ঘুমঘুম চোখে, কার্জন হলের বিশাল অডিটোরিয়ামের লাল ভেলভেট এর পর্দা উঠতেই প্রথম দৃশ্যে একটা নিভু নিভু আলোয় ছাত্রাবাস বা মেস এর দৃশ্য চোখে পড়লো আর সেই সাথে কেউ একজন উচ্চকিত কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠলো "ইউরেকা ইউরেকা" বলে। এই কথাটা আমার ওই বয়সে দুর্বোধ্য ঠেকলেও বুঝতে কষ্ট হলো না, পত্রিকা হাতে আব্বা একটা খাটের উপর থেকে দুম করে নেমেই বেশ উত্তেজিত গলায় ওই অদ্ভুত কথাটা বলছেন। তার কণ্ঠে একটা বিজয়ের, স্বস্তির আভাস পেলাম। আমি তাতেই মহাখুশি।
আরও দেখলাম, বেবি চাচা, (আমানুজ্জামান খান, টি,এস সি এর সাবেক পরিচালক), কিবরিয়া চাচা ( সাবেক আই,জি), নাজিমুদ্দৌলা চাচা, লুৎফর চাচা সবাই মঞ্চে অভিনয় করছেন, হল ভর্তি দর্শকের সামনে। প্রথম দৃশ্যের পর পরই আমি আম্মার কোলে গভীর ঘুমে ঢোলে পরি।
পরদিন সবার কথায় আন্দাজ করে নেই, যে একটা সফল নাটক মঞ্চায়ন হয়েছে আগের রাতে। সালটা ষাট এর দশকের মাঝামাঝি।
এটি আব্বা, অধ্যাপক সৈয়দ মকসুদ আলী বিরচিত "ইউরেকা" নাটকের মঞ্চায়ন, যা বেতার ও মঞ্চ নাটক হিসেবে পরবর্তীতে প্রশংসা কুড়ায়। আর তার লেখা "আলাদীনের চেরাগ" এর জন্য বেতারে শ্রেষ্ঠ নাট্যকার হিসেবে তিনি পুরস্কৃত হন ১৯৪৯ সালে।
আব্বা তখন ফজলুল হক হলের হাউস-টিউটর। মোঘল ও ব্রিটিশ স্থাপত্যকলার মিশেলে এক অপূর্ব নিদর্শন এই কার্জন হল ও ফজলুল হক হল। বিশাল ফুলের বাগানে থরে থরে হরেক রঙের ফুলের কেয়ারি শোভা পেতো গোটা ক্যাম্পাস জুড়ে। পাশেই এক বিশাল দিঘি। অবসরে অনেকেই শানবাঁধানো ঘাটে বসতেন। আমার মনে হতো আমি বোধহয় কোন রাজপরিবারের রাজকন্যা।
১৯২৫ সালের ২৫ জুন বরিশালের সুজাবাদের এক ঐতিহ্যবাহী মুসলিম পরিবারে সৈয়দ ওয়াজেদ আলী (ব্রিটিশ পুলিশ কর্মকর্তা) ও সৈয়েদানি ফজরুননেসার কোল আলো করে আসেন তাদের প্রথম সন্তান সৈয়দ মকসুদ আলী, ডাক নাম, মানিক। এরপর একে একে কোলে আসেন তাদের আরও তিন সন্তান রতন, কাঞ্চন ও পান্না। মানিক এর হাতেখড়ি দেন দাদা সৈয়দ আবদুল আলী নিজেই। তাল পাতা শুকিয়ে, কাঠ কয়লার গুড়ো পানিতে মিশিয়ে কালি বানিয়ে প্রতিদিন নাতিকে যত্ন করে লেখা শেখাতেন তিনি। দাদা স্বপ্ন দেখতেন তার উত্তরসূরিরা সবাই উচ্চ শিক্ষা লাভ করে সুনাম অর্জন করবে।
ছাত্র অবস্থায় একজন তুখোড় বিতার্কিক ছিলেন আব্বা। ছিলেন ১৯৪৯ সালে ডাকসু'র সাহিত্য সম্পাদক। শিক্ষাবিদ সৈয়দ মকসুদ আলী চল্লিশ এর দশক থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের কর্মকাণ্ডের সাথে নিবিড় ভাবে জড়িয়ে ছিলেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও পাবলিক এডমিনিস্ট্রেশন বিভাগ এর প্রধান ও সামাজিক অনুষদের ডিন ছিলেন তিনি। অবসর নেয়ার পর প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য হিসেবেও কর্মরত ছিলেন বেশ কিছু সময়।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হিসেবে তিনি ছিলেন কিংবদন্তীতুল্য। তার ছাত্রছাত্রী যারা পরবর্তীতে বিপুল খ্যাতি অর্জন করেছেন যেমন মিজানুর রহমান শেলি, খালেদ শামস, মোকাম্মেল হক সহ বহু সি এস পি অফিসার, অথবা রাজনৈতিক নেত্রীবৃন্দ যেমন আব্দুর রাজ্জাক, সাবেক প্রধান বিচারপতি মোস্তফা কামাল, কবি সৈয়দ শামসুল হক সহ অনেককেই দেখেছি বহুবার বই বা ফলের ঝুড়ি হাতে করে তার গুলশানের বাড়িতে খোঁজ খবর নিতেন। আরও দেখেছি তার সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে TSC তে, এদের অনেকেই তাঁর পায়ে হাত দিয়ে আশীর্বাদ নিতে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনন্য অবদান এর জন্য ১৯৯৬ এ তিনি শের- এ-বাংলা স্বর্ণপদক এ ভূষিত হন। তার লেখা রাষ্ট্র বিজ্ঞান (বাংলা একাডেমি, ১৯৬৬); প্লেটোর রিপাবলিক, (বাংলা একাডেমি, ১৯৭৩), পুনর্মুদ্রণ ২০২৫; ফরাসি বিপ্লবোত্তর রাষ্ট্রচিন্তা, (ঢাবি ১৯৯০); রাজনীতি ও রাষ্ট্রচিন্তায় উপমহাদেশ (বাংলা একাডেমি ১৯৮৮); মার্কিন সরকারের রূপরেখা ১৯৮৫, আহমেদ পাবলিশিং, ঢাকা); এছাড়াও শিক্ষাবিদ এর আত্মজীবনী মূলক লেখা "সাত পুরুষের ইতিকথা" যা কেবল বরিশাল এর সুজাবাদ এর ঐতিহ্যবাহী সৈয়দ পরিবার এর ইতিহাস নয়, বরং সমাজের এক নিখুঁত চিত্র ভেসে উঠেছে ধাপে ধাপে।
এর সাথে যুক্ত হয়েছে নিজের জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা, সমকালীন সামাজিক ও রাজনৈতিক চিত্র। কিংবদন্তীতুল্য অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী আব্বার ব্যাচমেট। তিনি "সাত পুরুষের ইতিকথা পড়ে ভূয়সী প্রশংসা করে আব্বাকে জানিয়ে ছিলেন যে তিনি এত সুন্দর আত্মকথা আগে পড়েন নাই, যাতে একই সাথে ছাত্র রাজনীতি, দেশ বিভাগ ও সমাজের চিত্র ফুটে উঠেছে বিশদভাবে। আব্বা সারাদিন লেখা লিখি নিয়েই ব্যস্ত থাকতে ভালোবাসতেন। লিখে গেছেন বহু ছোট গল্প "কাজল বানু", "বনানী", "নীল পাহাড়ের চুড়া" সহ, "স্বর্ণ কেউর", "নতুন বাড়ি", "যে দিকে দু চোখ যায়" সহ অসংখ্য অনবদ্য প্রবন্ধ।
বন্ধু মহলেও দেখেছি সাবেক আই.জি, রহিম চাচা, কিবরিয়া চাচা, খালেক চাচা, মহান মুক্তিযুদ্ধ এ শহীদ মামুন মাহমুদ চাচা, এমন কি বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তাজউদ্দিন আহমেদ, নজরুল ইসলাম ও হামিদ চাচা সহ সবার সাথে খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিলেন, আব্বার যা আমাদের কাছে দৃষ্টান্ত স্বরূপ।
এখনকার ঢাকা আর তখন কার ঢাকার বিস্তর পার্থক্য। আজকের সোহরাওয়ার্দী উদ্যান তখনকার দিনে রেস কোর্স ময়দান নামে পরিচিত ছিলো। আব্বা আমাকে আর বড় ভাইকে (প্রফেসর সাদ আন্দালিব), ব্রিচেস পরিয়ে ঘোড়া চালানো শিখতে নিয়ে যেতেন প্রতি রোববার। অনেকে বলতেন আব্বা দেখতে বিখ্যাত অভিনেতা পল নিউম্যান এর মতো, কেউ বলতেন ফিউজিটিভ সিরিজের লিউটেনেন্ট যেরাদের মতো।
আসলেই সুদর্শন ছিলেন আব্বা। বিটিভি'র সাবেক মহাপরিচালক ম হামিদ বলতেন আব্বা যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন আর মুসলিম হলে থাকতেন, ছুটি-ছাটায় দেশে ফিরলে সবাই দেখতে আসতো টকটকে রঙ আর ধোপদুরস্ত চেহারার তরুণকে আর বলতো "রাজা সাহেব এসেছেন"।
নানান গল্পের ছলে দার্শনিক সক্রেটিস, প্লেটো আর এরিস্টটলের নাম শুনেছি বহুবার সেই শিশুকাল থেকেই আব্বার মুখে। আর তার থেকেই আমার একটা বদ্ধমূল ধারণা ছিল হয়তো উনি এদেরই মধ্যে একজন। নিরহংকার, সদালাপী, শিশুদের গল্প বলে তন্ময় করে রাখার ক্ষমতা ছিলো তার। ছিলেন যেমন গুরুগম্ভীর তেমনি রসিক। পরিবারের সবার প্রতি সজাগ দৃষ্টি ছিলো তার।
উদার দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষ করে, আম্মা ডঃ নুরুন নাহার ফয়জননেসা'র কোন প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই আমেরিকায় উচ্চতর ডিগ্রি পি.এইচ.ডি লাভ (১৯৬৮), বা যে কোন সামাজিক, সাংস্কৃতিক জগতে অবাধ বিচরণ ও নারী নেতৃত্ব যে অবাধ সুযোগে তিনি সব সময় উৎসাহ যুগিয়েছেন তাও অনেকের ঈর্ষার কারণ হতে পারতো বৈকি?
আমরা দুই ভাই, দুই বোন, বাবা মায়ের আদর্শ ও পরিমিতিবোধ জীবনে কাজে লাগাতে চেষ্টা করেছি এবং দেশের শ্রেষ্ঠ স্কুল কলেজে পড়বার সুযোগও পেয়েছি। সেই সঙ্গে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে মুক্ত বিহঙ্গের মতো ভেসে বেড়িয়েছি। বড় হয়েছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের আলোকিত পরিবেশে। কিন্তু শাসন এর একটা সূক্ষ্ম রেখা সব সময় ছিল যা আমাদের চলার পথকে সুগম করেছে বহুগুণে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জনাব সৈয়দ মকসুদ আলী ও মা ড. নুরুন্নাহার ফয়জননেসা তাদের চার সন্তানের মধ্যে আমি দ্বিতীয়। বড়ো ভাই শিক্ষাবিদ ড. সৈয়দ সাদ আন্দালিব Distinguished Professor, Pennstate University, USA; BRAC University র সাবেক উপাচার্য। মা, বাবা'র পথ ধরে প্রথমেই শিক্ষকতাকেই পেশা হিসেবে নেন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আই. বি. এ তে যোগদান করেন।
আব্বা ভীষণ গান ভালোবাসতেন। বুশ রেডিও ছেড়ে দিয়ে হেমন্তের সাথে গলা মিলিয়ে দরাজ গলায় গাইতেন, "মেঘ বলেছে যাবো যাবো"। লতার কণ্ঠে ছোট্টপাখি চন্দনা বা সন্ধ্যার কণ্ঠে ও বাকবাক বাক বাকুম বাকুম পায়রা বা শচীন দেব বর্মণের গান শুনেছি আব্বার কাছে বসেই। আমার গানে হাতে খড়ি, তারই কাছে।
এরপর আম্মার হাত ধরে ছোটদের আসর, বেতার এ "খেলা ঘরে" গান গেয়েই সংগীত জীবন শুরু করি সাত বছর বয়সে। পরিচিতি লাভ করি নজরুল সংগীত শিল্পী ও পরবর্তীতে সাংবাদিক হিসেবে। ছায়ানটের শিক্ষা সমাপনী শেষে স্বর্ণপদকের বিরল সম্মান পাই। ছোট বোন নাজিয়া জাবীন, দৃষ্টিজয়ী শিশু কিশোরদের জন্য যত্নে গড়ে তুলেছে স্পর্শ ফাউন্ডেশন এবং এর প্রধান উদ্যোক্তা। ছোট ভাই জিয়া সায়িদ আরস্তু কানাডা প্রবাসী কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার। বর্তমানে নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান Konnekt Hub এর কর্ণধার সে।
বাচ্চাদের খুব ভালোবাসতেন আব্বা। বহুদিন দুপুরে তাঁর কোলের কাছে বসে গল্প শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে গেছি আমরা আর পরবর্তীতে তাঁর নাতি নাতনিরাও।
নিবিষ্ট মনে তাকে দেখেছি কোরান পাঠ করতে নিয়মিত ভাবে আর আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করেছি কি ভাবে পাশে নোট করে রাখতেন পাতায় পাতায়। আমার চোখে যা অত্যন্ত বিরল। ধর্মকে তিনি কেবল পালন নয়, ধারণ ও করেছেন।
আমার শশুর ড. এ. আর মল্লিক সাহেব, যিনি নিজেও একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ভারতে প্রথম রাষ্ট্রদূত ও সাবেক টেকনোক্র্যেট অর্থমন্ত্রী, তার ও উক্তি ছিল "মকসুদ আলী সাহেব নিজেকে বড্ড গুটিয়ে রেখেছেন"। তার ইংরেজি ও বাংলা লেখনীর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন তিনি বহুবার।
আমাদের আম্মা ইন্তেকাল করেন ২০০৪ এ। আব্বা তার এই অখণ্ড একাকীত্ব কাটিয়েছেন আম্মার প্রথম মৃত্যু বার্ষিকীতে তার উপর একটা বই প্রকাশ করে। আমার শাশুড়ি বেগম রাহমাতুন নেসা মল্লিক, (যিনি নিজেও লন্ডন থেকে ৫০ এর দশকে মন্টেসরি করেছেন), বেয়ান হিসেবে খুব সুন্দর একটা কমেন্ট আব্বা কে মুগ্ধ করে। তিনি বলেছিলেন, "ভাই সাহেব আপনি সম্রাট শাহজাহান এর মতো একটা কাজ করেছেন, এই বই নাহার আপাকে বাঁচিয়ে রাখবে বহু যুগ ধরে, তাজমহল এর মতো।"
বর্তমান ক্ষয়িষ্ণু ও ভগ্ন সমাজের নানাদিক আমাকে যার পর নাই আহত করে, তাই ভীষণভাবে তাড়িত হয়ে এবং দায়বদ্ধতার বিষয়টি চিন্তা করেই সবার সাথে আমার আব্বার জীবন ও জগত নিয়ে কিছু কথা মনে এলো। তবে অনেক কথাই এখনো বলা হলো না...
আজ ২৫ এ জুন, তার শতবর্ষ পূর্ণ হলো। গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি তাকে।
এই লেখার মধ্যে দিয়ে আব্বা আম্মা দুজনের আত্মার গভীর শান্তি কামনা করি। রাব্বির হাম হুমা কামা রাব্বা ইয়ানি সাগিরা।
লেখক: প্রতিষ্ঠাতা জেমস অব নজরুল
