'কাঁটা বপন করিলে কেবল তোমারই পায়ে বিঁধিবে' 

আপডেট : ৩০ মে ২০২৫, ০৬:০০

সতেরো শতকে পেশোয়ারে জন্ম নেওয়া বিখ্যাত কবি রহমান বাবা প্রায় ৩৫০ বৎসর পূর্বে অসাধারণ কিছু কবিতা লিখিয়া গিয়াছেন। তাহার মধ্যে একটি কবিতার শুরু এই রকম-'স ফ্লাওয়ার্স টু মেইক আ গার্ডেন ব্লুম অ্যারাউন্ড ইউ/ দ্য থর্নস ইউ সো উইল প্রিক ইয়োর ওউন ফিট।' অর্থাৎ, 'ফুল বপন করো, যেন চারিদিকে বাগান ফুটিয়া উঠে; কাঁটা বপন করিলে কেবল তোমারই পায়ে বিঁধিবে।'

কবিতাটির মর্মার্থ হইল-জীবন হইতেছে আমাদের কর্ম প্রতিফলনের এক অবিরাম প্রক্রিয়া: যাহা বপন করা হয়, তাহাই একদিন ফলায়। করুণা ও ভালোবাসার বীজ বপন করিলে তাহা যেমন ফুলে ফলে উদ্ভাসিত হইয়া উঠে, তেমনি ঘৃণা ও প্রতিহিংসার বীজ বপন করিলে একদিন তাহা নিজেকেই যন্ত্রণায় জর্জরিত করে। কবি রহমান বাবার এই মর্মবাণী মানবসমাজের প্রতিটি স্তরের জন্য এক চিরন্তন শিক্ষা। অন্যকে আঘাত করিলে, পরকে হেয় করিলে, কূপ খনন করিলে ইহা একসময় বুমেরাং হইয়া ফিরিয়া আসে। ইহা একপ্রকার আত্মঘাতী প্রক্রিয়া। কারণ পরের প্রতি অন্যায় মানেই নিজস্ব মানবিক অস্তিত্বের প্রতিও অমানবিকতা।

আমরা ইহা কতটুকু উপলব্ধি করিতে পারি? রহমান বাবাদের মতো দার্শনিক ভাবনার কবিদের এই বোধ আজও আমাদের সমাজের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ প্রাসঙ্গিক। এই কবিতায় মানবতাবাদের যে প্রচ্ছন্ন দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশিত হইয়াছে, তাহা আধুনিক সমাজে বিশেষভাবে জরুরি। বর্তমান সমাজে ঘৃণা, বিদ্বেষ, সংকীর্ণতা ও রাজনৈতিক হিংসা যেইভাবে মানুষের মনে বিষ ছড়াইতেছে, তাতে এই কবিতাটি যেন এক অনির্বাণ মশাল। কবির বাণীতে একটি চিরন্তন সত্য প্রতিফলিত- 'মানবতা এক শরীরের ন্যায়: অপরকে যন্ত্রণাদান মানে নিজের দেহকেই ক্ষতবিক্ষত করা।' এই দর্শন বিশ্লেষণ করিলে স্পষ্ট হইয়া উঠে, রহমান বাবা কেবল সুফিবাদের অন্তর্নিহিত মানবপ্রেম ও সহিষ্ণুতার বাণীই প্রচার করেন নাই, বরং আধুনিক মানবিক দর্শনের পূর্বাভাসও দিয়াছেন। তিনি মানুষের অন্তরের দিকে তাকাইয়া বলিয়াছেন, 'তুমি অন্যকে যতই অবজ্ঞা করো, তোমার দেহও একদিন ধূলিতে রূপান্তরিত হইবে।' ইহা একটি প্রগাঢ় নৈতিক উপলব্ধি, যেইখানে অহংকার ও বিদ্বেষের অসারতাকে চোখে আঙুল দিয়া দেখাইয়া দেয়।

কবির আরেকটি গভীর বার্তা হইতেছে, 'দিনের আলোর মধ্যে পথ সোজা করো, কারণ রাতের অন্ধকার কখন আসিয়া পড়ে, বলা যায় না।' এই বার্তাটি কেবল মৃত্যুর ইঙ্গিতই নহে; ইহা জীবনেরও অনিশ্চয়তার প্রতীক। এই কারণে মানুষ যখন সুযোগপ্রাপ্ত হয়, তখনই তাহার উচিত আত্মশুদ্ধির পথ অবলম্বন করা, কারণ সময়ের স্রোত আর একবার ফিরিয়া আসে না। এই বক্তব্য আমাদের বর্তমান জীবনে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক, যেইখানে মানুষের অন্তর ভরপুর স্বার্থপরতা ও আত্মপ্রবঞ্চনায়। রহমান বাবার এই মর্মবাণী স্পষ্টতই মানবতাবাদের এক দীপ্ত দলিল, যেইখানে করুণা, সহানুভূতি, আত্মজিজ্ঞাসা ও নৈতিকতার সম্মিলন ঘটিয়াছে এক চমৎকার শিল্পবোধের ভিতর দিয়া।

আজকের সমাজে, যেইখানে মানুষের মধ্যে বিভক্তি ও বিদ্বেষের বিষবাষ্প প্রতিনিয়ত বাড়িয়াই চলিতেছে, সেইখানে রহমান বাবার এই কবিতা যেন এক দীপ্তমান লুব্ধক নক্ষত্রবাণী। মানুষ যদি তাহার অন্তরের বাগানে মানবপ্রেমের ফুল রোপণ করে, তাহার চারিপাশও একদিন সুবাসে ভরিয়া উঠিবে। আর যদি সে ঘৃণার কাঁটা বপন করে, তাহার ফল সে নিজেই ভোগ করিবে। সুতরাং, এখনই সময়, যখন আলোর মধ্যে দাঁড়াইয়া আমাদের নিজের পথ সোজা করা প্রয়োজন-কারণ আমরা সকলেই ঘোর অন্ধকারের যাত্রী। রহমান বাবা যেইভাবে কর্মফলের দর্শনকে আত্মিক শুদ্ধতার সহিত যুক্ত করিয়াছেন, তেমনি বলিয়াছেন জীবনের ক্ষণস্থায়িত্বের কথা, আমরা সকলেই আসলে ধূলিকণা। প্রকৃত অর্থে, আমরা সকলেই ধূলিকণা হইবার এক বিশাল কাফেলা যাত্রার পথিক মাত্র। সুতরাং কেন এত বিষবাষ্প ছড়ানো? সেই বিষবাষ্পের মধ্যে নিজেকেও তো নিঃশ্বাস লইতে হইবে। এত ঔদ্ধত্য উল্লম্ফন কীসের? এত অহংকার কীসের?

ইত্তেফাক/এএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন