সাম্প্রতিক কালে শ্রীলঙ্কায় এক ব্রিটিশ নারী ৪৬ কেজি 'কুশ' নামক ভয়াবহ মাদকসহ ধরা পড়িয়াছেন। অভিযোগ উঠিয়াছে যে, এই মাদক মানব হাড়ের উপাদান দ্বারা নির্মিত। ইহা শ্রীলঙ্কার বিমানবন্দরে কুশ মাদক আটকের বড় ঘটনা। পশ্চিম আফ্রিকায় এই মাদক অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং ইহার সেবনে সেইখানে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটিতেছে। এই মাদকের উপাদানরূপে মানব হাড় ব্যবহারের অভিযোগ উঠায় সিয়েরা লিওনে কবরস্থানে নিরাপত্তা বৃদ্ধি করা হইয়াছে এবং এই মাদকের ভয়াবহতার কারণে সেই দেশের রাষ্ট্রপতি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করিয়াছেন। এই ঘটনা বিশ্বব্যাপী মাদক চোরাচালানের এক ভয়াবহ চিত্র উন্মোচন করিয়াছে।
'কুশ' তুলনামূলকভাবে একটি নতুন সিনথেটিক মাদক, যাহা পশ্চিম আফ্রিকায় ব্যাপক বিস্তার লাভ করিয়াছে। সিয়েরা লিওনে প্রতি সপ্তাহে এই মাদক সেবনে প্রায় এক ডজন ব্যক্তির মৃত্যু হইতেছে বলিয়া অনুমান করা হয়। এই মাদকের প্রধান সেবনকারীরা সাধারণত ১৮ হইতে ২৫ বৎসর বয়সি পুরুষ। কুশ সেবনের ফলে ব্যক্তি আকস্মিকভাবে নিদ্রাচ্ছন্ন হইয়া পড়ে, পথ চলিতে চলিতে পড়িয়া গিয়া মাথায় আঘাত পায় অথবা চলন্ত যানের সম্মুখে চলিয়া আসে। এই কারণেই এই মাদককে 'মৃত্যুর ফাঁদ' হিসাবে আখ্যায়িত করা হইয়াছে। মূলত এই মাদকটি কুশ নামক এক প্রকার গাছ হইতে তৈরি হয়, যাহা অনেকটা গাঁজাগাছের মতন। পরে ইহার সঙ্গে মিশানো হয় মানব হাড়সহ অন্যান্য উপাদান। ইহা স্নায়ু উদ্দীপক বা স্নায়ু বিধ্বংসী। সাধারণ আফিমের চাইতে ইহা ৫০ গুণ বেশি আসক্তি তৈরি করে। ইউরোপ-আমেরিকার দেশেও মাদকসেবীদের নিকট ইহা জনপ্রিয়, যদিও সেই সকল দেশে রহিয়াছে ইহার ভিন্ন ভিন্ন নাম। উপমহাদেশে ইহা কুশ নামে পরিচিত হইবার কারণ হিন্দুকুশ পর্বতমালা। ইহা পাকিস্তান ও আফগানিস্তান অঞ্চলের একটি দুর্গম ও বিপৎসংকুল পর্বত এলাকা এবং কুশ মাদকে ব্যবহৃত কুশগাছের চাষ বেশি হয় এই অঞ্চলে। হিন্দুকুশ পর্বতমালা যেমন বৈরী, বিপৎসংকুল ও ভয়ংকর, তেমনি এই কুশ মাদকটিও ভয়ংকর। অন্য মাদকের চাইতে ইহা দ্রুত গতিতে লিভার ও কিডনি বিকল করিয়া দিতে পারে।
বাংলাদেশে ২০২২ সালে প্রথম বারের মতন এই মাদকটি জব্দ করে র্যাব। শুধু তাহাই নহে, সেই সঙ্গে রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশানে এই মাদক তৈরির একটি প্ল্যান্টের সন্ধানও পান তাহারা। বিশ্বব্যাপী মাদক চোরাচালানের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা এবং প্রতিবেশী দেশসমূহে এই মাদকের বিস্তারের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশও ঝুঁকির মুখে রহিয়াছে। অতীতে বাংলাদেশে কবরস্থান হইতে কঙ্কাল চুরির ঘটনা ঘটিয়াছে, যাহা বর্তমানে 'কুশ' মাদকের উপাদানরূপে মানব হাড় ব্যবহারের অভিযোগের সহিত এক নূতন উদ্বেগের জন্ম দিয়াছে। কথায় বলে, সাবধানের মাইর নাই। তাই এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমাদের পূর্বাহ্ণেই সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে হইবে। সীমান্তসমূহে মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার, গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি এবং দেশের অভ্যন্তরে মাদক পরিবহন ও তাহার বিস্তার রোধে গ্রহণ করিতে হইবে কার্যকরী ব্যবস্থা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণে সজ্জিত করিতে হইবে যাহাতে তাহারা এই ধরনের সিনথেটিক মাদক শনাক্ত ও নির্মূল করিতে পারে। আবার কম ব্যবহৃত বা অপ্রচলিত অন্যান্য মাদকের ব্যাপারেও আমাদের সর্বপ্রকার সতর্কতা অবলম্বন করিতে হইবে। যেমন-হেম্প, মলি, অ্যাডারল, এক্সট্যাসি, ফেন্টানিলসহ ইত্যাদি।
বাংলাদেশের মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের এক হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩৬ লক্ষ। যদিও বেসরকারি হিসাবে ইহা ৭০ লক্ষাধিক। তাই সর্বপ্রকার মাদকাসক্তির বিরুদ্ধে জনসচেতনতা ও সামাজিক আন্দোলন বৃদ্ধি করিতে হইবে। বিশেষত তরুণ ও যুব সমাজকে এই মাদকের কুফল সম্পর্কে সচেতন করিতে হইবে এবং তাহাদের সুস্থ জীবন যাপনে উৎসাহিত করিতে হইবে। মাদকাসক্তদের পুনর্বাসন ও চিকিৎসার ব্যবস্থা জোরদার করিতে হইবে। কঙ্কাল চুরির ঘটনা রোধেও স্থানীয় প্রশাসন ও জনগণকেও অধিকতর সতর্ক হইতে হইবে। মাদক একটি সামাজিক ব্যাধি। তাই ইহার বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধই একমাত্র পরিত্রাণের উপায়।
