সমাজসেবায় আনন্দ যেমন সঙ্গী, তেমনি দুঃখও। দেখেছি বন্ধু ক্ষণিকেই কীভাবে শত্রু, প্রিয়জন পর এবং সম্মান ভূলন্ঠিত হতে তবু এলাকা তথা মানুষের পাসে দাঁড়ানোর প্রশান্তি অন্যরকম। কথাগুলো বলছিলেন আমদানি রপ্তানি পণ্যের ক্লিয়ারিং ফরোয়ার্ডিং অ্যাজেন্ট (সিএন্ডএফ) ব্যবসায়ী ও বিশিষ্ট সমাজসেবক মোঃ নজরুল ইসলাম ভূঞা (মাহাবুব)।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর আগামী ২৮ জুন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে উত্তরা ৩নং সেক্টর কল্যাণ সমিতির কার্যনির্বাহী কমিটির নির্বাচন- ২০২৫। বহু প্রতীক্ষিত এই নির্বাচনের সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী ও সাবেক নিরাপত্তা সম্পাদক মোঃ নজরুল ইসলাম ভূঞা (মাহাবু) এর মুখোমুখি হন প্রতিবেদক সিকদার নজরুল ইসলাম। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সেক্টরের উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা হয় এই সমাজসেবক ও ব্যবসায়ীর সঙ্গে।
নির্বাচন আপনাদের দোঁড় গোঁড়ায় এ ব্যাপারে আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
আমরা অত্যন্ত আনন্দিত যে, দীর্ঘ সময় পর নির্বাচনে ফিরেছি, সকল প্রস্তুতি শেষ, এখন চলছে কাউন্টডাউন। মাঝখানে বিগত সরকারের আমলে ‘জোর যার মুল্লুক তার’ এর যুগে সিলেকশনের মাধ্যমে কমিটি করে চলছিল। অবশেষে জুলাই এর পর পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে আমরা বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতাকে দুর করে নির্বাচন করতে যাচ্ছি। সামনে আমাদের লক্ষ তথা চ্যালেজ্ঞ একটাই; দৃষ্টান্তমূলক স্বচ্ছ সুন্দর নির্বাচনের আয়োজন ও তা সুসম্পন্ন করে দীর্ঘ সময়ের শূন্যতা, স্থবিরতা দূর করা। দ্বিতীয় বৃহত্তম কাজ হচ্ছে বিজয়ীদের সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে গ্রহণ করে মূল উদ্দেশ্য- কল্যাণ সমিতির মাধ্যমে এলাকার উন্নয়নে হাতে-হাত মিলিয়ে কাজ করা। আমি যদি হেরেও যাই সেটা অক্ষরে-অক্ষরে পালন করবো ইনশাআল্লাহ।
আপনাদের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে সংক্ষেপে যদি কিছু বলেন?
