বর্তমান সময়ে “উন্নয়ন” শব্দটি আমাদের সমাজে এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছে, যেখানে এর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন করাও যেন অপরাধ। অথচ বাস্তবতা হলো, অনেক সময় এই তথাকথিত উন্নয়ন প্রকৃতি, জীবনধারা ও স্থানীয় সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। কক্সবাজার জেলার উপকূলীয় উপজেলা মহেশখালী তার একটি বাস্তব উদাহরণ।
মহেশখালী পরিচিত ছিল লবণচাষ, পানবরজ, ধানক্ষেত আর মৎস্যজীবী ও কৃষিনির্ভর জীবনব্যবস্থার জন্য। কিন্তু এই পরিচিতি আজ বিলুপ্তির পথে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, গভীর সমুদ্রবন্দর, এলএনজি টার্মিনালসহ নানা মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের কারণে স্থানীয় মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে, হারাচ্ছে ভূমি ও জীবিকার সুযোগ। কাটা পড়ছে পাহাড়, ভরাট হচ্ছে নদী ও জলাভূমি, ধ্বংস হচ্ছে জীববৈচিত্র্য।
উন্নয়ন কী শুধু অবকাঠামোর মানে? যদি মানুষের জীবনে বিপর্যয় আসে, নারীরা হয় আরও অনিরাপদ, শিশুরা হারায় ভবিষ্যৎ, আর প্রকৃতি হয়ে পড়ে মৃতপ্রায়; তবে সে উন্নয়ন কোথায়? এই প্রশ্ন আজ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
বর্তমানে উন্নয়নকে অনেকাংশেই টাকার মাপকাঠিতে বিচার করা হয়। কিন্তু টাকার মান সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়, বিপরীতে প্রাকৃতিক সম্পদ, কৃষি, বন ও জলাভূমি; এসবই দীর্ঘমেয়াদে একেকটি অঞ্চলের টিকে থাকার ভিত্তি। তাই অর্থনৈতিক লাভের মোহে প্রকৃতির ক্ষতি করে করা উন্নয়ন আসলে ধ্বংস। মহেশখালীতে যা হচ্ছে, তা একক ঘটনা নয়।
একই দৃশ্য দেখা যাচ্ছে চকরিয়া, পেকুয়া, টেকনাফ, রামু ও সদরের কিছু অংশেও। পর্যটনের নামে কিংবা বড় প্রকল্পের ছায়ায় নদী দখল, পাহাড় কাটা ও বন উজাড় এখন নিয়মিত চিত্র। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত; জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা ও তীব্র গরম। সব মিলিয়ে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে উপকূল।
আমাদের দরকার এমন একটি উন্নয়ন ভাবনা, যা টাকার অঙ্কে নয়, মানুষের টিকে থাকা, পরিবেশের ভারসাম্য এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের টিকে থাকার ভিত্তিতে মূল্যায়িত হবে। উন্নয়ন মানে শুধু রাস্তা নয়, উন্নয়ন মানে মানুষ ও প্রকৃতির টেকসই সহাবস্থান নিশ্চিত করা।
এই ধ্বংস প্রতিরোধ করতে না পারলে, শুধু মহেশখালী নয়, একদিন কক্সবাজারের উপকূল থেকেই মুছে যেতে পারে প্রকৃতি, মানুষ ও জীবনের গল্প।
