সুদীর্ঘ ১৫ বছর পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাসে ফিরেছে চারুকলা ইন্সটিটিউট। ফলে শিক্ষার্থীদের মাঝে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা, এরই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে নতুন গতি সঞ্চার হবে বলে প্রত্যাশা করছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবময় ইতিহাসের অংশ হিসেবে চারুকলা ইন্সটিটিউট বরাবরই দেশের শিল্পচর্চার এক অগ্রণী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ভূমিকা রেখে এসেছে। ১৯৭০ সালে বাংলা বিভাগের অংশ হিসেবে যাত্রা শুরু করে, পরবর্তীতে স্বতন্ত্র বিভাগ হিসেবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রশংসিত হয়েছে বিভাগটি।
এই ঐতিহ্যবাহী বিভাগটি ২০১০ সালে চট্টগ্রামের সরকারি চারুকলা কলেজ অধিগ্রহণ করে মূল ক্যাম্পাস থেকে শহরে স্থানান্তরিত করা হয়। মূলত এই স্থানান্তরের সাথে জড়িত সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা দুর্নীতিগ্রস্ত বলে দাবি শিক্ষার্থীদের। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ এর সাথে জড়িত শিক্ষকরা নিজস্ব ফায়দা ও বিগত সরকারের রাজনৈতিক ইচ্ছা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে চারুকলা ইন্সটিটিউটকে বিচ্ছিন্ন করেছিল মূল ক্যাম্পাস হতে।
চারুকলাকে মূল ক্যাম্পাস থেকে সরিয়ে রেখে দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে শিক্ষার্থীদের প্রতি চলে আসছিল চরম অবহেলা ও বৈষম্য। পৃথক এই ইন্সটিটিউটের চারশতাধিক শিক্ষার্থীর জন্য মাত্র ২৫টি আসনের একটি ছাত্র হোস্টেল রয়েছে, আর নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নির্দিষ্ট কোনো আবাসন ব্যবস্থাই নেই। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমতুল্য শিক্ষার সুযোগ থেকেও তারা বঞ্চিত ছিল দীর্ঘদিন।
ইতিপূর্বে বিগত আওয়ামী সরকার আমলে চারুকলা ইন্সটিটিউটকে মূল ক্যাম্পাসে ফিরিয়ে আনার দাবিতে দীর্ঘদিন ধরেই নানান আন্দোলন কর্মসূচি পালন করে আসছিল বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা। আন্দোলন দমন করতে শাখা ছাত্রলীগ দিয়ে তাদের ওপর বর্বর হামলাও চালানো হয়েছিল কয়েকবার। আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের টার্গেট করে ফলাফল কারচুপি, পরীক্ষার রেজাল্ট আটকে রাখা, সেশনাল নম্বর নিয়ে হুমকি ও অনুত্তীর্ণ করে দেওয়া, ক্লাসে ঢুকতে না দেওয়া ইত্যাদি নানাবিধ হেনস্তার মাধ্যমেও আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দমাতেও চেয়েছিল কতিপয় শিক্ষক।
চব্বিশের অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়েও চলমান ছিল চারুকলা ইন্সটিটিউটকে মূল ক্যাম্পাসে ফিরিয়ে আনার এই আন্দোলন। যার একপর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চারুকলা ইন্সটিটিউটকে গত ২০ মে মূল ক্যাম্পাসে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু করে। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টির পুরাতন কলা অনুষদের ভবনে চলছে এর শ্রেণিক কার্যক্রম।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, শিক্ষার্থীদের একাডেমিক সুবিধা, গবেষণার মানোন্নয়ন এবং শিক্ষকদের সঙ্গে অন্যান্য অনুষদের কার্যকর সমন্বয়ের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে চারুকলা অনুষদকে আবারও মূল ক্যাম্পাসে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। বর্তমানে অনুষদটির জন্য একটি আধুনিক ভবন নির্মাণের কাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইয়াহইয়া আখতার বলেন, “চারুকলা অনুষদের মূল ক্যাম্পাসে প্রত্যাবর্তন বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিবেশকে আরও সমৃদ্ধ করবে। এটি আমাদের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ।”
এ বিষয়ে চারুকলা ইন্সটিটিউটের উচ্ছ্বসিত এক শিক্ষার্থী রাফি জানান, “চারুকলা ইনস্টিটিউটের মূল ক্যাম্পাসে ফিরে আসা আমাদের জন্য অনেক আনন্দের। সবুজে ঘেরা এই পরিবেশে আমরা আবারও আমাদের সৃজনশীলতাকে পূর্ণভাবে প্রকাশের সুযোগ পাচ্ছি। এটা শুধু একটি ফিরে আসা নয়, বরং নতুন করে শুরু করার এক দুর্দান্ত অধ্যায়। আমাদের অধ্যাবসায় ও প্রতীক্ষার ফলাফলে আমরা উচ্ছ্বসিত। চবির হৃদয়ে আবারো ফিরে এলো চারুকলা।”
বর্তমানে চারুকলা ইন্সটিটিউটের এই প্রত্যাবর্তন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা রক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