আমাদের উদ্দেশ্য মুলত মেয়াদান্তে নির্বাচনের মাধ্যমে দায়িত্ব বুঝে নিয়ে বা দিয়ে বিজয়ী প্যানেলকে সার্বিকভাবে সহায়তার মধ্য দিয়ে এলাকাবাসীর সকল প্রয়োজনে পাশে থাকা। উত্তরা মডেল টাউনে সেক্টর ভেদে কল্যাণ সমিতিগুলো প্রশাসনের পাশাপাশি এলাকার যেকোনো বিপদে আপদে বাসিন্দাদের পাশে দাঁড়ানো থেকে শুরু করে এলাকার পরিচ্ছন্নতা, আভ্যন্তরীণ সড়কের শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা, সহজ সাবলীল নিয়মে সদস্য বৃদ্ধি, সড়কে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, সিটি কর্পোরেশনের সহায়তায় মশক নিধনের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণসহ রাস্তা, নর্দমা ও ফুটপাত সংস্কারের ব্যাপারে যথাযথ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ স্থাপন ও সকাল বিকাল বেয়াম ও প্রাতঃভ্রমণ এবং খেলাধুলার সুযোগ তৈরিসহ সৃজনশীল বিনোদনের সুযোগ-সুবিধায় সমৃদ্ধ একটি আদর্শ আবাসিক এলাকা গড়ার প্রত্যয়ে সমবেতভাবে কাজ করবো ইনশাআল্লাহ।
আপনাদের ড. নুর-মাহবুব প্যানেলের প্রার্থীদের নিয়ে কী আপনি সন্তুষ্ট,তাদেরকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
সভাপতি সেক্রেটারিসহ আমাদের ২১ সদস্যের প্যানেলের সকল প্রার্থী অত্যন্ত ভাল ও যোগ্যতা সম্পন্ন। বর্ণাঢ্য কর্মজীবন, সততা ও মার্জিত ব্যবহারে সৎজন হিসেবে তারা অতুলনীয়। জীবনের দীর্ঘ সময় সু-প্রতিবেশি ও পরোপকারী সামাজিক মানুষ হিসেবে তারা যোগ্যতাসম্পন্ন অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী বলে আমার বিশ্বাস ও আস্থা। হাতে গোনা কজন ব্যতীত প্রায় সকলেই অতীতে সভাপতি-সেক্রেটারিসহ বিভিন্ন পদে বহাল থেকে সাফল্যের সাথে সমিতি পরিচালনায় সিদ্ধ হস্ত।
বিজয়ের ব্যাপারে আপনি কতটা আশাবাদী?
শুধু বলার জন্যই নয়, আগের প্রশ্নোত্তরের ধারাবাহিকতায় বলতে চাই যে, মহান আল্লাহ্ সুবহানু ওয়া তায়ালার ইচ্ছায় আমাদের প্রার্থীগণ সকলেই অত্যন্ত যোগ্যতাসম্পন্ন। ফলে আমাদের বিজয় নিশ্চিত ইনশাআল্লাহ। এবং অকপটে এটাও অনস্বীকার্যে, আমাদের বিপরীতের প্রার্থীরাও আমাদের কাছের মানুষ। তাদের জন্যও থাকলো শুভ কামনা।
একজন সাধারণ সম্পাদক হিসেবে বাসযোগ্য একটি আদর্শ এলাকা গড়তে আপনার পরিকল্পনা সম্পর্কে সংক্ষেপে কিছু বলুন?
সেক্টর কল্যাণ সমিতির কাজ হচ্ছে জননিরাপত্তা ও বিভিন্ন জনসেবামূলক কার্যক্রম ও সার্বিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধিসহ উন্নয়নমূলক বিভিন্ন কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে এলাকাকে অপেক্ষাকৃত আধুনিক তথা বাসযোগ্য করে গড়ে তোলা। উত্তরার বিভিন্ন সেক্টরের মধ্যে ৩নং সেক্টরকে মডেল সেক্টর হিসেবে প্রস্তুত করে উক্ত সেক্টরের কল্যাণ সমিতি, সংশ্লিষ্ট থানা ও সিটি কর্পোরেশনের যৌথ উদ্যোগে সমস্যার শ্রেণী বিন্যাস করে বিভিন্ন মেয়াদী বাস্তবায়ন কার্যক্রম হাতে নেয়ার অংশ হিসেবে সামাজিক ও প্রশাসনিক যৌথ উদ্যোগ ও ঐকমতের ভিত্তিতে সমন্বিত কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। এজন্য পশ্চিম থানা, সিটি কর্পোরেশন ও সেক্টর কল্যাণ সমিতির সমন্বয়ে যৌথ মাসিক বৈঠক নিয়মিত পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। সম্পৃক্ত করা হবে কমিউনিটি ক্লাব, বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন, এমনকি স্থানীয় মসজিদ কমিটিকেও। যারা এলাকার নিরাপত্তা রক্ষা ও সামাজিক অবক্ষয় রোধে ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগতভাবে সচেতনতা তৈরির মাধ্যমে এলাকার রাস্তাঘাট রক্ষণাবেক্ষণ, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ও জলাবদ্ধতাসহ বিভিন্ন নাগরিক সমস্যায় সমন্বীতভাবে কাজ করবে বলে আমার বিশ্বাস।
এ বিষয়ে তিনি আরও বলেন, সবচেয়ে চ্যালেজ্ঞিং যে নিরাত্তামূলক কার্যক্রম, সে ব্যাপারে উপযুক্ত নিরাপত্তাকর্মী কর্তৃক এলাকার অলিগলি ২৪ ঘণ্টা চোখেচোখে রাখাসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তথা পুলিশের সাথে তাৎক্ষণিক যোগাযোগের মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিতের ব্যাপারটি আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। যার অংশ হিসেবে আমাদের গার্ডদেরকে প্রশিক্ষণসহ ওয়াকিটকি ও ভবিষ্যতে মটর বাইক দেয়ারও পরিকল্পনা রয়েছে। একই সাথে অপরাধীদের সনাক্ত করতে সেক্টরের প্রত্যেক মোড়ে ও বিভিন্ন গলিতে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা বৃদ্ধির পরিকল্পনা রয়েছে, যা সমিতির অফিস কক্ষে স্থাপিত নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে সরাসরি পরিচালিত হবে এবং দৈনন্দিন সকল রেকর্ড সংশ্লিষ্ট এক্সপার্ট কর্তৃক সংরক্ষণ করা হবে। একই সঙ্গে পার্কে ও উদ্যানে প্রবেশাধিকার সংরক্ষণ তথা নিয়ন্ত্রণ করাসহ এসব স্থানে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করা হবে। দ্বিতীয়ত, রাতে নির্দিষ্ট একটি সময়ে সড়কের প্রধান গেট ব্যতীত সকল সাব গেট এবং মধ্যরাতে গাড়ি প্রবেশের জন্য এভিনিউ গেট ব্যতীত পকেট গেটসহ সকল গেট বন্ধ করে দেয়াসহ বাসিন্দাদের সকল গাড়িতে সনাক্তকারী সত্যিকার লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। একই সাথে অসামাজিক কার্যকলাপ প্রতিরোধে বাসিন্দাদের তালিকা আপডেট করাসহ নিয়মিত মনিটরিং কার্যক্রম পরিচালিত হবে। এ ছাড়া পার্ক ও উদ্যানে স্কুল কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা কিংবা অন্যরা যাতে অবাধে মেলামেশা করতে না পারে, সেজন্য পুলিশের টহল বৃদ্ধির পাশাপাশি নিজস্ব নিরাপত্তা কর্মীদের সার্বক্ষণিক টহলে সতর্ক রাখা হবে।
পথচারীদের চলাচল নির্বিঘ্নে করতে সেক্টরের অবৈধ দোকানপাট অপসারণ ও ফুটপাতগুলোকে হকারমুক্ত করার চেষ্টা করা হবে। এভাবে সকল কাজই প্রশাসনের সাথে আলোচনা করে তাদের পরামর্শ ও সহযোগিতায় যৌথভাবে করা হবে। বিশেষ করে নিরাপত্তায় নিয়োজিত গার্ড তথা নৈশ প্রহরীদের সাথে একান্তে বসে তাদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে কাজের সুষ্ঠু বণ্টন ও তদারকিসহ তাদের সমস্যাগুলোর সম্ভাব্য সমাধান ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করারও পরিকল্পনা রয়েছে।
অন্যদিকে এলাকার তরুণ সমাজ যাতে বাজে আড্ডা ও অসৎ সঙ্গে বিপদগ্রস্ত না হতে পারে সেজন্য তাদেরকে খেলাধুলায় অংশগ্রহণের ব্যাপারে উৎসাহিত করতে খেলার মাঠ ও পার্কগুলোকে সংস্কার করার পাশাপাশি মৌসুম অনুযায়ী বিভিন্ন টুর্নামেন্টের আয়োজন করা হবে। একই সাথে মসজিদে কোরআন শিক্ষার ক্লাসে অংশগ্রহণের ব্যাপারে বাসিন্দাদের উৎসাহ দেয়ার অংশ হিসেবে স্কুল ও মাদ্রাসা ভিত্তিক হামদ, নাত ও কোরআন শিক্ষার প্রতিযোগিতার আয়োজনসহ এলাকার মসজিদের আধুনিকায়নে সহযোগিতা করা হবে। যাতে বাসিন্দারা বেশি-বেশি মসজিদ মুখি হন। আর এভাবেই আমরা উত্তরা ৩নং সেক্টর তথা সমগ্র উত্তরাকে একটি বাসযোগ্য মডেল সিটিতে পরিণত করতে অবিরাম কাজ করে যাব ইনশাআল্লাহ।
সমাজসেবায় বিশেষ করে সমিতিতে আজকাল অনীহা অনেকের, এর কারণ কী বলে আপনি মনে করেন?
চরম অস্তিত্ব সংকট চলছে দেশের সমাজসেবক এমনকি সুশীল সমাজের মানুষদেরও। যার নেপথ্যে রয়েছে নোংরা দলীয়করণের অপসংস্কৃতি তথা ভিন্ন দল-মত নির্মূলের মাধ্যমে একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা ও বিস্তারের মতো ব্যাপার। কৌশলে বিভিন্ন তকমা লাগিয়ে দোষী সাব্যস্ত করে গুম হত্যা কিংবা জেল জরিমানাসহ নির্মমভাবে বিতর্কিত করা হয় সমাজ তথা দেশের অমূল্য সম্পদতুল্য সুশীল সমাজের ব্যক্তিদের। বিগত ১৬ বছর বিচারবিভাগসহ বিভিন্ন প্রশাসনকে ব্যাবহার করে ক্ষমতাসীনরা ৫ জুলাইয়ের আগে যেটা করেছে। ফলে বিভিন্ন প্রয়োজনে নির্মোহ, নির্দলীয় কোনো সমাজসেবক বা সুশীল সমাজের কাউকে খোঁজ করলে, ডাকলে তাদেরকে পাওয়া যায় না। তারা লোক চক্ষুর আড়ালে নিজেদেরকে যতটা সম্ভব লুকিয়ে রাখেন। অনেক খোঁজাখুজির পর এই বিলুপ্ত প্রায় মানুষগুলোর দু’একজনের খোঁজ শেষতক মিললেও তাঁরা সহসা কোনো আচার অনুষ্ঠানে আসেন না। বিশেষ করে ২০২৩-২৪ এর দিকে এই সংকট আরও প্রকট হয়। এবং সবচেয়ে আক্ষেপের ব্যাপার হল, ছাত্র জনতার বিপ্লবের পরও আওয়ামীলীগের কাছাকাছি থাকা বর্ণচোরা সুবিধাভোগীরা এখনও প্রশাসনকে ব্যবহার করেই আওয়ামী তকমায় নির্দলীয় অনেক সমাজসেবকদের হয়রানি করছে। সম্প্রতি আমিও এ জাতীয় হয়রানির শিকার।
সব জেনে শুনেও ঝুঁকিপূর্ণ এসব কাজে কেন সম্পৃক্ত হচ্ছেন?
আমরা সবাই যদি ভয়ে মুখ ফিরিয়ে নেই তাহলে সমাজ বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে, ভুগবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। সন্তানরা গালি দিয়ে বলবে আমাদের অভিভাবকগণ কী রেখে গেলেন আমাদের জন্য! তাই আমি সকল চোখ রাঙ্গানোকে উপেক্ষা করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপোষহীন থেকে সমাজের প্রতি আমার দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি।
