বাংলাদেশি প্রবাসীরা এখন শুধুমাত্র রেমিট্যান্স পাঠিয়ে সহায়তা করছেন না তারা হয়ে উঠেছেন দেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ গঠনে এক রূপান্তরকারী শক্তি। বিশ্বের ১৬২টি দেশে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন, যারা আর্থিক সম্পদ, দক্ষতা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে বাংলাদেশের শিক্ষা, প্রযুক্তি ও স্বাস্থ্য খাতে উন্নয়নে ভূমিকা রাখছেন।
রেমিট্যান্স অর্থনীতির মূল শক্তি
বাংলাদেশি প্রবাসীদের সবচেয়ে দৃশ্যমান এবং পরিমাপযোগ্য অবদান হলো রেমিট্যান্স। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন রেকর্ড পরিমাণ ২৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা দেশের মোট জিডিপির প্রায় ৪.৮ শতাংশ। ২০২১ সালে এই পরিমাণ ছিল ২২ বিলিয়ন ডলার, এই বৃদ্ধি প্রমাণ করে যে প্রবাসীদের আর্থিক অবদান ক্রমেই বাড়ছে। গ্রামীণ অঞ্চলের লাখো পরিবার এই অর্থের ওপর নির্ভরশীল প্রতিদিনের খরচ, শিক্ষায় বিনিয়োগ এবং স্বাস্থ্যসেবায় উন্নয়ন, এসব রেমিট্যান্সের মাধ্যমেই সম্ভব হচ্ছে।
সরকারের ২.৫% নগদ প্রণোদনা প্রবাসীদের বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহিত করছে। সেই সঙ্গে ‘ট্যাপট্যাপ সেন্ড’-এর মতো ফিনটেক প্ল্যাটফর্মগুলো রেমিট্যান্সের জগতে বিপ্লব এনেছে—মোবাইল ওয়ালেট ও ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ফি-ফ্রি, তাৎক্ষণিক টাকা পাঠানোর সুবিধা এখন সহজলভ্য। বিকাশের মতো জনপ্রিয় সেবার সঙ্গে যুক্ত হয়ে, ট্যাপট্যাপ সেন্ড প্রবাসীদের জন্য টাকা পাঠানো আরও সহজ ও সাশ্রয়ী করেছে, যার ফলে রেমিট্যান্সের পরিমাণ এবং প্রভাব দুটোই বেড়েছে।
শিক্ষা, প্রযুক্তি ও স্বাস্থ্য খাতে প্রবাসীদের ভূমিকা
শিক্ষা খাতে প্রবাসী বাংলাদেশিরা জ্ঞানের বিনিময়, অভিজ্ঞতা শেয়ার এবং নানা সমাজসেবামূলক উদ্যোগের মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে অবদান রাখছেন। অনেকেই স্কলারশিপ চালু করছেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সহায়তা করছেন, অথবা নিজস্ব দক্ষতা অনলাইনে কিংবা দেশে ফিরে শেয়ার করছেন। এতে করে দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন হচ্ছে এবং গুরুত্বপূর্ণ খাতে দক্ষতার ঘাটতি পূরণ হচ্ছে।
প্রযুক্তি খাতে প্রবাসী উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমকে এগিয়ে নিচ্ছেন। ২০২৪ সালেই প্রযুক্তি খাতে প্রবাসী বিনিয়োগকারীরা ৫৫ বিলিয়ন টাকা বিনিয়োগ করেছেন। ফিনটেক, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট এবং ডিজিটাল সেবায় এই বিনিয়োগ বাংলাদেশে ডিজিটাল রূপান্তর ও উদ্ভাবনে গতিশীলতা এনেছে।
স্বাস্থ্য খাতেও প্রবাসীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। রেমিট্যান্সের মাধ্যমে চিকিৎসার খরচ মেটানো ছাড়াও, তারা মেডিকেল ট্যুরিজম, প্রযুক্তিগত দক্ষতা আদান-প্রদান এবং স্বাস্থ্য অবকাঠামোতে বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশের স্বাস্থ্যসেবার মান ও সুলভতা বাড়াচ্ছেন বিশেষ করে অনুন্নত অঞ্চলে।
রেমিট্যান্স ও বিনিয়োগ সহজতর করা
প্রবাসীদের বিশাল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সরকার নতুন নীতিমালা গ্রহণ করছে। আসন্ন ‘জাতীয় প্রবাসী নীতি’ প্রবাসীদের বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে এবং বৈধ পথে রেমিট্যান্স বাড়াতে সহায়তা করবে। ‘এনআরবি বন্ড’ চালুর মাধ্যমে প্রবাসীদের সঞ্চয় দেশে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা হচ্ছে, সেইসঙ্গে ব্যবসায়িক সংযোগ তৈরি করে তাদের সঞ্চয় দেশের অর্থনীতিতে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তবে এখনও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। প্রবাসী সম্প্রদায় বৈচিত্র্যময়, এবং অনেক তরুণ প্রজন্ম ও পেশাজীবী বাংলাদেশ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন মনে করেন। তাদের সম্পৃক্ত করতে প্রয়োজন অন্তর্ভুক্তিমূলক কৌশল। বিনিয়োগ সম্পর্কিত নিয়মনীতি আরও স্পষ্ট করতে হবে, বিনিয়োগ শিক্ষার বিস্তার করতে হবে এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন করতে হবে, যাতে এই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়। পাশাপাশি, স্থানীয় মূলধনের সঙ্গে প্রবাসী মূলধনের ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি, যাতে টেকসই ও সার্বভৌম অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত হয়।
প্রবাসী বাংলাদেশিরা এখন শুধু রেমিট্যান্সের উৎস নয়—তারা হয়ে উঠেছেন দেশের অর্থনীতির গতিপথ নির্ধারণকারী চালিকাশক্তি। তাদের বিনিয়োগ, জ্ঞান বিনিময় এবং শিক্ষা, প্রযুক্তি ও স্বাস্থ্য খাতে উদ্ভাবনী অংশগ্রহণ বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বৈচিত্র্যময় ও সহনশীল করে তুলছে। সরকারের সহায়ক নীতি ও ফিনটেক উদ্ভাবনের সাথে সাথে প্রবাসীদের ভূমিকা আরও গভীর হবে, যা বাংলাদেশের সমৃদ্ধি ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় অবদান রাখবে।
লেখক: আইনজীবী
