাই এই সময়ে, টিকসই ও মজবুত বেড়িবাঁধ নির্মাণ কেবল একটি আবশ্যিকতা নহে, ইহা জাতীয় নিরাপত্তারও অংশ। অতএব, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে এই বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করিয়া দেশ ও দেশের মানুষকে রক্ষা করিতে সচেষ্ট হইতে হইবে।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন