ভুয়া পেশাজীবী সমাচার!

আপডেট : ০২ জুলাই ২০২৫, ০৭:৩০

গতকাল ইত্তেফাকে 'ভুয়া পেশাজীবী' সংশ্লিষ্ট দুইটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ প্রকাশ করা হইয়াছে। প্রথমত, নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত তারাবো পৌরসভার মোগরাকুল কবরস্থান এলাকায় ডাকাতির প্রস্তুতিকালে একজন ভুয়া মেজরকে গ্রেফতার করিয়াছে পুলিশ। তিনি এই ভুয়া মেজর পরিচয়ে ডাকাতি, ছিনতাইসহ নানা অপকর্মে জড়িত বলিয়া অভিযোগ করা হইয়াছে। তাহার বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে মামলাও দায়ের করা হইয়াছে। অন্যদিকে গোপালগঞ্জে ভুয়া সেনাসদস্য পরিচয়ে এক কিশোরীকে বিবাহ ও প্রতারণার অভিযোগে যৌথ বাহিনী আটক করিয়াছে এক যুবককে। তিনি নিজেকে সেনাবাহিনীর ওয়ারেন্ট অফিসার পরিচয় দিয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের মাধ্যমে সেই কিশোরীর সহিত প্রেমের সম্পর্ক গড়িয়া তোলেন বলিয়া জানা যায়। বাংলাদেশে এইভাবে প্রায়শ বিভিন্ন পেশার ভুয়া পরিচয় দিয়া নানা অপকর্ম করিয়া বেড়াইবার ভূরিভূরি নজির পাওয়া যায়-যাহা অনাকাঙ্ক্ষিত এবং সমাজে বিশৃঙ্খলা তৈরিতে সহায়ক।

আসলে ভুয়া বলিতে কী বুঝায়? অভিধান মোতাবেক, ভুয়া অর্থ হইল মিথ্যা, জাল, নকল বা বানোয়াট। অর্থাৎ, যাহা প্রকৃত নহে, অসত্য বা প্রতারণার উদ্দেশ্যে সৃষ্ট, তাহাকেই ভুয়া বলা হয়। কোনো ব্যক্তি যখন এমন পরিচয় ধারণ করে, যাহা তাহার প্রকৃত পরিচয় নহে অথবা এমন কোনো পেশা বা পদবি দাবি করে যাহা তাহার নাই, তখন তাহাকে ভুয়া বলা হয়। এই ক্ষেত্রে, উল্লিখিত দুই ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিরা নিজেদের মেজর বা ওয়ারেন্ট অফিসার হিসাবে পরিচয় দিয়াছিলেন, যাহা সম্পূর্ণ মিথ্যা। পেশাজীবীদের ক্ষেত্রে, ভুয়া পরিচয় ধারণের অর্থ হইল সেই পেশার জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ বা লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও নিজেকে সেই পেশার সদস্য হিসাবে উপস্থাপন করা। এই ধরনের কার্যকলাপ সমাজে অরাজকতা সৃষ্টি করে এবং জনগণের আস্থাকে ক্ষুণ্ণ করে।

বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের ভুয়া পেশাজীবীর যে খবর পাওয়া যায়, তাহা সত্যি উদ্বেগজনক। সেনাসদস্য, ডাক্তার, সাংবাদিক, আইনজীবী, ম্যাজিস্ট্রেট, সাধারণ পুলিশ অফিসার, গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), শিক্ষক, প্রকৌশলী, এমনকি পির-ফকির বা জ্যোতিষী পরিচয়েও প্রতারণার ঘটনা ঘটে। অবশ্য এই প্রবণতা কেবল বাংলাদেশে নহে, উন্নত ও অনুন্নত দেশেও কমবেশি বিদ্যমান। তবে বাংলাদেশে এই ধরনের ঘটনার আধিক্যের পিছনে বেশ কিছু কারণ বিদ্যমান। প্রথমত, সমাজে দ্রুত বিত্তশালী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং সামাজিক প্রতিপত্তি লাভের মোহ অনেককে এই ধরনের অনৈতিক পথ অবলম্বন করিতে প্ররোচিত করে। দ্বিতীয়ত, আইনের দুর্বল প্রয়োগ এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাব ভুয়া পরিচয়ের মাধ্যমে প্রতারণাকে আরো উৎসাহিত করে। তৃতীয়ত, ডিজিটাল মাধ্যমের সহজলভ্য এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্যের যাচাই-বাছাইয়ের ঘাটতিও এই ধরনের প্রতারকদের জন্য সুযোগ তৈরি করে। পরিশেষে, জনগণের অসচেতনতা এবং সহজে বিশ্বাস করার প্রবণতাও এই ভুয়া পেশাজীবীদের সফল হইবার অন্যতম কারণ। অনেক সময় সাধারণ মানুষ পরিচয়ের সত্যতা যাচাই না করিয়াই দ্রুত বিশ্বাস করিয়া ফেলে, যাহার ফলে তাহারা প্রতারণার শিকার হন।

উপর্যুক্ত পরিস্থিতি হইতে পরিত্রাণ পাইতে হইলে আইনের যথাযথ প্রয়োগ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং শিক্ষিত ও সচেতন সমাজ গঠনে গুরুত্বারোপ করা অপরিহার্য। প্রতিটি নাগরিকের উচিত অপরিচিত ব্যক্তির পরিচয় সম্পর্কে প্রথমেই নিশ্চিত হওয়া এবং কোনো প্রকার সন্দেহ হইলে যথাযথ কর্তৃপক্ষের নিকট অবহিত করা। এই ব্যাপারে আমরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা প্রশাসনের সহায়তা গ্রহণ করিতে পারি। আমরা মনে করি, প্রত্যেক পেশা ও পেশাজীবীর জন্য পৃথক কর্তৃপক্ষ থাকা দরকার যাহারা যোগ্যতা নির্ণয়সহ বিশেষ শনাক্তকরণ নম্বর প্রদান করিবেন। আবার সংশ্লিষ্ট কর্মস্থলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আলাদা আইডি নম্বর-সংবলিত আইডি কার্ড প্রবর্তন বাধ্যতামূলক করা দরকার। ইহা অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের থাকিলেও অনেক প্রতিষ্ঠানের নাই বিধায় ভুয়া পরিচয় প্রদান করা সহজ হইয়া পড়ে। এই ব্যাপারে আমাদের সকলের সচেতন থাকা একান্ত আবশ্যক।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন